রোদ বৃষ্টিতে ঘোরাঘুরি
বর্ষায় নৌকায় ঘোরার মজাই আলাদা
আশিকা নিগার
প্রকাশ: ০৫ আগস্ট ২০২৫ | ২৩:৫৪
শ্রাবণের দিনগুলোয় চলে রোদ আর মেঘের খুনসুটি। কখনও দিনটা রোদ ঝলমলে, কখনও বৃষ্টিতে ভেজা। মন চায় ছুটে যেতে, এমন কোনো পথে, যেখানে প্রকৃতি আপন করে ডাকে। এ সময় কোথায় ঘুরতে যেতে পারেন তা নিয়ে লিখেছেন আশিকা নিগার
‘কোথাও যেতে ইচ্ছে করে,
যেখানে নাম না জানা নদী বয়ে চলে ধীরে,
জলভেজা গন্ধে মিশে থাকে মাটির গান,
আকাশের মুখ ভার, তবু মনে দারুণ আনন্দের জোয়ার।’
বর্ষা যেন প্রকৃতির রূপ উন্মোচনের এক মোহময় সময়। মাটি পায় তার স্নিগ্ধ ঘ্রাণ, আকাশ ঢেকে যায় গাঢ় নীল মেঘে, আর পাতার ফাঁক দিয়ে ঝরে পড়ে বৃষ্টির ফোঁটা। শ্রাবণের ধারায় নদী হারায় তার কূলে, মাঠ হারায় সীমানায়, গাছেরা ঝরে পড়া জলে স্নান করে হয়ে ওঠে আরও তাজা, আরও সবুজ।
এই ঋতুতে একদিকে নিঃসঙ্গ মেঘের আহাজারি, অন্যদিকে অবিরাম ঝরনার সুরে প্রকৃতির উল্লাস।
এমন দিনে মনে হয় ব্যস্ততা ছেড়ে, শহরের কংক্রিট পেরিয়ে চলে যাই বৃষ্টিভেজা প্রকৃতির কোলে–যেখানে পায়ের নিচে কাদামাটির মোহ, চোখের সামনে ধোঁয়াশা মাখা টিলা আর কান পাতলে শোনা যায় একটানা ঝিরঝির বৃষ্টির গান।
ঝিরঝির বৃষ্টিতে স্নিগ্ধ সবুজ প্রকৃতি, সাগরের উত্তাল ঢেউ, হাওরের বুকে বৃষ্টিতে জলকেলি করার আনন্দ আর সবুজে ঘেরা পাহাড়–সব মিলিয়ে ভ্রমণপ্রেমীদের জন্য এক অনন্য সময়। প্রিয়জনের হাত ধরে অথবা প্রিয় বন্ধুদের দল নিয়ে কার না হারাতে ইচ্ছে করে প্রকৃতির মায়ায়।
তবে এ সময় ঘুরতে যাওয়ার আগে জায়গা নির্বাচন, খরচের পরিকল্পনা, যাতায়াত পদ্ধতি ও প্রয়োজনীয় সতর্কতার বিষয়গুলোও জানা জরুরি।
সাজেক ভ্যালি, রাঙামাটি
যেখানে মেঘেরা এসে গায়ে এসে লেগে যায়, সূর্য উঠে মেঘের নিচে আর রাতের আকাশে তারার দল মুখোমুখি বসে চাঁদের সঙ্গে গল্প করে সেই জায়গাটার নাম সাজেক। পার্বত্য চট্টগ্রামের বুকে সবুজ পাহাড় আর শুভ্র মেঘের অলিগলি পেরিয়ে সাজেক যেন প্রকৃতির এক রহস্যময়ী সৃষ্টি। এখানে ভোরবেলায় দরজা খুললেই চোখে পড়ে মেঘে ঢাকা উপত্যকা কিংবা যেখানে ছাদে দাঁড়িয়ে হুট করেই নিজের গায়ে টের পাওয়া যায় মেঘের ছোঁয়া। এমন সব অভিজ্ঞতা নিতে ছুটে যেতে পারেন সাজেকের কিছু রিসোর্ট আর হোটেলগুলোয়। ঢাকা থেকে গেলে প্রথমে বাসে করে খাগড়াছড়ি যেতে হবে। ৭-৮ ঘণ্টা সময় লাগে। সেখান থেকে সিএনজিচালিত অটোরিকশা বা চাঁদের গাড়িতে করে সাজেক যেতে হয়।
জাফলং, সিলেট
পিয়াইন নদী, চা বাগান, খাসিয়া গ্রাম এবং মেঘালয় পাহাড়ের সৌন্দর্য বর্ষায় আরও জীবন্ত হয়ে ওঠে। বৃষ্টির ধারা আর ঝরনার শব্দ মিলিয়ে এখানে প্রকৃতি খেলে নিজের সুরে। ঢাকা থেকে বাসে বা ট্রেনে সিলেট যেতে হবে। বাসে গেলে সময় লাগে প্রায় ৬-৭ ঘণ্টা। সিলেট শহর থেকে অটোরিকশা-মাইক্রোবাসে করে জাফলং যেতে হয় (দূরত্ব প্রায় ৬০ কিলোমিটার)।
নাফাখুম ও রেমাক্রি, বান্দরবান
দূরে কোথাও যদি সত্যিই ‘জল পড়ে, পাতা নড়ে’ ধরনের প্রকৃতির রাজ্য থেকে আহ্বান আসে, সেটি হবে বান্দরবানের সীমান্তঘেঁষা অরণ্যঘেরা ভূখণ্ড নাফাখুম ও রেমাক্রি।
রঙিন পাথর ও সবুজপানির খেলা নাফাখুমকে করে তুলেছে দুর্দান্ত এক ক্যাম্পিং লোকেশন। এখানে দাঁড়িয়ে প্রকৃতির শক্তি, শান্তি আর সৌন্দর্য– তিনটিই একসঙ্গে উপভোগ করা যায়।
থানচি থেকে নৌকায় রেমাক্রি যাওয়ার পথটাই যেন একটি নিজস্ব অ্যাডভেঞ্চার। খরস্রোতা সাঙ্গু নদীর বুক চিরে চলে যাওয়া নৌকা, চারপাশে পাহাড়, নদীর দুই ধারে অরণ্য আর মাঝেমধ্যে চোখে পড়ে ঝরনা।
ঢাকা থেকে বাসে বান্দরবান যেতে হয়। বান্দরবান থেকে থানচি যেতে লোকাল বাস-চাঁদের গাড়ি। থানচি থেকে গাইডসহ হাঁটতে বা বোটে করে যেতে হয় রেমাক্রি ও নাফাখুমে। এসব দুর্গম এলাকায় গাইড ছাড়া যাবেন না। হেঁটে চলার প্রস্তুতি থাকতে হবে। মোবাইল নেটওয়ার্ক দুর্বল।
শ্রীমঙ্গল, মৌলভীবাজার
বর্ষায় লাউয়াছড়া বনের মধ্যে দিয়ে হাঁটা কিংবা মাধবকুণ্ড জলপ্রপাতে গা ভেজানো যেতে পারে। ঢাকা থেকে ট্রেনে বা বাসে শ্রীমঙ্গল যাওয়া যায়। সময় লাগে ৫-৬ ঘণ্টা। শহর থেকে রিজার্ভ অটোরিকশা করে বিভিন্ন গন্তব্যে যাওয়া যায়। সেখানে থাকার জন্যও আপনার পছন্দমতো পেয়ে যেতে পারেন ভালো মানের হোটেল।
বৃষ্টি হলে কাদামাটি পিচ্ছিল হয়ে পড়ে। হাঁটার সময় সতর্ক থাকুন। চা-বাগান বা বনে গিয়ে নির্ধারিত রাস্তায় থাকুন। ইকো-ট্যুরিজম এলাকায় পরিবেশ সচেতন থাকুন।
কাপ্তাই লেক ও শুভলং, রাঙামাটি
কাপ্তাই লেক বর্ষায় তার রূপের চূড়ায় পৌঁছায়। নৌভ্রমণ, শুভলং ঝরনা আর লেকের পাড়ে হালকা বৃষ্টিতে চা, সব মিলিয়ে এক মনোমুগ্ধকর অভিজ্ঞতা। ঢাকা থেকে রাঙামাটি যাওয়ার জন্য বাস পাওয়া যায়। সময় লাগে ৭-৮ ঘণ্টা। রাঙামাটি শহর থেকে নৌকায় করে শুভলং যাওয়া যায়। সেখানে নৌকাযাত্রায় লাইফ জ্যাকেট ব্যবহার বাধ্যতামূলক। অতিরিক্ত বৃষ্টির মধ্যে নৌযাত্রা এড়িয়ে চলুন। পানি বিশুদ্ধকরণ ট্যাবলেট বা বোতলজাত পানি রাখুন।
টাঙ্গুয়ার হাওর
‘নীল আকাশের নিচে, সবুজ জলরাশি বিস্তৃত আর মাঝখানে ভাসছে ছোট নৌকা, তাতে বসে যেন সময়টাও থেমে গেছে।’ এমন দৃশ্যের বাস্তব রূপ দেখা যায় টাঙ্গুয়ার হাওরে। বিশেষত বর্ষাকালে, যখন পুরো হাওর রূপ নেয় এক জলের রাজ্যে।
জলে ডুবে থাকা গাছপালা, আকাশ-মেঘ-জল একে অপরের সঙ্গে মিশে একাকার হয়ে যায়। ভাসমান নৌকায় রাত কাটানো, আকাশে তারার নিচে বা হালকা বৃষ্টিতে চুপচাপ বসে থাকা যেন এক অপার্থিব অভিজ্ঞতা। আজকাল হাওরের জলরাশির ওপর ভেসে চলা হাউসবোট বেশ জনপ্রিয়।
কক্সবাজার
বর্ষায় সাগরের ঢেউ হয় উত্তাল, আকাশে নামে মেঘের ঘনঘটা আর বৃষ্টির ফোঁটায় সৈকতের বালু হয়ে ওঠে আরও কোমল। কম ভিড়ের এ সময়টায় সমুদ্রের একান্ত সৌন্দর্য উপভোগ করা যায়। হিমছড়ির সবুজে, ইনানির পাথরে বৃষ্টির ছোঁয়া এক অনবদ্য অনুভূতি দেয়। এ বর্ষায় প্রিয়জন অথবা পরিবার, বন্ধুদের নিয়ে সমুদ্রস্নান করে আসতে পারেন। তাছাড়া ঢাকার আশপাশে মাওয়াঘাট, সদরঘাট, নেত্রকোনার দুর্গাপুর, শীতলক্ষ্যা নদী, পানাম নগরেও ঘুরে আসতে পারেন।
সতর্কতা
নৌযাত্রায় লাইফ জ্যাকেট ব্যবহার বাধ্যতামূলক। অতিরিক্ত বৃষ্টির মধ্যে নৌযাত্রা এড়িয়ে চলুন। পানি বিশুদ্ধকরণ ট্যাবলেট বা বোতলজাত পানি রাখুন। জলরোধী পোশাক ও রেইনকোট সঙ্গে রাখুন। গ্রিপযুক্ত জুতা বেছে নিন। ওষুধ, স্যানিটারি সামগ্রী ও ফার্স্টএইড কিট সঙ্গে রাখুন। পাওয়ার ব্যাংক ও টর্চ রাখুন। পর্যাপ্ত নগদ টাকা ও জাতীয় পরিচয়পত্র রাখুন। বর্ষাকালে প্রকৃতি তার মায়ার পসরা সাজিয়ে অপেক্ষা করে প্রকৃতিপ্রেমীদের জন্য। একটু প্রস্তুতি ও সচেতনতা থাকলেই বর্ষার ভ্রমণ হতে পারে রোমাঞ্চকর, মনোমুগ্ধকর ও স্মরণীয়।
- বিষয় :
- রোদ
