ঢাকা রোববার, ১৪ জুন ২০২৬

প্রকৃতির মাঝে প্রকৃতির সাজে

প্রকৃতির মাঝে প্রকৃতির সাজে
×

শহরের যান্ত্রিক আর একঘেয়ে জীবনে প্রশান্তি এনে দেয় প্রকৃতির সান্নিধ্য মডেল: প্রিয়মনি; পোশাক: সরলা; মেকওভার: পারসোনা; ছবি: ফয়সাল সিদ্দিক কাব্য

 তাসলিমা তামান্না

প্রকাশ: ১০ জুন ২০২৬ | ০৭:১৮

| প্রিন্ট সংস্করণ

বাংলা পঞ্জিকা অনুযায়ী বর্ষাকাল আসতে আরও কয়েক দিন বাকি। যদিও এরই মধ্যে কয়েক দফায় বৃষ্টির কবলে পড়েছে দেশ। তারপরও কমেনি গরমের দাপট। জ্যৈষ্ঠের প্রখর রোদ্দুরে হাঁসফাঁস অবস্থা। ঢাকার মতো ব্যস্ত শহরে গরমের দিনে মানুষের ক্লান্তি যেন আরেকটু বেশি স্পষ্ট হয়ে ওঠে। ঘরের ভেতরে গরম আর বাইরে বেরোলেই রোদের তেজ, ভ্যাপসা গরম। এ সময়ই প্রকৃতির কাছে ফিরে যাওয়ার আকাঙ্ক্ষা আরও তীব্র হয়। মনে হয়, একটু যদি গাছের ছায়ায় বসা যেত, কানে যদি পাখির ডাক শোনা যেত তাহলে অন্যরকম স্বস্তি মিলত। লিখেছেন  তাসলিমা তামান্না

ডাক দিয়ে যায় পথের ধারে কৃষ্ণচূড়ায়–রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর।
তাপপ্রবাহ আর বৃষ্টিভেজা–এ আবহাওয়ার মধ্যেই নগরীর বিভিন্ন স্থানে থোকায় থোকায় ফুটেছে অজস্র লাল কৃষ্ণচূড়া ফুল। নানা রঙের হিজল, সোনালুর সোনালি রং, কোথাও বা ফুটে থাকা বেগুনি জারুলে ঢাকা শহর এ সময় যেন এক ভিন্ন রূপে সেজে ওঠে। গ্রীষ্মের শুরু থেকেই রাজধানীর সড়ক বিভাজক, বিশ্ববিদ্যালয় এলাকা, আবাসিক এলাকা ও পার্কগুলো গ্রীষ্মের ফুলে রঙিন হয়ে উঠেছে। বিশেষ করে সংসদ ভবন এলাকা, চন্দ্রিমা উদ্যান, রমনা পার্ক, সোহরাওয়ার্দী উদ্যান এবং ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় এলাকায় কৃষ্ণচূড়া, রাধাচূড়া, সোনালুর সৌন্দর্য আলাদাভাবে পথচারীর দৃষ্টি কাড়ছে। সাধারণত আষাঢ়-শ্রাবণের বৃষ্টি নামার সঙ্গে সঙ্গে কদমের দেখা মিললেও সাম্প্রতিক বছরগুলোয় বর্ষার আগেই রাজধানীসহ সারাদেশে কদম ফুল ফুটছে। সবুজ পাতার ফাঁকে হলুদ কদম ফুল প্রকৃতিকে এনে দেয় অন্যরকম সৌন্দর্য। রাজধানীর বিভিন্ন এলাকা বিশেষ করে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়-সংলগ্ন এলাকা, সোহরাওয়ার্দী উদ্যান, চন্দ্রিমা উদ্যান, রমনা পার্কে ফোটা কদম ফুল প্রকৃতিপ্রেমীকে করছে মুগ্ধ।
গ্রীষ্ম মানে একদিকে যেমন তীব্র রোদের ঝলক, অন্যদিকে হঠাৎ হঠাৎ নেমে আসা বৃষ্টির ছোঁয়া। কখনও তীব্র রোদ, আবার কখনও ঝমঝমিয়ে নামা বৃষ্টিতে ভিজে যাওয়া রাস্তা–সব মিলিয়ে নাগরিক জীবনেও তৈরি হয় এক ধরনের ছন্দ। প্রকৃতির এই বদলে যাওয়া রূপই হয়ে উঠতে পারে সাজের অনুপ্রেরণা। 

পোশাকে আরাম, প্রকৃতির রং
গরমে আরাম বোধ হওয়ার প্রথম শর্ত আরামদায়ক পোশাক। ভারী বা গাঢ় রংয়ের পোশাক না পরে হালকা ও প্রাকৃতিক রং যেমন–সাদা, হালকা সবুজ, আকাশি নীল, ক্রিম বা প্যাস্টেল শেডের পোশাক বেছে নিতে পারেন। মাঝেমধ্যে বৃষ্টি নামলে এই হালকা রঙের পোশাক আরও বেশি প্রাণবন্ত মনে হয়। ভেজা বাতাসে পোশাকের সহজ রংগুলো যেন প্রকৃতির সঙ্গে মিশে যায় নিঃশব্দে।
এ সময় পরনে রাখতে পারেন ঢিলেঢালা কুর্তি, ফতুয়া, কাফতান, পালাজো, ওয়াইড লেগ প্যান্ট, হালকা তাঁতের শাড়ি। ফেব্রিক হিসেবে বেছে নিতে পারেন সুতি, লিনেন, ভিসকস কাপড়। এসব কাপড় ঘাম কমায়, পরলে আরামও বোধ হয়। 

চুলে ফুলের সৌন্দর্য
গ্রীষ্মের প্রকৃতিতে ফুলের উপস্থিতি আলাদা এক সৌন্দর্য তৈরি করে। ফুলের সাজ নিয়ে কার্নিভাল মেকওভারের স্বত্বাধিকারী ও রূপ বিশেষজ্ঞ তাসলিমা পলাশী বলেন, ‘সাজে প্রকৃতির ছোঁয়া আনতে কদম ফুল, জুঁই বা বেলি ফুল চুলে গুঁজে দিতে পারেন। ছোট ফুলের হেয়ার ক্লিপও ব্যবহার করা যায়। সাধারণ বেণিতে ফুল লাগালে অন্যরকম লুক ফুটে উঠবে। ঢিলেঢালা খোঁপা, খোলা হালকা ওয়েভ চুলে কিংবা সাইড বেণি বা ফ্রেঞ্চ বেণি করেও চুলে লাগাতে পারেন ফুল।’ 

মেকআপে স্বাভাবিকতা
গরম ও বৃষ্টির এই মিশ্র আবহাওয়ায় ভারী মেকআপ বেশিক্ষণ টিকে না। রূপ বিশেষজ্ঞ তাসলিমা পলাশীর মতে, এ সময় মেকআপটা হবে ন্যাচারাল। খুব বেশি ফাউন্ডেশন ব্যবহার করার দরকার নেই। হালকা বিবি ক্রিম বা টিন্টেড ময়েশ্চারাইজার ব্যবহারই যথেষ্ট। চোখে ভারী কোনো মেকআপ না করে শুধু মাসকারা আর লাইনার লাগালে ভালো দেখাবে। ঠোঁটে থাকতে পারে পিচ বা প্রাকৃতিক শেডের টিন্ট। গালে

খুব হালকা ব্লাশ। সব মিলিয়ে নো মেকআপ লুকেই আপনাকে সতেজ দেখাবে।
অলংকারে ফিরে আসুক প্রাকৃতিকতা
এই মৌসুমে ভারী অলংকারের চেয়ে কাঠ, মাটি, বাঁশ বা হাতে তৈরি গহনা বেশি মানানসই। এসব অনুষঙ্গ শুধু সাজই নয়, প্রকৃতির সঙ্গে এক ধরনের সংযোগও তৈরি করে।

প্রকৃতির সঙ্গে সময় কাটানোর গুরুত্ব
শুধু বাহ্যিক সাজ নয়, প্রকৃতিকে অনুভব করাও এই ঋতুর অংশ। কখনও হঠাৎ বৃষ্টিতে ভিজে যাওয়া, কখনও গাছের নিচে দাঁড়িয়ে ভেজা মাটির গন্ধ নেওয়া–এসব ছোট মুহূর্তই মনকে সতেজ করে তোলে।

কোথায় যেতে পারেন 
ব্যস্ত রাজধানী ঢাকার মধ্যেও এমন কিছু স্থান রয়েছে, যেখানে দিনের ক্লান্তি ভুলে প্রকৃতির সান্নিধ্যে কিছুটা সময় কাটানো যায়।

রমনা পার্ক
রমনা পার্ক প্রকৃতিপ্রেমীর অন্যতম প্রিয় স্থান। বিশাল গাছপালা, লেক, পাখির ডাক আর ছায়াঘেরা পথ গরমের দিনে এনে দেয় স্বস্তি। ভোর বা বিকেলে হাঁটতে গেলে প্রকৃতির এক অন্যরকম সৌন্দর্য ধরা পড়ে।

জাতীয় উদ্ভিদ উদ্যান (বোটানিক্যাল গার্ডেন)
মিরপুরে অবস্থিত এই উদ্যান যেন এক টুকরো সবুজ ভূমি। নানা প্রজাতির গাছ, ফুল, জলাশয় এবং ছায়াঘেরা পরিবেশ প্রকৃতির খুব কাছাকাছি নিয়ে যায় দর্শনার্থীদের। 

হাতিরঝিল
পানি, খোলা আকাশ আর বাতাস–এই তিনের সান্নিধ্য পেতে যেতে পারেন হাতিরঝিল। বিকেলের দিকে এখানে বসে সূর্যাস্ত দেখা কিংবা হেঁটে বেড়ালে মন অনেকটাই প্রশান্ত হয়। চাইলে এখানে ওয়াটার ট্যাক্সিতেও ঘুরতে পারেন।

সোহরাওয়ার্দী উদ্যান
বিশাল সবুজ চত্বর, গাছের সমারোহ আর খোলা পরিবেশের কারণে সোহরাওয়ার্দী উদ্যানও কিছুটা স্বস্তি অনুভূতি দেয়। পরিবার বা বন্ধুদের সঙ্গে সময় কাটানোর জন্য এটি ভালো একটি জায়গা।

চন্দ্রিমা উদ্যান
লেক, সবুজ ঘাস আর গাছপালার সমন্বয়ে চন্দ্রিমা উদ্যান যেন ঢাকার মধ্যে অন্যরকম এক প্রাকৃতিক সৌন্দর্যের স্থান। বিকেলের নরম আলোয় এর সৌন্দর্য আরও বেড়ে যায়।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় এলাকা
টিএসসির আশপাশ, কার্জন হল, বিশ্বদ্যিালয়-সংলগ্ন ছায়াঘেরা পথগুলোও প্রকৃতির ছোঁয়া পাওয়ার জন্য দারুণ জায়গা। ছুটির দিনগুলোয় এই এলাকায় ঘুরে আসতে পারেন প্রকৃতির সান্নিধ্য পেতে।
ইংরেজ কবি উইলিয়াম ওয়ার্ডসওয়ার্থের ভাষায়, যে প্রকৃতিকে ভালোবাসে, প্রকৃতি কখনও তাঁকে প্রতারিত করে না। প্রকৃতির কাছে যাওয়া মানে শুধু ঘুরে বেড়ানো নয়, বরং নিজের শরীর ও মনকে কিছুটা প্রশান্তি দেওয়া। সবুজের ছায়া, পানির ধারে বাতাস কিংবা ফুলের সৌরভ–সবকিছুই ক্লান্ত দিনে নতুন করে প্রাণ জোগাতে পারে। সময় পেলেই তাই ঘুরে আসতে পারেন সবুজ কোনো ঠিকানায়, যেখানে উপভোগ করতে পারবেন প্রকৃতির নির্মল সান্নিধ্য। 

আরও পড়ুন

×