ঢাকা বুধবার, ০১ জুলাই ২০২৬

বেড়ানো: ঢাকার আশেপাশে

বেড়ানো: ঢাকার আশেপাশে
×

বর্ষায় শাপলা-পদ্ম বিলে অন্যরকম সৌন্দর্য ফুটে ওঠে ছবি: ফেসবুক

রোজী আরেফিন   

প্রকাশ: ০১ জুলাই ২০২৬ | ০৭:১৪

| প্রিন্ট সংস্করণ

বর্ষা এলেই বাংলাদেশের প্রকৃতি যেন নিজের সবচেয়ে সুন্দর রূপটি মেলে ধরে। ধুলোমাখা পথ জলের আয়নায় বদলে যায়, নদী ফিরে পায় তার প্রাণ, বিল ভরে ওঠে শাপলা আর পদ্মে। নাগরিক কোলাহল, যানজট আর ব্যস্ততার ফাঁকে মনটাও যেন একটু খোলা আকাশ খুঁজতে চায়। সুখের বিষয় হলো, সেই আকাশের নিচে পৌঁছাতে খুব বেশি দূরে যেতে হয় না। ঢাকার আশপাশেই এমন কয়েকটি জায়গা রয়েছে, যেখানে মাত্র এক দিনেই নৌকাভ্রমণ, বৃষ্টিভেজা প্রকৃতি আর গ্রামবাংলার অপার সৌন্দর্য উপভোগ করা সম্ভব। 

দিয়াবাড়ি ও তুরাগ নদ 
ঢাকার মধ্য থেকেই যদি বর্ষার নদীর স্বাদ নিতে চান, তাহলে দিয়াবাড়ি হতে পারে সবচেয়ে সহজ গন্তব্য। মেট্রোরেলে দিয়াবাড়ি স্টেশনে নেমে কয়েক মিনিট রিকশায় গেলেই তুরাগ নদের ঘাট। বর্ষায় নদ কানায় কানায় ভরে ওঠে, দুই তীরে সবুজের সমারোহ, মাথার ওপর ভেসে বেড়ানো কালো মেঘ আর মাঝেমধ্যে টুপটাপ বৃষ্টি–সব মিলিয়ে পরিবেশটা হয়ে ওঠে একেবারে ছবির দৃশ্যের মতো। স্থানীয় মাঝিরা ঘণ্টা হিসেবে নৌকা বা বোট ভাড়া দেন ৩০০ থেকে ৮০০ টাকার মধ্যে। কয়েকজন মিলে গেলে খরচ কম হবে। নৌকাভ্রমণ শেষে উত্তরা এলাকার যে কোনো রেস্টুরেন্টে দুপুরের খাবার বা বিকেলের নাশতা সেরে সন্ধ্যার আগেই ঢাকায় ফেরা যায়। অল্প সময়ের একটি দারুণ ডে ট্রিপ হতে পারে এটি। 

বিরুলিয়া, সাভার 
তুরাগ নদের আরেকটি শান্ত রূপ দেখতে চাইলে চলে যেতে পারেন বিরুলিয়ায়। নদের ধারে ছোট্ট গ্রাম, কাঁচা রাস্তা, নৌকার সারি আর বৃষ্টিভেজা সবুজ–সব মিলিয়ে জায়গাটি বর্ষায় অন্যরকম সৌন্দর্য ধারণ করে। গাবতলী থেকে বাস বা অটোরিকশায় বিরুলিয়া ব্রিজ পর্যন্ত পৌঁছে ঘাটে যাওয়া যায়। সেখান থেকে ৪০০ থেকে ৮০০ টাকার মধ্যে নৌকা ভাড়া করে প্রায় এক ঘণ্টা নদে ঘোরা যায়। নদের পারে ছোট দেশি খাবারের হোটেল ও চায়ের দোকান রয়েছে। চাইলে কাছাকাছি গোলাপ গ্রামও ঘুরে দেখতে পারেন। সকালে বের হলে বিকেলের পুরো ভ্রমণ শেষ করে ঢাকায় ফিরে আসা সম্ভব। 

বালু নদ (ডেমরা-পূর্বাচল) 
যারা একটু নির্জন নদীপথে সময় কাটাতে চান, তাদের জন্য বালু নদ দারুণ একটি গন্তব্য। বর্ষায় নদের দুই পাশ সবুজে ঢেকে যায়, মাঝেমধ্যে জেলেদের নৌকা আর ভাসমান জলজ উদ্ভিদ পুরো পরিবেশকে আরও প্রাণবন্ত করে তোলে। ৩০০ ফিট সড়ক বা ডেমরা হয়ে স্থানীয় ঘাটে পৌঁছানো যায়। সেখান থেকে ৫০০ থেকে এক হাজার ২০০ টাকার মধ্যে নৌকা ভাড়া পাওয়া যায়। আশপাশে বড় কোনো রেস্টুরেন্ট নেই। তাই নিজের সঙ্গে পানি ও হালকা খাবার নিয়ে যাওয়া ভালো। কয়েক ঘণ্টা নদের পানিতে ঘুরে একই দিনেই ঢাকায় ফেরা যায়। 

জিন্দা পার্ক, রূপগঞ্জ 
সব বর্ষার ভ্রমণ যে নৌকায় হতে হবে, এমন নয়। কেউ যদি বৃষ্টিভেজা সবুজের মধ্যে হাঁটতে চান, তাহলে জিন্দা পার্ক হতে পারে সেরা পছন্দ। বিশাল জলাশয়, শত শত গাছ, কাঠের সেতু আর ভেজা বাতাস–সব মিলিয়ে জায়গাটি এক ধরনের প্রশান্তি এনে দেয়। কুড়িল থেকে ৩০০ ফিট সড়ক হয়ে সহজেই পৌঁছানো যায়। প্রবেশমূল্য সাধারণত ১০০ থেকে ১৫০ টাকার মধ্যে। পার্কের ভেতরেই ভালো মানের রেস্টুরেন্ট রয়েছে। তাই খাওয়াদাওয়ার কোনো ঝামেলা নেই। পরিবার বা বন্ধুদের সঙ্গে সারাদিন কাটানোর জন্য এটি একটি আদর্শ ডে ট্রিপ। 
মৌসুমি শাপলা-পদ্মবিল (নবাবগঞ্জ-কেরানীগঞ্জ এলাকা) 
বর্ষার মাঝামাঝি সময় ঢাকার নবাবগঞ্জ ও কেরানীগঞ্জের বিভিন্ন মৌসুমি বিল শাপলা ও পদ্মে ভরে ওঠে। কোথাও সাদা বা লাল শাপলার বিস্তার, কোথাও গোলাপি পদ্মের সমারোহ। ছোট নৌকায় ফুলের ফাঁক দিয়ে ধীরে ধীরে এগিয়ে যাওয়ার অভিজ্ঞতা সত্যিই ভাষায় প্রকাশ করা কঠিন। তবে প্রতিবছর একই জায়গায় সমানভাবে ফুল ফোটে না। তাই যাওয়ার আগে স্থানীয়দের কাছ থেকে খবর নিয়ে নেওয়াই ভালো। বাবুবাজার হয়ে নবাবগঞ্জ বা কেরানীগঞ্জে পৌঁছে স্থানীয় নৌকা ৫০০ থেকে এক হাজার টাকার মধ্যে ভাড়া করা যায়। আশপাশে ছোটখাটো খাবারের দোকান থাকলেও নিজের সঙ্গে পানি ও হালকা খাবার রাখলে সুবিধা হবে। ভোরের সময় গেলে ফুলগুলো সবচেয়ে সতেজ থাকে আর দুপুরের আগেই পুরো ভ্রমণ শেষ করে ঢাকায় ফিরে আসা যায়। 
এক দিনের ভ্রমণে আনুমানিক খরচ 
চার-পাঁচজন মিলে গেলে জনপ্রতি ৮০০ থেকে এক হাজার ৫০০ টাকার মধ্যেই যাতায়াত, নৌকাভ্রমণ, দুপুরের খাবার এবং চা-নাশতা হয়ে যায়। নিজের গাড়ি ব্যবহার করলে খরচ কিছুটা বাড়লেও সময় বাঁচে এবং ইচ্ছেমতো জায়গায় থামা যায়। 

ভ্রমণে যাওয়ার আগে– 
বর্ষার সময় নদীতে স্রোত বেশি থাকতে পারে। তাই নৌকায় ওঠার আগে ভাড়া ও সময় ঠিক করে নিন এবং সম্ভব হলে লাইফ জ্যাকেট ব্যবহার করুন। সঙ্গে রেইনকোট বা ছাতা, পানিরোধী ব্যাগ, অতিরিক্ত পোশাক এবং পাওয়ার ব্যাংক রাখুন। প্রকৃতির সৌন্দর্য উপভোগ করতে গিয়ে যেন সেটিকে নষ্ট না করি প্লাস্টিক বা আবর্জনা, যেখানে-সেখানে না ফেলে নির্দিষ্ট স্থানে ফেলুন। 
সব ভ্রমণের গন্তব্য পাহাড় কিংবা সমুদ্র হতে হবে এমন কোনো নিয়ম নেই।  কখনও কখনও শহরের কাছেই বৃষ্টির গন্ধ, নদীর নিস্তব্ধতা আর একটি নৌকাই মনের দীর্ঘদিনের ক্লান্তি ধুয়ে নিয়ে যায়। তাহলে আর দেরি কেন? এ বর্ষাতেই কাছাকাছি কোনো গন্তব্য বেছে নিয়ে পরিকল্পনা করে ফেলুন। পরিবারকে সময় দিন। সেই সঙ্গে কর্মব্যস্ত জীবন থেকে মনটাকেও একটু ছুটি দিন। 

আরও পড়ুন

×