ফলে ফিরুক উজ্জ্বলতা
মডেল: মাফতুহা জান্নাত জীম ছবি: মঞ্জু আলম
ইসরাত জাহান
প্রকাশ: ০১ জুলাই ২০২৬ | ০৭:১৬
| প্রিন্ট সংস্করণ
বাজারে এখন মিলছে নানা জাতের মৌসুমি ফল। এর মধ্যে রয়েছে আম, জাম, কাঁঠাল, লটকান, লিচু, মাল্টা, আপেল, ড্রাগন, নাশপাতিসহ বিভিন্ন ফল। ফল শুধু শরীরের পুষ্টির চাহিদাই পূরণ করে না, ত্বককেও রাখে সতেজ, উজ্জ্বল ও স্বাস্থ্যবান। কোমল ও সতেজ রাখতে খাওয়ার পাশাপাশি ফল ত্বকেও লাগাতে পারেন। লিখেছেন ইসরাত জাহান
ফল দিয়ে ত্বকের যত্ন নেওয়া ভালো। তবে সব ফল সব ধরনের ত্বকের জন্য উপযোগী নাও হতে পারে। ত্বকে এসিডিক ফল যেমন লেবু, কমলালেবু বা আনারস ঘষা যাবে না। এগুলো সবসময় মধু, ওটমিল বা দইয়ের সঙ্গে মিশিয়ে ব্যবহার করা ভালো। সংবেদনশীল ত্বকে সাইট্রাস জাতীয় ফল ব্যবহার করা ঠিক নয়। কারণ ব্রণ বা কাটা দাগ থাকলে এসিডিক ফল ত্বকে প্রচণ্ড অস্বস্তি তৈরি করতে পারে।
ফলের পেস্ট বা প্যাক মুখে লাগিয়ে ১৫-২০ মিনিটের বেশি রাখা উচিত নয়। বেশিক্ষণ রাখলে ত্বকের স্বাভাবিক আর্দ্রতা নষ্ট হতে পারে। ফলের ফেসমাস্ক ব্যবহারের পর সঙ্গে সঙ্গে কড়া রোদে বের হওয়া ঠিক নয়। বের হলে হিতে বিপরীত হতে পারে। আবার ফলের খোসা দিয়ে রূপচর্চা করলেও, তা ভালোভাবে পরিষ্কার করে ও
শুকিয়ে নিতে হবে।
যেকোনো নতুন ফলের প্যাক লাগানোর আগে প্যাচ টেস্ট করুন। এজন্য কানের পেছনের অংশে বা হাতের ত্বকে লাগিয়ে ২০ মিনিট অপেক্ষা করুন। র্যাশ, চুলকানি, জ্বালা না হলে তবেই তা মুখে ব্যবহার করুন
ফলের মৌসুমে ত্বকের যত্নের সেরা উপাদান হতে পারে ফল। ফেস মাস্ক, প্যাক তো বটেই, তাজা ফলের রসও লাগাতে পারেন মুখে। একেক ফলের একেক উপকার রয়েছে। ভিটামিন সি, আয়রন ও প্রাকৃতিক অ্যান্টিঅক্সিডেন্টসমৃদ্ধ ফল ত্বককে ভেতর থেকে পুষ্টি জোগাবে। বাজারের বিভিন্ন প্রসাধনীর চেয়েও তাজা ফল দিয়ে রূপচর্চা করলে বেশি উপকার মিলবে বৈকি।
শোভন’স মেকওভারের স্বত্বাধিকারী শোভন সাহা বলেন, ‘মৌসুমি ফল আমাদের শরীরের জন্য অনেক উপকারী। কারণ এতে প্রচুর পরিমাণে ভিটামিন থাকে, যা আমাদের ত্বক, চুল এবং নখের স্বাস্থ্যের দারুণ উন্নতি ঘটায়। তবে খাওয়ার পাশাপাশি কিছু কিছু ফল যেমন আম, মাল্টা, ড্রাগন ইত্যাদি সরাসরি আমরা রূপচর্চার কাজেও ব্যবহার করতে পারি।’ তিনি জানান, আজকাল বাজারে বেশ কিছু আধুনিক মাস্ক মেকার মেশিন পাওয়া যায়। এটির ভেতরে আপনার পছন্দমতো ফলের পাল্প বা রস যেমন ড্রাগন ফল বা মাল্টা দিয়ে দিলে মেশিনটি স্বয়ংক্রিয়ভাবে আপনাকে একটি প্রাকৃতিক শিট মাস্ক তৈরি করে দেয়। এটি কিছুক্ষণ মুখে লাগিয়ে তারপর মুখ ধুয়ে নিলে ত্বকের ঔজ্জ্বল্য বাড়বে। একইভাবে লিচুর রস বা আপেলের রস ব্যবহার করেও ত্বকের জন্য মাস্ক তৈরি করা সম্ভব। আবার ঘরোয়া পদ্ধতিতে ফেসপ্যাক তৈরি করতে চাইলে, এক চামচ আমের পাল্প, এক চামচ মুলতানি মাটি এবং সামান্য পরিমাণ মধু একসঙ্গে খুব ভালো করে মিশিয়ে প্যাক তৈরি করে নেবেন। এটি মুখে লাগিয়ে কিছুক্ষণ রেখে এরপর ধুয়ে ফেলবেন। এর পাশাপাশি ত্বকের রোদে পোড়া দাগ বা কালচে ভাব দূর করতে এক চামচ মাল্টার রস, এক চামচ টক দই এবং এক বা দুই চামচ ওটস একসঙ্গে খুব ভালো করে মিশিয়ে প্রাকৃতিক স্ক্রাবার তৈরি করে নিতে পারেন; যা ত্বকে হালকা হাতে ম্যাসাজ করলে ত্বকের গভীর থেকে ময়লা পরিষ্কার হওয়ার পাশাপাশি জেদি ট্যান দূর করতে দারুণ সাহায্য করে।
ত্বকের সুরক্ষায় কোন ফল কীভাবে ব্যবহার করা যায় জেনে নিন–
ত্বকের উজ্জ্বলতায় আম
এ সময় সবচেয়ে জনপ্রিয় ফল আম। এতে রয়েছে ভিটামিন-এ, ভিটামিন-সি, ভিটামিন-ই এবং প্রচুর অ্যান্টিঅক্সিডেন্ট, যা ত্বকের স্বাভাবিক উজ্জ্বলতা ধরে রাখতে সাহায্য করে। দুই টেবিল চামচ পাকা আমের শাঁসের সঙ্গে এক চা চামচ মধু এবং কয়েক ফোঁটা দুধ মিশিয়ে প্যাক বানিয়ে নিন। মুখে লাগিয়ে ১৫ মিনিট অপেক্ষা করুন। এরপর ঠান্ডা পানি দিয়ে ধুয়ে ফেলুন। সপ্তাহে এক থেকে দুবার ব্যবহার করলে ত্বক হবে কোমল এবং সতেজ। শুষ্ক ত্বকের জন্য এই প্যাকটি বিশেষভাবে উপকারী।
তেলতেলে ত্বকের যত্নে জাম
জামে রয়েছে ভিটামিন-সি, আয়রন ও প্রাকৃতিক অ্যান্টিঅক্সিডেন্ট। কয়েকটি পাকা জামের শাঁস চটকে তার সঙ্গে এক চা চামচ টক দই ও সামান্য বেসন মিশিয়ে ফেসপ্যাক তৈরি করুন। ১০ থেকে ১৫ মিনিট মুখে রেখে ধুয়ে ফেলুন। এটির নিয়মিত ব্যবহার ত্বককে পরিষ্কার রাখবে এবং ত্বকের অতিরিক্ত তৈলাক্তভাব কমাতে সাহায্য করবে।
প্রাণবন্ত ত্বকের জন্য লিচু
লিচুতে রয়েছে প্রচুর পানি, ভিটামিন-সি ও বিভিন্ন খনিজ উপাদান। গরমে ক্লান্ত ও রোদে পোড়া ত্বককে সতেজ করতে এটি বেশ কার্যকর। কয়েকটি লিচুর শাঁস ব্লেন্ড করে তার সঙ্গে এক চা চামচ গোলাপজল অথবা অ্যালোভেরা জেল মিশিয়ে মুখে লাগান। ১০ মিনিট পর ধুয়ে ফেললে ত্বকে শীতল অনুভূতি আসে এবং ত্বক কিছুটা সতেজ দেখায়।
উজ্জ্বল ও সতেজ ত্বকে মাল্টা
মাল্টায় থাকা ভিটামিন-সি কোলাজেন তৈরিতে সহায়তা করে। এটি ত্বকের তারুণ্য ধরে রাখতে বেশ কার্যকর। মাল্টার রসের সঙ্গে সামান্য মধু মিশিয়ে মুখে লাগিয়ে ১০ মিনিট পর ধুয়ে ফেলুন। তারপর ময়েশ্চারাইজার লাগিয়ে নিন; যাতে ত্বকের আর্দ্রতা বজায় থাকে। তবে সংবেদনশীল ত্বকে সরাসরি মাল্টার রস ব্যবহার না করাই ভালো।
কোমল ত্বকের জন্য আপেল
আপেলে রয়েছে ভিটামিন-এ, সি এবং প্রাকৃতিক ফলের এসিড, যা ত্বককে সতেজ রাখতে সাহায্য করে। একটি আপেল ব্লেন্ড করে তার সঙ্গে এক চা চামচ মধু মিশিয়ে মুখে লাগান। ১৫ মিনিট পর ধুয়ে ফেলুন। এটি ত্বকের আর্দ্রতা বজায় রাখতে সাহায্য করে এবং ত্বকের কোমলভাব ধরে রাখে।
গরমে প্রশান্তি দেয় ড্রাগন ফল
ড্রাগন ফলে রয়েছে প্রচুর অ্যান্টিঅক্সিডেন্ট, ভিটামিন-সি এবং পানি। এর শাঁস চটকে টক দই অথবা অ্যালোভেরা জেলের সঙ্গে মিশিয়ে মুখে লাগালে ত্বকে ঠান্ডা অনুভূত হয়। রোদে বেশি সময় থাকার পর এই প্যাক ব্যবহার করলে ত্বকের ক্লান্তিভাব কিছুটা কমাতে সাহায্য করবে। এটির নিয়মিত ব্যবহারে ত্বককে করে তোলে সতেজ ও প্রাণবন্ত।
আর্দ্রতা ধরে রাখতে নাশপাতি
নাশপাতিতে পানির পরিমাণ অনেক বেশি। তাই এটি ত্বকের স্বাভাবিক আর্দ্রতা বজায় রাখতে সাহায্য করে। নাশপাতির শাঁস ব্লেন্ড করে তার সঙ্গে এক চা চামচ মধু ও কয়েক ফোঁটা গোলাপজল মিশিয়ে মুখে লাগাতে পারেন। ১০ থেকে ১৫ মিনিট পর ধুয়ে ফেলুন। শুষ্ক ত্বকে কোমল ও সতেজভাব ফিরিয়ে আনতে এই প্যাক ব্যবহার করতে পারেন।
কোমল ত্বকে কাঁঠাল
কাঁঠালে রয়েছে ভিটামিন-এ, ভিটামিন-সি এবং অ্যান্টিঅক্সিডেন্ট। কয়েক কোয়া পাকা কাঁঠালের শাঁস চটকে তার সঙ্গে এক চা চামচ দুধ বা মধু মিশিয়ে ফেসপ্যাক তৈরি করে নিন। এরপর এটি মুখে লাগিয়ে ১০ থেকে ১৫ মিনিট পর ধুয়ে ফেলুন। এটি ত্বককে নরম ও মসৃণ রাখবে।
সতেজতায় আনারস
আনারসে থাকা ব্রোমেলাইন এনজাইম ত্বকের মৃত কোষ দূর করতে সহায়ক। আনারসের রসের সঙ্গে মধু বা টক দই মিশিয়ে প্যাক বানিয়ে নিন। তারপর মুখে লাগিয়ে ৫-৭ মিনিট রেখে পরিষ্কার পানি দিয়ে ধুয়ে ফেলুন। এটি ত্বককে সতেজ রাখতে সাহায্য করবে। সংবেদনশীল ত্বকে ব্যবহারের আগে অবশ্যই প্যাচ টেস্ট করে নিতে হবে।
রাজিয়া’স মেকওভারের স্বত্বাধিকারী ও রূপবিশেষজ্ঞ রাজিয়া সুলতানা বলেন, ‘প্রাকৃতিক ফলের প্যাক ত্বকে পুষ্টি জোগায়, উজ্জ্বলতা বাড়ায় এবং মৃতকোষ দূর করে। উজ্জ্বল ও দাগহীন ত্বকের জন্য পাকা পেঁপে চটকে মধু মিশিয়ে মুখে লাগান। পেঁপের প্যাপেইন মৃতকোষ ও দাগ দূর করে। শুষ্ক ত্বকে অ্যাভোকাডো ও কিউই ব্লেন্ড করে মধু মিশিয়ে মুখে লাগান, ১০ মিনিট রেখে ঠান্ডা পানিতে ধুয়ে ফেলুন। এর অ্যান্টিঅক্সিডেন্ট ত্বক হাইড্রেট করে ও বয়সের ছাপ কমায়। তৈলাক্ত ও ব্রণের ত্বকে কমলা বা মাল্টার জুস, টক দই ও বেসন মিশিয়ে প্যাক তৈরি করুন। এটি ত্বকে লাগিয়ে হালকা ম্যাসাজ করে ধুয়ে ফেলুন। এটিতে থাকা ভিটামিন-সি ত্বকের উজ্জ্বলতা বাড়ায়।’ v
- বিষয় :
- মডেল
