কৃতজ্ঞ হৃদয় প্রশান্ত মন
ভালো থাকতে কৃতজ্ঞতাবোধের অভ্যাস গড়ে তোলা জরুরি
রোকনুজ্জামান খান
প্রকাশ: ০১ জুলাই ২০২৬ | ০৭:১২
| প্রিন্ট সংস্করণ
মানুষ জীবনে যা পায়, তার সঙ্গে আরও পাওয়ার আকাঙ্ক্ষা প্রবল হয়ে ওঠে। জীবনে যা পেয়েছে তার চেয়ে কী পায়নি তা নিয়েই মানুষ বেশি ভাবে। দিন শেষে আমরা থাকি ক্লান্ত, অভিযোগে ভরা, হতাশ। অথচ এ মানসিকতার বদল আনতে পারে একটি ছোট, কিন্তু গুরুত্বপূর্ণ অভ্যাস। সেটি হলো কৃতজ্ঞতাবোধ। এটি কেবল একটি অনুভূতির নাম নয়–এটি এমন এক অভ্যন্তরীণ গুণ, যার চর্চা মানুষকে ধীরে ধীরে মানসিক প্রশান্তির দিকে নিয়ে যায়।
কৃতজ্ঞতার অর্থ শুধু ধন্যবাদ বলা নয়। এর মানে হলো আপনার যা আছে তা স্বীকার করা এবং তাতেই সন্তুষ্টি খুঁজে নেওয়া। এই ছোট মানসিক পরিবর্তনই আপনাকে ভালো থাকতে সাহায্য করবে। জীবনকে যখন আপনি একটু ভিন্নভাবে উপলব্ধি করতে শুরু করবেন, তখন দেখবেন কোনো বস্তুগত-অবস্তুগত চাওয়া-পাওয়ার কমবেশিতে আপনার মন আর তেমনটা খারাপ হচ্ছে না।
কৃতজ্ঞতাবোধের অভ্যাস তৈরি হলে দেখবেন, কারও দুঃসময়ে আপনি হয়তো পাশে দাঁড়াচ্ছেন কিন্তু তার সুখের সময় সে আপনাকে স্মরণ করল কিনা, তা আর আপনাকে ব্যথিত করছে না। আবার আপনার দুঃসময়ে কে পাশে থাকল আর কে থাকল না–সেটাও আর আপনার মানসিক প্রশান্তির শর্ত হয়ে দাঁড়াচ্ছে না। তখন সম্পর্কগুলো আর প্রত্যাশার ভারে নুয়ে থাকে না। জন্ম নেয় এক অদ্ভুত অনুভূতির, কৃতজ্ঞতাবোধ; যা আছে তার জন্য কৃতজ্ঞ, যা নেই তার জন্য আপনার মনে কোনো অশান্তি হবে না।
মনোবিজ্ঞানী মার্টিন সেলিগম্যানের মতে, কৃতজ্ঞতা এমন একটি মানসিক অনুশীলন; যা মানুষকে অভাবকেন্দ্রিক চিন্তা থেকে প্রাপ্তিকেন্দ্রিক চিন্তায় নিয়ে যায় এবং দীর্ঘমেয়াদে সুখ ও মানসিক সুস্থতা বাড়ায়।
কৃতজ্ঞতাবোধ কমে গেলে মানুষ সহজেই ‘যা নেই’ এবং ‘যা পাইনি’ সেই ফোকাসে আটকে যায়। এতে প্রত্যাশা ও তুলনার চাপ বাড়ে আর ধীরে ধীরে নিজের মানসিক স্থিতি বাইরের আচরণ ও স্বীকৃতির ওপর বেশি নির্ভরশীল হয়ে পড়ে।
অভিযোগ কমিয়ে কৃতজ্ঞতার চর্চা শুরু করলে দৃষ্টিভঙ্গি বদলে যায়! এই চর্চা মানুষকে অভাবের নয়, প্রাপ্তির দিকে তাকাতে শেখায়; তখন মানসিক শান্তির নিয়ন্ত্রণ অন্যের আচরণ বা পরিস্থিতির হাতে না থেকে ক্রমেই নিজের হাতে ফিরে আসে। সেখান থেকেই শুরু হয় প্রকৃত মানসিক স্বাধীনতা।
কৃতজ্ঞতার চর্চা যেভাবে শুরু করতে পারেন–
গ্র্যাটিটিউড জার্নালিং
এটি একটি দারুণ অনুশীলন। প্রতিদিন বা সপ্তাহে কয়েকদিন তিন-পাঁচটি বিষয় লিখুন, যার জন্য আপনি কৃতজ্ঞ। বিষয়গুলো বড় কিছু হতে হবে এমনটা নয়–এক কাপ চা, কারও হাসি মুখ, সুস্থ শরীর বা একটি সুন্দর সকালও হতে পারে ।
প্রাপ্তিগুলোর দিকে তাকান
যা নেই তার দিকে নয়, যা আছে তার দিকে মনোযোগ দিন। প্রতিদিন কিছু সময় নিয়ে নিজের জীবনের প্রাপ্তি, সুযোগ, সম্ভাবনা ও সম্পর্কগুলো সম্পর্কে চিন্তা করুন।
কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করুন
যাদের প্রতি কৃতজ্ঞতা অনুভব করেন, তাদের সরাসরি ধন্যবাদ জানান। এটি শুধু নিজের নয়, অন্যের মানসিক সুস্থতাও বাড়ায়। কোনো পরিস্থিতি বা বস্তুগত বিষয়; যা আপনার ভালো লাগার কারণ–সেটির প্রতিও কৃতজ্ঞ থাকুন।
দিন শেষে ভালো ঘটনাগুলো স্মরণ করুন
ঘুমানোর আগে ভাবুন, আজ কী কী ভালো ঘটনা ঘটেছে এবং কেন ঘটেছে। এটি মস্তিষ্ককে নেতিবাচকতার পরিবর্তে ইতিবাচক দিকগুলো খুঁজে দেখতে প্রশিক্ষিত করে তোলে।
অর্থাৎ মানুষকে কৃতজ্ঞ করে তোলে। শুধু ভালো কিছু পাওয়া নয়; বরং ভালো কিছু পাওয়ার বিষয়টি সচেতনভাবে উপলব্ধি করা, তার মূল্য বুঝতে পারা এবং এর পেছনে থাকা অবদানকে স্বীকার করা।
এ কারণেই দুজন মানুষ একই সুযোগ পেলেও একজন কৃতজ্ঞ হতে পারে, অন্যজন নাও হতে পারে। পার্থক্যটি প্রাপ্তিতে নয়, প্রাপ্তির প্রতি তাদের দৃষ্টিভঙ্গিতে।
মনে রাখা জরুরি, কৃতজ্ঞতা মানে জীবনের কষ্ট বা সমস্যাকে অস্বীকার করা নয়; বরং কষ্টের মধ্যেও যা আছে, যা পেয়েছেন এবং যা এখনও মূল্যবান– সেগুলোকে সচেতনভাবে স্বীকার করা। এই চর্চাই ধীরে ধীরে অভিযোগ, হতাশা ও মানসিক নির্ভরতা কমিয়ে অভ্যন্তরীণ শান্তি ও মানসিক স্বাধীনতা বাড়াতে সাহায্য করবে।
লেখক: সাইকোলজিক্যাল কাউন্সেলর, সিডিডি
- বিষয় :
- জীবন
