ঝরনায় অবগাহনে
দূর থেকে ঝরনার অপরূপ সৌন্দর্য মন কেড়ে নেয়
মুহাম্মদ জাভেদ হাকিম
প্রকাশ: ২৬ আগস্ট ২০২৬ | ০৮:০৯
| প্রিন্ট সংস্করণ
উঁচু পাহাড়। গভীর অরণ্য। দিগন্তছোঁয়া গাছগাছালি। বানর, উল্লুকের হাঁকডাক। দিনদুপুরেই ঝিঁঝি পোকার মন্ত্রমুগ্ধ শব্দ। শিলাকূপের গভীরতায় ঝিরির নিঃশব্দ জমে থাকা শীতল পানি। কখনও দূর থেকে ভেসে আসা ঝরনার গান। কখনওবা কলকল শব্দ তুলে ঝিরির স্বচ্ছ জলের অবিরাম ছুটে চলা। যেতে যেতে একটা সময় আপনাকে নৈঃশব্দ ঘিরে ফেলবে। এমনি মায়াবী পরিবেশে প্রকৃতির মধ্যে ডুবে মন-প্রাণ বিলীন হয়ে যাওয়ার পর চেতনা ফিরে আসবে মহিষা আর টাইগার জোঁকের উৎপাতে। তবুও গহিন থেকে আরও গহিনে যেতে কোনো বাধাই বাধা মনে হবে না। বলছিলাম সীমান্তঘেঁষা আদিম পাথারিয়া পাহাড়ের কথা। কয়েকদিন আগেই ঘুরে এলাম প্রকৃতির মায়াময় এ স্থান থেকে।
দে-ছুট ভ্রমণ সংগঠনের বন্ধুরা একদিন রাতের গাড়িতে চলে গেলাম মৌলভীবাজার জেলার বড়লেখা উপজেলার ডিমাই বাজার। তীব্র জ্যামে গাড়ি পৌঁছায় নির্ধারিত সময়ের অনেক পর। তাও রক্ষা যে গাইড সময়মতোই হাজির ছিল। সময় নষ্ট না করে সিএনজিচালিত অটোরিকশায় চেপে দ্রুত রওনা হই আহমদপুর গ্রামের পথে। সেখানে পৌঁছে বাহন ছেড়ে হেঁটে ডিমাই গ্রাম পেরিয়ে মোকামপুঞ্জি ধরে এগোতে থাকি। সুনসান নীরবতা যেন চারপাশ গ্রাস করেছে। একটু এগোতেই ঝরনার গান কানে ভেসে আসে। পাথুরে ঝিরিতে ক্ষিপ্রগতি তুলে বয়ে যাচ্ছে স্বচ্ছ পানি। চোখেমুখে ছিটাতেই উবে যায় ক্লান্তি।
হালকা নাশতা সেরে পুরোদমে আবারও হাইকিং। শুরুতেই চোখে পড়ে ঝেরঝেরি ঝরনা। বুনো পরিবেশে বেশ উঁচু পাহাড় থেকে দুপাশ দিয়ে ছড়িয়ে পড়ছে পানি। প্রথম দেখাতেই মন ছুঁয়ে যায়। ঝরনার স্বচ্ছ জলে ভেজার লোভ সামলাতে না পেরে ইচ্ছেমতো ভিজি। সবাই মিলে মেতে উঠি জলকেলিতে। গাইড জানায়, সামনে রয়েছে আরও কয়েকটা ঝরনা। তাই বেশি দেরি না করে আবারও শুরু হয় হাইকিং। অল্প কিছু দূর যেতেই চোখ আটকায় পানজুমাই ঝরনায়। কাছাকাছি পৌঁছতেই এর সৌন্দর্য আমাদের বিমোহিত করে। পানজুমাইর শীতল আলিঙ্গনে প্রকৃতির সঙ্গে একাত্ম হয়ে যাই।
পানজুমাই ঝরনার ওপর সত্যিই অসাধারণ সৌন্দর্যে ঘেরা। পাহাড়ের গায়ে রয়্যাল বেঙ্গলের মতো ডোরাকাটা সোনালি রেখা। গলাসমান টলটলে পানি। বেশ কিছুক্ষণ সাঁতার কেটে সুড়ঙ্গের মতো পাহাড়ের চিপা দিয়ে চলে আরও ওপরে ওঠার প্রস্তুতি। কিছু দূর যেতেই বাধা হয়ে দাঁড়ায় শতশত টাইগার জোঁকের ঝাঁক। গাইডের পরামর্শে আর দুঃসাহস না দেখিয়ে ছুটলাম পানবাগিছার ডর ঝরনার দিকে। খুবই শান্তভাবে অবিরাম ধারায় রিমঝিম ছন্দ তুলে, ঝরনার স্বচ্ছ টলটলে পানি বয়ে চলছে পানবাগিছার ডর ঝরনা থেকে। চারদিকের পরিবেশ অদ্ভুত শান্ত, নিস্তব্ধ। ভেজার উল্লাসে না মেতে নয়ন ভরে এই ঝরনার রূপ উপভোগ করে এগিয়ে যাই সঞ্জীত ঝরনার দিকে। এরই মধ্যে শুরু হলো টিপটিপ বৃষ্টি। পাহাড়ের মাটি পিচ্ছিল হয়ে উঠছিল। জোঁকের উপদ্রবও বেড়ে গেল কয়েকগুণ। এ অবস্থাতেই ঝোপঝাড় পেরিয়ে আমরা পৌঁছে গেলাম সঞ্জীত ঝরনার প্রান্তরে। পাহাড়ের ওপর থেকে কিছুটা নিচে নেমে, ঝরনার গায়ে নিজেদের দেহটা আলতো করে মিলিয়ে দিতে আটকে গেলাম প্রকৃতির মায়াজালে।
সন্ধ্যা নেমে এলো। এবার ছুটলাম আরেক পাহাড়ের ওপর থাকা জুমঘরে। রাতটা সেখানেই কাটাব। সেখানে পৌঁছে মাথাটা এলোমেলো হয়ে গেল। ঘরের অবস্থা দেখে মনে হলো গত এক বছরেও কেউ এখানে রাত কাটায়নি। কিন্তু কী আর করা? লোকালয়ে ফেরারও কোনো সুযোগ নেই। ভয়ংকর এক রাতযাপনের অভিজ্ঞতা ভ্রমণ ঝুলি সমৃদ্ধ করল। পাখিডাকা ভোরে আশপাশের নৈসর্গিক পরিবেশ মন মেজাজ শান্ত করে দিল। বারান্দায় দাঁড়িয়ে উল্লুকের হাঁকডাক বেশ লাগল।
একটু বেলা হতেই আতর বাগান ছাড়িয়ে ছুটলাম কাঁকড়াছড়া ঝরনার প্রান্তরে। হাইকিং ট্র্যাকিং করতে করতে ঢুকে যাই বুনো এক ঝিরিতে। পাথারিয়ার পাহাড়ের প্রতিটি পরতে পরতে লুকিয়ে প্রকৃতির অপার বিস্ময়। ঝিরির পথটাতে থাকা গাছে গাছে বিশাল সাইজের পাকা ডুমুর, যা দেখতে একেকটা বড়সড় লাল টসটসে আনারের মতো। অন্যান্য ঝিরির চেয়ে কাঁকড়াছড়া ঝিরির পাথরগুলো বেশ বড় ও গোলাকার। এমনি নজরকাড়া ঝিরিপথ ধরে যেতে যেতে পৌঁছে যাই কাঁকড়াছড়া ঝরনার প্রান্তরে। এ ঝরনার প্রাকৃতিক সৌন্দর্যের বর্ণনা কোন দিক থেকে শুরু করব, তা ভাবতেই অনেকটা সময় কেটে যায়। আসলে নিজের চোখে দেখা ছাড়া এর সৌন্দর্য বর্ণনা করা যায় না। প্রকৃতির সঙ্গে একাত্ম হতে কাঁকড়াছড়া ঝরনায় অবগাহনে মেতে উঠি সবাই। হুট করেই আকাশ মেঘলা হয়ে গর্জন শুরু করতেই, হরকা বানের ভয়ে দ্রুত ফিরতি পথ ধরি।
যাতায়াত: ঢাকার সায়েদাবাদ থেকে দিনে-রাতে মৌলভীবাজার জেলার বড়লেখা উপজেলায় বিভিন্ন পরিবহনের বাস ছেড়ে যায়। বাস থেকে বড়লেখা উপজেলার ডিমাই বাজার নেমে যেতে হবে। সেখান থেকে সিএনজিচালিত অটোরিকশা করে আহমেদপুর গ্রাম। এরপর স্থানীয় কাউকে সঙ্গে নিয়ে হাইকিং-ট্র্যাকিং।
থাকা-খাওয়া: উপজেলা সদরে বেশ কিছু মানভেদে আবাসিক ও খাবার হোটেল রয়েছে।
- বিষয় :
- ভ্রমণ