ঢাকা শুক্রবার, ০৫ জুন ২০২৬

কমছে না নারী নির্যাতন

কমছে না নারী নির্যাতন
×

অলংকরণ :: বোরহান আজাদ

শাহেরীন আরাফাত

প্রকাশ: ১৯ অক্টোবর ২০২৪ | ২৩:৪৬ | আপডেট: ২০ অক্টোবর ২০২৪ | ১২:১৪

বাংলাদেশে নারী নির্যাতন প্রতিরোধে অনেক কঠোর আইন হয়েছে, কিন্তু আইনের প্রয়োগ সীমিত। আবার সামাজিকভাবে শক্ত প্রতিরোধ না থাকায় ৫ আগস্ট সরকার পতনের পরও নারীর প্রতি সহিংসতা নিয়ন্ত্রণ করা যায়নি। পরিবার বা রাস্তাঘাটে নারী নিজেকে নিরাপদ করতে পারছেন না। অনেক ক্ষেত্রে নির্যাতনের জন্য নারীকেই দোষারোপ করার মানসিকতা দেখা যায়। ফলে দেশে খুন, ধর্ষণ ও যৌন হেনস্তার মতো গুরুতর অপরাধ কমছে না। লিখেছেন শাহেরীন আরাফাত

সেপ্টেম্বরের ১৮ তারিখ বরিশালের একটি ইঞ্জিনিয়ারিং কলেজের শিক্ষার্থী কিশোরগঞ্জে নিজ বাড়িতে ফিরছিলেন। বাস থেকে ভৈরবে নেমে রাতে কোনো বাস না পাওয়ায় তিনি সিএনজিচালিত অটোরিকশায় ওঠেন। অন্য যাত্রীরা নেমে যাওয়ার পর এক পর্যায়ে অটোরিকশার চালক ও তার সহযোগী ওই কলেজছাত্রীকে সংঘবদ্ধ ধর্ষণ করে বলে ভুক্তভোগী পরদিন থানায় মামলা করেন।

ত্রাণ দেওয়ার কথা শুনে নারায়ণগঞ্জের ফতুল্লা থেকে কয়েকজন নারীর সঙ্গে ঢাকায় এসেছিলেন ৬৫ বছর বয়সী এক নারী। রাজধানীর সোহরাওয়ার্দী উদ্যান থেকে গত ৮ সেপ্টেম্বর উদ্ধার করা হয় ধর্ষণের শিকার ওই নারীকে। শাহবাগ থানার পুলিশ হাসপাতাল থেকে অনুমতি পেয়ে প্রবীণ ওই নারীকে নিয়ে ফতুল্লা ঘুরেও পরিবারের খোঁজ পায়নি। পরে ১০ সেপ্টেম্বর পুলিশ বাদী হয়ে সংঘবদ্ধ ধর্ষণের অভিযোগে অজ্ঞাতনামা কয়েকজনকে আসামি করে মামলা করে।

নোয়াখালীর সুবর্ণচর উপজেলায় এক গৃহবধূকে হাত-পা বেঁধে নির্যাতনের অভিযোগ উঠেছে শ্বশুরবাড়ির লোকজনের বিরুদ্ধে। গত ১৩ আগস্ট মঙ্গলবার দিবাগত রাতে উপজেলার পূর্ব চরবাটা ইউনিয়নে এ ঘটনা ঘটে। একটি ভিডিও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়লে ২৫ সেপ্টেম্বর চরজব্বর থানার পুলিশ অভিযান চালিয়ে ৯ জনকে আটক করে।

সেপ্টেম্বরের প্রথম দিকে কক্সবাজার সমুদ্রসৈকতে দুই তরুণীকে লাঠি দিয়ে বেধড়ক মারধর, কান ধরে ওঠবসসহ হেনস্তার ভিডিও ছড়িয়ে পড়ে। এ নিয়ে বিভিন্ন মহল থেকে সমালোচনার পর গ্রেপ্তার হয় এ ঘটনায় মূলহোতা ফারুকুল ইসলাম।

এসব কোনো বিচ্ছিন্ন ঘটনা নয়; আমাদের সমাজেরই চিত্র। সমাজে বিদ্যমান নারীবিদ্বেষ শুধু আইন দিয়ে যে নিয়ন্ত্রণ করা সম্ভব না, এটি তারই প্রমাণ। কোনো নারী পারিবারিক নির্যাতনের শিকার হলে তাঁকে মানিয়ে নিতে বলা হয়। আবার যৌন হেনস্তা বা ধর্ষণের শিকার হলে ওই মেয়ে বা নারীর চরিত্র এবং রাস্তায় একা বের হওয়া নিয়ে কটূক্তি শুনতে হয়। এ ক্ষেত্রে শক্তিশালী সামাজিক প্রতিরোধ ও সচেতনতাকে মূলে রেখে নারী নির্যাতন প্রতিরোধের নীতিমালা প্রণয়নের কথা বলছেন বিশ্লেষকরা।

বাংলাদেশ জাতীয় মহিলা আইনজীবী সমিতির (বিএনডব্লিউএলএ) সভাপতি সালমা আলী বলেন, ‘আমাদের পুরুষতান্ত্রিক সমাজ ব্যবস্থায় নারীকে শারীরিক-মানসিকভাবে হেয় করার দৃষ্টিভঙ্গি একজন মানুষ ছোটবেলা থেকেই ধারণ করে আসছে। এখন তো থানাগুলো সব খালি। নারী নির্যাতন নিয়ে বিচার অনেকটা রয়েসয়ে করলেও চলবে, এমন চিন্তা সমাজে বিদ্যমান। গত সরকারের আমলে ক্ষমতাসীন দলের ছাত্র ও যুব সংগঠনের নেতাকর্মী এবং তাদের সহযোগীরা এসব অপকর্মের সঙ্গে ব্যাপক হারে জড়িত থাকলেও বিচারের আওতায় আসেনি। আমরা আবার এমন কিছু চাই না। থানাগুলোকে ঢেলে সাজাতে হবে, নারীর জন্য আলাদা কর্নার করতে হবে। এ রকম কতগুলো মামলায় যদি দ্রুত ও যথাযথ বিচার নিশ্চিত করা যায়, তাহলে তা সমাজে একটা বার্তা দেবে। এ রকম একটা আন্দোলনের পরে আইনশৃঙ্খলা স্বাভাবিক রাখা কঠিন। তবে নারীরা যে নির্যাতনের শিকার হচ্ছেন, এটা কোনোভাবে মেনে নেওয়া যায় না, এর প্রতিবাদ হতে হবে।’

আইনের প্রাসঙ্গিকতা ও সামাজিক উদ্যোগ নিয়ে তিনি বলেন, ‘আমাদের দেশে অনেক আইন নারীবান্ধব নয়; কিন্তু অনেক আইন আছে, যার প্রয়োগ নেই। যথাযথ প্রয়োগ হলেও তা নারী নির্যাতন নিয়ন্ত্রণে সহায়ক হতে পারত। এ জন্য শুধু আইন করলেই সমাধান হবে না। আমরা যে নারীবান্ধব, শিশুবান্ধব পরিবেশ চাই; তার জন্য সামাজিক পরিসরে কাজ করা জরুরি। এ ক্ষেত্রে অঞ্চলভিত্তিক যৌন নিপীড়নবিরোধী কমিটি বানানো হতে পারে একটা ভালো পদক্ষেপ।’

নারীপক্ষের সদস্য রীতা দাস রায় বলেন, ‘নারী নির্যাতন তো সমাজের কারও অগ্রাধিকার তালিকায় নেই। আমরা সামাজিক আচরণবিধিতে হাত দিই না। একটা ভবনের ভিত্তিটাই প্রধান বিষয়। ভিত্তিতে হাত না দিয়ে ওপর দিকটা সাজালে কাজ হবে না। আমরা দেখেছি, যতই সরকারের পরিবর্তন হোক না কেন, নারীর ওপর নির্যাতনে কিন্তু স্থান, কাল, পাত্র ভেদ হয় না। নারী সব সময় নির্যাতনের শিকার হন। যে কোনো আন্দোলন-সংগ্রামের পরে নারী ও শিশু সবচেয়ে বেশি নির্যাতনের শিকার হয়। এখানে বৈষম্যবিরোধী আন্দোলনে নারী নেত্রীরাই তো হারিয়ে যেতে বসেছেন। সম্মিলিতভাবে যদি রাজনৈতিক আকাঙ্ক্ষা না থাকে, তাহলে সরকার, আইন, নীতি পরিবর্তন হলেও কোনো লাভ নেই। এতে নারীর জীবনে কোনো পরিবর্তন ঘটবে না।’

নারী নির্যাতন প্রতিরোধে করণীয় সম্পর্কে তিনি বলেন, ‘কমিউনিটিভিত্তিক উদ্যোগ দরকার। পাড়া, মহল্লা, গ্রামে প্রতিরোধ গড়ে তুলতে হবে। এটা শুধু ঢাকায় বসে হবে না। গ্রামে গ্রামে প্রতিরোধ গড়ে তুলতে হবে, সমাজের অন্যায়ের বিরুদ্ধে দাঁড়াতে হবে। শাস্তি দিলে অন্যায় কমে যাবে, এটা ভুল চিন্তা। কেন এই অন্যায় হচ্ছে, সেটি বের করে প্রতিরোধ গড়ে তুলতে হবে। আমরা যারা বেসরকারি পর্যায়ে আছি তারা আসলে সম্মিলিত উদ্যোগ নিতে ব্যর্থ হই। সরকারি ক্ষেত্রেও সম্মিলিত উদ্যোগ দেখা যায় না। অথচ নারীর ওপর সহিংসতার ক্ষেত্রে সম্মিলিত উদ্যোগ ছাড়া কিছু অর্জন সম্ভব না।’

আরও পড়ুন

×