বিশ্ব মানবিকতা দিবস-২০২৫
প্রশ্নবিদ্ধ আমাদের বিবেক
.
শাহেরীন আরাফাত
প্রকাশ: ১৭ আগস্ট ২০২৫ | ০০:৩৯ | আপডেট: ১৭ আগস্ট ২০২৫ | ১৬:০২
২০২৫ সালের ১৯ আগস্ট উদাযাপিত হবে ‘বিশ্ব মানবিকতা দিবস’। এবারের প্রতিপাদ্য– ‘বিশ্বব্যাপী সংহতি জোরদার এবং স্থানীয় সম্প্রদায়ের ক্ষমতায়ন’। এই প্রতিপাদ্যের মূল বার্তা হলো-সহায়তার প্রাপক হিসেবে নয়; বরং অংশীদার, সিদ্ধান্ত গ্রহণকারী ও নিজেদের ভবিষ্যতের নিয়ন্ত্রক হিসেবে স্থানীয় সম্প্রদায়ের সঙ্গে কাজ করা জরুরি। বিশ্বের অন্যান্য দেশের মতো বাংলাদেশেও দিবসটি উদযাপিত হয়; অথচ দেশে মানবিকতা প্রতিনিয়ত প্রশ্নের মুখে পড়ছে। এ ক্ষেত্রে বৈশ্বিক সংহতি ও স্থানীয় সম্প্রদায়ের ক্ষমতায়নও বাস্তবায়িত হতে পারছে না। এবার বিশ্ব মানবিকতা দিবস আমাদের সামনে যখন উপস্থিত, তখন সমাজে এক ভিন্ন মাত্রার অমানবিকতার চিত্র স্পষ্ট–গণপিটুনি। চলতি মাসের প্রথম ১০ দিনে ১৩টি গণপিটুনির ঘটনায় নিহত হয়েছেন ৯ জন। এতে নিঃসন্দেহে প্রশ্নবিদ্ধ হচ্ছে আমাদের মানবিকতা।
গণপিটুনির মতো ঘটনা হঠাৎ করে সামনে আসেনি। ২০২৪ সালের জুলাই গণঅভ্যুত্থানের পর যে আইনশৃঙ্খলার শূন্যতা সৃষ্টি হয়েছে, তারই ফলে আজ আমরা এর ভয়াবহ রূপ দেখছি। গত কয়েক মাসে এমন ঘটনা প্রায় স্বাভাবিক হয়ে দাঁড়িয়েছে! মানবাধিকার সংস্কৃতি ফাউন্ডেশনের (এমএসএফ) তথ্যমতে, ২০২৫ সালের জুলাই মাসে ৫১টি গণপিটুনির ঘটনায় ১৬ জন নিহত ও ৫৩ জন আহত হয়েছেন। এর আগের মাসে ৪১টি ঘটনায় ১০ জন নিহত ও ৪৭ জন আহত হন। আইন ও সালিশ কেন্দ্রের (আসক) হিসাব অনুযায়ী, চলতি বছরের ১ জানুয়ারি থেকে ১০ আগস্ট পর্যন্ত অন্তত ১১১ জন নাগরিক মব সন্ত্রাসের শিকার হয়ে প্রাণ হারিয়েছেন।
গণপিটুনির প্রতিটি ঘটনাই মর্মান্তিক। এর সাম্প্রতিকতম ঘটনাটি সংঘটিত হয় ৯ আগস্ট। গণমাধ্যম সূত্রে জানা যায়, সেদিন রংপুরের তারাগঞ্জ উপজেলায় ভ্যানচোর সন্দেহে দুই ব্যক্তি– ঘনিরামপুর গ্রামের রূপলাল দাস (৪০) ও মিঠাপুকুরের প্রদীপ দাসকে (৩৫) পিটিয়ে হত্যা করা হয়। প্রদীপ ছিলেন রূপলালের ভাগনির স্বামী। রূপলাল জুতা সেলাই করতেন, প্রদীপ ভ্যান চালাতেন। রূপলালের মেয়ের বিয়ের দিন-তারিখ ঠিক করতে প্রদীপ নিজের ভ্যান চালিয়ে শ্বশুরবাড়ির পথে রওনা হন এবং রূপলালকে সঙ্গে নিয়ে বাড়ি ফিরছিলেন। রাত ৯টার দিকে বটতলা এলাকায় স্থানীয় কয়েকজন ভ্যানচোর সন্দেহে তাদের আটকে পেটাতে শুরু করে। পরে জনতা জড়ো হয়ে নির্মমভাবে হত্যা করে। অভিযোগ আছে, পুলিশ ঘটনাস্থলে পৌঁছেও সঙ্গে সঙ্গে ব্যবস্থা না নিয়ে পরে লাশ নিতে আসে। এই ধরনের ঘটনা প্রচলিত আইন বা আন্তর্জাতিক মানবাধিকার মানদণ্ডের দৃষ্টিতে খুবই অগ্রহণযোগ্য এবং নাগরিকের জীবনরক্ষার অধিকার লঙ্ঘনের শামিল।
১১ আগস্ট প্রকাশিত ব্র্যাক ইনস্টিটিউট অব গভর্ন্যান্স অ্যান্ড ডেভেলপমেন্টের (বিআইজিডি) সাম্প্রতিক জরিপ ‘পালস সার্ভে ৩’ অনুযায়ী, দেশের ৮০ শতাংশ মানুষ মব সহিংসতা নিয়ে উদ্বিগ্ন। নারীর নিরাপত্তা নিয়ে উদ্বিগ্ন ৫৬ শতাংশ, রাতে চলাচলের নিরাপত্তা নিয়ে ৬১ শতাংশ এবং পোশাকের কারণে রাস্তায় হয়রানি নিয়ে ৬৭ শতাংশ মানুষ উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন।
গুম তদন্ত কমিশনের সদস্য ও মানবাধিকারকর্মী নূর খান লিটন মনে করেন, মব সহিংসতার পেছনে রাজনৈতিক দুর্বৃত্তায়নও বড় ভূমিকা রাখছে। আইনশৃঙ্খলা বাহিনী ও আদালতের পর্যায়েও মব-ভীতি কাজ করছে। ফলে পুলিশ অনেক সময় যথাযথ ভূমিকা রাখতে সাহস পাচ্ছে না। তাঁর মতে, এই পরিস্থিতি থেকে উত্তরণের জন্য সরকারের শক্ত ও দৃশ্যমান পদক্ষেপ জরুরি, কিন্তু সরকারের অবস্থান দুর্বল ও বিভ্রান্তিকর। গত বছরের জুলাই গণঅভ্যুত্থানে সহস্রাধিক মানুষ শহীদ হয়েছিলেন। সে সময় পুলিশসহ বিভিন্ন আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর ভূমিকা বিতর্কিত হয়। পুলিশ অনুপস্থিত থাকলেও সাধারণ মানুষের ঐক্যবদ্ধ প্রয়াসে তখন বড় বিপর্যয় এড়ানো গিয়েছিল। তবে সেই শূন্যতা মব সন্ত্রাসকে উস্কে দিয়েছে। আইন উপদেষ্টা আসিফ নজরুল বলেন, ‘মব সন্ত্রাস দমন না হওয়ার পেছনে পুলিশের নৈতিক অবস্থানের সংকট আছে। যে পুলিশ গণঅভ্যুত্থানের প্রতিপক্ষ ছিল, তারা যখন দেখে আন্দোলনপন্থি কিছু লোক মব গঠন করছে, তখন দমন করতে পারেনি।’
এসব ঘটনায় জড়িতদের বিরুদ্ধে আইনগত পদক্ষেপের অভাব, ভুক্তভোগী পরিবারের প্রতি মানবিক আচরণের ঘাটতি এবং বিচারহীনতার সংস্কৃতি সামাজিক নৈরাজ্যকে দীর্ঘস্থায়ী করছে। বিশ্লেষকদের মতে, এই পরিস্থিতি সামাজিক সম্প্রীতি ও সদ্ভাবকে ভয়াবহভাবে আঘাত করছে। সংঘবদ্ধ প্ররোচনামূলক কর্মকাণ্ডে জড়িত গোষ্ঠী বা ব্যক্তিদের কঠোর জবাবদিহির আওতায় আনা এখন সময়ের দাবি।
