হলবন্দি নারী শিক্ষার্থীর জীবন
গ্রাফিক্স :: বোরহান আজাদ
সাকিব মাহমুদ
প্রকাশ: ১৭ আগস্ট ২০২৫ | ০০:৪২ | আপডেট: ১৭ আগস্ট ২০২৫ | ১৬:১৫
২০২৪ সালের জুলাই গণঅভ্যুত্থানে নারীরা শুধু অংশ নেননি, তারা নেতৃত্ব দিয়েছেন স্লোগানে, রক্তে, প্রতিরোধে। তারা ছিলেন রাজপথের আগুন, আন্দোলনের প্রাণ। অথচ সেই অগ্নিমূর্তির পেছনে আজও রয়ে গেছে দীর্ঘশ্বাস। কারণ, রাষ্ট্র সংস্কারের অনেক বক্তব্য সামনে এলেও নারীর বাস্তবতা বদলায়নি। যে নারী শিক্ষার্থীরা হলের তালা ভেঙে রাজপথে নেমে স্লোগান দিয়ে গণঅভ্যুত্থানের মোড় ঘুরিয়ে দিয়েছিলেন, সেই হলগুলো এখনও রাত হলেই তালাবন্দি হয়ে পড়ে। অথচ পুরুষ শিক্ষার্থীদের হলে এমন তালাবন্দি অবস্থা দেখা যায় না। আবার ঢাকার অদূরে জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ে নারী শিক্ষার্থীদের হলগুলো এমন তালাবন্দি থাকতে দেখা যায় না।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় পরিচিতি পেয়েছে প্রাচ্যের অক্সফোর্ড হিসেবে; অথচ পাশ্চাত্যের অক্সফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের ওয়েবসাইট থেকে জানা যায়, সেখানে নারী বা পুরুষ শিক্ষার্থীর হোস্টেলে কোনো ভিন্নতা নেই। শিক্ষার্থী পরিচয়পত্র নিয়ে তারা যে কোনো সময় হোস্টেল থেকে বের হতে পারেন বা ফিরে আসতে পারেন। খোঁজ নিয়ে জানা যায়, ভারতের রাজধানী নয়াদিল্লির জওহরলাল নেহরু বিশ্ববিদ্যালয়, কলকাতার যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয় বা পন্ডিচেরি বিশ্ববিদ্যালয়েও শিক্ষার্থীদের হোস্টেলে আসা-যাওয়ার ক্ষেত্রে ধরাবাঁধা কোনো নিয়ম নেই। বেশির ভাগ বিশ্ববিদ্যালয়ে রাত ১০টার পর বহিরাগত কেউ হোস্টেলে থাকতে পারেন না। তবে অন্য হোস্টেলের শিক্ষার্থীরাও আসা-যাওয়া করতে পারেন।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী তানজিলা বর্ষা জানান, ‘‘জুলাই গণঅভ্যুত্থানে মেয়েদের অপ্রতিরোধ্য অবস্থান ছিল দৃশ্যমান। অথচ ‘জুলাই-কন্যা দিবস’ আন্দোলনের সেই স্পিরিট ধারণ করতে পারেনি। শুধু বলা হয়েছে ১৪ জুলাই, একটি দিন মেয়েরা নিজেদের ক্যাম্পাসে স্বাধীন। বাস্তবতা কতটুকু বদলেছে? সবকিছু যেন রয়ে গেছে আগের মতোই। একই নিয়ম, একই শর্ত, একই গেটের তালা। শুধু উৎসবের আলোকছায়া একটু ঘন হয়েছে আর এই ‘একদিনের স্বাধীনতা’। যেটি আমাদের দীর্ঘ আন্দোলনের প্রাপ্য ছিল, তা এক বছর পরও পূর্ণভাবে আমাদের কাছে আসেনি। আজও আমরা বিষণ্ন হয়ে এই এক রাত দিয়েই সেই না-পাওয়ার ঢাক পেটাই যে, আজ শুধু এ রাতটাই স্বাধীন।’’
মেয়েদের এসব দাবিকে অনেকেই ‘অতিরিক্ত চাওয়া’ বলে অভিহিত করতে দেখা যায়। মেয়েরা একটু বেশি সময় বাইরে থাকতে চাইলেই প্রথমে সন্দেহ জাগে, তারপর আসে নিষেধ। রাত ১০টার পর একজন ছাত্রী বাইরে থাকলে, তাকে ‘প্রশ্নবিদ্ধ নারী’ হিসেবে দেখা হয়।
সরেজমিন দেখা যায়, একজন ছাত্র চাইলে লাইব্রেরি থেকে রাত ৩টায় ফিরতে পারে; সেখানে ছাত্রীদের রাত ১০টার পর হলে ঢোকার অনুমতি মেলে না। ছেলেদের কেউ জিজ্ঞেস করে না, ‘এত রাতে ফিরছ কেন?’ এ ব্যবস্থা বলে দেয় সবকিছুর মধ্যে একটাই বার্তা, ‘তুমি মেয়ে– তোমার স্বাধীনতা গণ্ডিবদ্ধ।’
চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী সুফাইদা জান্নাত অভিযোগ করেন, ‘এবারের জুলাই-কন্যা দিবসে চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের আয়োজনে জুলাই গণঅভ্যুত্থানের সম্মুখসারিতে থাকা নারীদের স্থান হয়নি। মেয়েদের হল আঙিনায় ছেলেরা ৫ ফেব্রুয়ারি রাতে বসার জায়গা (নৌকা প্রতীক) ভাঙার ঘটনার জের ধরে আন্দোলনকারী নারী শিক্ষার্থীদেরই বহিষ্কার করা হয়, যেন কোনোভাবে নারীরা নেতৃত্ব দিতে বা মাথাচাড়া দিয়ে উঠতে না পারে। মেয়েদের হলে রাতের খাতায় এন্ট্রি করে প্রবেশ করতে হয় অথচ ছেলেদের হলে এ রকম কোনো ব্যবস্থা নেই।’
চট্টগ্রাম বা ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে যখন রাতে নারী শিক্ষার্থীদের হলগুলো নিরাপত্তার নামে বন্দি, তখন ঢাকার অদূরেই আরেকটা বিশ্ববিদ্যালয়, জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের (জাবি) চিত্রটা সম্পূর্ণ উল্টো। এ ক্যাম্পাসে রাত ১০টা হোক বা ৩টা একজন নারী শিক্ষার্থী একা একা, অথবা কয়েকজন দলবেঁধে ঘুরে বেড়াতে পারে। জাবি প্রশাসন এটুকু নিরাপত্তা নিশ্চিত করে, যদি রাত ২টার সময়ও কোনো একজন মেয়ে অসুস্থ হয়ে পড়ে তাহলে সে কাউকে না পেলে নির্ভয়ে একা একাই মেডিকেল সেন্টারে যেতে পারে। অথবা কয়েকজন মেয়ে চৌরঙ্গীতে বসে আড্ডা দিতে পারে। সেখানে কোনো অপ্রীতিকর ঘটনা ঘটার আশঙ্কা খুবই ক্ষীণ। প্রশ্ন হলো–জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয় পারলে অন্য বিশ্ববিদ্যালয়গুলো কেন পারবে না? ক্যাম্পাসে কোনো অনভিপ্রেত ঘটনা যেন না ঘটে, সে দায়িত্ব প্রশাসনের। শিক্ষার্থীদের মতে, দায়িত্ব এড়িয়ে যাওয়ার জন্যই তারা ‘ভিকটিম ব্লেমিং’ করে।
জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী জান্নাতুল মাওয়া শ্যামন্তী নারীর নিরাপত্তা এবং সার্বিক অবস্থা সম্পর্কে বলেন, ‘নিরাপত্তা তো আমাদের একটা মৌলিক অধিকার, সেই অধিকারকে যখন প্রতীকীভাবে একদিনের জন্য শো করতে হয়, তাহলে আর বোঝার বাকি থাকে না একটা বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন নিরাপত্তা দিতে কার্যত ব্যর্থ! ১৪ জুলাই সারারাত ঢাবির মেয়েদের হলগুলো খুলে রেখে প্রতীকীভাবে জুলাইয়ে অবদান রাখার একটা স্যাটায়ার করা হলো।’
সবার নিরাপত্তা জরুরি, তবে সেই নিরাপত্তা গড়ে তোলা উচিত আরও সংগঠিতভাবে–হল ও ক্যাম্পাস যেন হয় নিরাপদ সবার জন্য। নিরাপত্তা মানে যেন কোনো কারাগার না হয়, যেখানে মেয়ে মানেই নিয়মের বেড়াজালে আটকে রাখা। নিরাপত্তা মানে হোক এমন একটি পরিসর, যেখানে একজন মেয়ে রাত জেগে স্বাধীনভাবে লাইব্রেরিতে বই পড়তে পারে, একটি প্রোগ্রাম শেষে বন্ধুর সঙ্গে ক্যাম্পাসে হাঁটতে পারে। চাইলেই টিএসসির কোণে এক কাপ চা খেতে পারে নির্ভয়ে।
এ প্রসঙ্গে জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের সহযোগী অধ্যাপক ড. রেজওয়ানা করিম স্নিগ্ধা বলেন, ‘যে কোনো আন্দোলন, সংগ্রামে নারীরা সম্মুখসারিতে থেকে আন্দোলনকে এগিয়ে নিয়েছেন, যার সর্বশেষ প্রকাশ আমরা দেখতে পেয়েছি জুলাই গণঅভ্যুত্থানে নারীর অভূতপূর্ব অংশগ্রহণে। কিন্তু জুলাই গণঅভ্যুত্থান-পরবর্তী সময়ে নারীর কাঙ্ক্ষিত অধিকার মেলেনি। সমাজ, রাষ্ট্র থেকে শুরু করে সর্বত্র নারীদের বাধা দেওয়া, তাদের কাজকে অস্বীকার করার প্রবণতা দেখা গেছে। নারীদের বিভিন্নভাবে অপমান ও অপদস্ত করতে দেখা যাচ্ছে। জুলাই কন্যাদের ‘স্লাট শেমিং’ করা হচ্ছে। ‘জুলাই কন্যা দিবস’ পালন করলেও নারীদের প্রতি এই আচরণের ব্যর্থতা, তাদের নিরাপত্তা এবং অধিকার দেওয়ার ব্যর্থতা কেউ অস্বীকার করতে পারবে না। একদিনের জন্য বিশ্ববিদ্যালয়ের হলগুলো খুলে না রেখে সবসময়ের জন্য খুলে দেওয়া হোক। নিরাপত্তা যাদের নিশ্চিত করার কথা, তারা ঠিকমতো কাজ করলে তা অবশ্যই সম্ভব। অথচ কন্যারা বিভিন্নভাবে নিগৃহীত, অপমানিত হচ্ছে; যা জুলাইয়ের স্পিরিটের সঙ্গে সাংঘর্ষিক।’
- বিষয় :
- নারী শিক্ষার্থী
- বিশ্ববিদ্যালয়
- আবাসিক হল
