ঢাকা বৃহস্পতিবার, ০৪ জুন ২০২৬

দুর্যোগ ও সংকটকালে মানসিক স্বাস্থ্যসেবা

বিশ্ব মানসিক স্বাস্থ্য দিবস ২০২৫

দুর্যোগ ও সংকটকালে মানসিক স্বাস্থ্যসেবা
×

হিল্লোল চৌধুরী

প্রকাশ: ০৫ অক্টোবর ২০২৫ | ০৬:৩৩ | আপডেট: ০৫ অক্টোবর ২০২৫ | ১৮:৩৯

| প্রিন্ট সংস্করণ

প্রতিবছর ১০ অক্টোবর বিশ্বজুড়ে পালিত হয় বিশ্ব মানসিক স্বাস্থ্য দিবস। এটি কেবল একটি আনুষ্ঠানিক দিন নয়; বরং এক মহামঞ্চ, যেখানে মানসিক স্বাস্থ্য নিয়ে সচেতনতা ছড়িয়ে দেওয়া হয়। মানুষকে কথা বলতে উৎসাহিত করা এবং মানসিক স্বাস্থ্য সমস্যা ঘিরে কলঙ্ক ও বৈষম্য দূর করার আহ্বান জানানো হয়। এবারের প্রতিপাদ্য ‘সেবার প্রাপ্যতা– দুর্যোগ ও জরুরি অবস্থায় মানসিক স্বাস্থ্য’। বর্তমান বৈশ্বিক বাস্তবতায় এ প্রতিপাদ্য নিঃসন্দেহে অত্যন্ত প্রাসঙ্গিক। কারণ, আজকের পৃথিবীতে প্রতিদিন কোথাও না কোথাও ঘটছে যুদ্ধ, প্রাকৃতিক দুর্যোগ, বাস্তুচ্যুতি বা মানবিক বিপর্যয়। এর সরাসরি প্রভাব পড়ছে মানুষের মানসিক স্বাস্থ্যে।

দুর্যোগ যখন আসে, তখন শুধু অবকাঠামো নয়; বিপর্যস্ত হয় মানুষের জীবনও। প্রতি পাঁচজন দুর্যোগপীড়িত মানুষের একজন মানসিক স্বাস্থ্য সমস্যায় ভোগেন এবং প্রায় এক-তৃতীয়াংশ ক্ষতিগ্রস্ত ব্যক্তি দীর্ঘমেয়াদি সমস্যায় আক্রান্ত হন। বর্তমানে বিশ্বজুড়ে প্রায় ৬ কোটি ৭০ লাখ মানুষ সংঘাত, দুর্যোগ বা বাস্তুচ্যুত অবস্থায় মানসিক রোগ নিয়ে বেঁচে আছেন। অথচ মানসিক স্বাস্থ্যসেবাকে অনেক সময় ঐচ্ছিক হিসেবে দেখা হয়। বাস্তবতা হলো, এটি বিলাসিতা নয়, বরং বেঁচে থাকার অন্যতম শর্ত।

মানবিক সহায়তার সবচেয়ে বড় দিক কখনও খুব সরল; একটি নিরাপদ জায়গা, যেখানে মানুষ তার শোকের কথা বলতে পারে। জরুরি পরিস্থিতিতে শারীরিক আঘাতের চেয়ে মানসিক আঘাতই দীর্ঘস্থায়ী প্রভাব ফেলে। খাবার, পানি বা আশ্রয়ের মতোই মানসিক স্বাস্থ্য সহায়তা জরুরি। এটি মানুষকে শুধু বাঁচিয়ে রাখে না, বরং মানিয়ে নিতে, আরোগ্য লাভে এবং নতুন করে গড়ে উঠতে সাহায্য করে। তবে বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার অভিজ্ঞতা প্রমাণ করেছে, সংকটকালেও অগ্রগতি সম্ভব। কসোভোতে যুদ্ধ-পরবর্তী সময়ে কমিউনিটিভিত্তিক মানসিক স্বাস্থ্যসেবায় পরিবর্তন আনা গিয়েছিল। আলবেনিয়ায় স্থানীয় কর্তৃপক্ষ ও কমিউনিটির সহযোগিতায় সংস্কার কার্যক্রম বাস্তবায়িত হয়েছিল। ইউক্রেনে চলমান যুদ্ধের মাঝেও মানসিক স্বাস্থ্য সংস্কার অব্যাহত। এসব অভিজ্ঞতা আমাদের মনে করিয়ে দেয়, সঠিক বিনিয়োগ ও প্রস্তুতি থাকলে প্রতিকূলতার মাঝেও এগিয়ে যাওয়া যায়।

প্রস্তুতিতে বিনিয়োগ মানে ভবিষ্যৎ সাশ্রয়। ২০১৯ সালে যেখানে মাত্র ২৮ শতাংশ দেশ জরুরি পরিস্থিতিতে মানসিক স্বাস্থ্য সহায়তার জন্য প্রস্তুত ছিল, ২০২৫ সালে তা বেড়ে দাঁড়িয়েছে ৪৮ শতাংশে। জরুরি অবস্থায় মানসিক স্বাস্থ্য ও মনোসামাজিক সহায়তা সমন্বয় ব্যবস্থাও বেড়েছে, যা আজ ৭১ শতাংশ। তবুও সেবার বিস্তৃতি ও মান এখনও পর্যাপ্ত নয়। সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ মাঠ পর্যায়ের কর্মীদের মানসিক সুস্থতা। তারা প্রায়ই প্রথম শ্রোতা হিসেবে কাজ করেন এবং দীর্ঘ মেয়াদে উপস্থিত থাকেন। 

২০২৫ সালে বিশ্বজুড়ে প্রায় ৩০ কোটি ৫০ লাখ মানুষের মানবিক সহায়তা ও সুরক্ষার প্রয়োজন হবে। এই প্রেক্ষাপটে মানসিক স্বাস্থ্য কোনো প্রান্তিক বিষয় নয়; বরং বেঁচে থাকা, মর্যাদা ও পুনর্গঠনের ভিত্তি। ইতোমধ্যে একটি গুরুত্বপূর্ণ মোড় ঘুরেছে। ২০২৪ সালে বিশ্ব স্বাস্থ্য পরিষদ সর্বসম্মতভাবে একটি ঐতিহাসিক প্রস্তাব গ্রহণ করেছে, যেখানে প্রথমবারের মতো প্রস্তুতি, প্রতিক্রিয়া ও পুনরুদ্ধারের প্রতিটি ধাপে মানসিক স্বাস্থ্য সহায়তার গুরুত্বকে স্বীকৃতি দেওয়া হয়েছে। যদি দুর্যোগ ও জরুরি অবস্থা সর্বব্যাপী হয়, তখন এগুলো মানুষের মৌলিক স্বভাব ও প্রকৃতির সঙ্গে গভীরভাবে যুক্ত হয়। এই প্রতিকূল প্রবণতা মোকাবিলায় আমাদের দরকার সহমর্মিতা, আরোগ্য এবং অন্যকে সেবা করার অদম্য শক্তি।

দুর্যোগ ও জরুরি অবস্থার প্রভাব বহুমুখী। এতে ক্ষতিগ্রস্ত মানুষ যেমন ভোগেন, তেমনি মাঠে থাকা সাহায্যকারীরাও এর চাপে ভেঙে পড়তে পারেন। এ বছরের প্রতিপাদ্য আমাদের মনে করিয়ে দেয়, জটিল পরিস্থিতিতে মানসিক স্বাস্থ্য সমস্যা বেশি দেখা দেয় এবং অনেকেরই পেশাদার সহায়তা প্রয়োজন, যা অবশ্যই তাদের কাছে পৌঁছানো দরকার।

মনে রাখতে হবে, একটি ভাঙা হাড় কয়েক সপ্তাহে সারে। ঘরবাড়ি কয়েক মাসেই আবার গড়ে ওঠে। কিন্তু মানসিক স্বাস্থ্য উপেক্ষিত হলে এর প্রভাব থেকে যায় আজীবন। মানুষ শুধু খাবার, পানি, আশ্রয়ে টিকে থাকতে পারে না। মানসিক স্বাস্থ্য সহায়তা পেলে সে মানুষ বাঁচতে পারে, মানিয়ে নিতে পারে এবং নতুন করে গড়ে উঠতে পারে তার জীবন।

আরও পড়ুন

×