ঢাকা বৃহস্পতিবার, ০৪ জুন ২০২৬

হস্তশিল্পে বদলে যাওয়া ২৭০ গল্প

হস্তশিল্পে বদলে যাওয়া ২৭০ গল্প
×

হস্তশিল্পে অর্থনৈতিক সচ্ছলতা পেয়েছেন রায়গঞ্জের নারীরা

এম আতিকুল ইসলাম বুলবুল

প্রকাশ: ১৬ নভেম্বর ২০২৫ | ০৬:৪৯ | আপডেট: ১৭ নভেম্বর ২০২৫ | ১৪:৫৩

| প্রিন্ট সংস্করণ

স্বামী মো. গোলাম মোস্তফা পেশায় অটোভ্যানচালক। অভাব-অনটনের সংসারের ঘানি টানতে অনেকটা ক্লান্ত গৃহবধূ জাহানারা পারভীন (৪৩)। নুন আনতে পান্তা ফুরানো ২২ বছরের সংসারে কখনও কানাকড়িও সঞ্চয় করতে পারেননি তারা। তাই বিয়ের বয়স হতে না হতেই ‘ঝামেলা এড়াতে’ মেয়ে মুন্নি আক্তারকে (১৭) বিয়ে দিয়ে দিয়েছেন। ছেলে মো. ওমর ফারুককেও (১৯) তেমন একটা পড়ালেখা করাতে পারেননি– এমনটাই জানান সিরাজগঞ্জের রায়গঞ্জ উপজেলার ধামাইনগর ইউনিয়নের প্রতাপদীঘি গ্রামের বাসিন্দা জাহানারা পারভীন। তিনি জানান, নিত্য অভাবের সংসারে স্বামী-সন্তান সামলিয়ে আয়নায় অনেক বছর নিজের মুখটাও দেখা হয়নি। এ কথাগুলো তাঁর কাছে এখন অনেকটাই অতীত। এখন জাহানারা বেশ উৎফুল্ল। জীবন নিয়ে অসন্তুষ্ট নন।

গত দুই বছর আগে সিরাজগঞ্জের তাড়াশ উপজেলার ‘চলনবিল উন্নয়ন কেন্দ্র’ নামের একটি এনজিওতে হস্তশিল্প প্রকল্পে এক মাসের প্রশিক্ষণ নিয়েছেন জাহানারা। এরপর হস্তশিল্প সামগ্রী বানানো শুরু করেন। এ কাজ করে আজ তিনি স্বাবলম্বী। কার্যত সংসারের সব কাজ সেরে অবসর সময়ে ক্রেতার চাহিদা মতো নানা ধরনের মানসম্মত হস্তশিল্প সামগ্রী বানিয়ে এখন তা থেকে পারিশ্রমিক বা মজুরি বাবদ মাসে গড়ে ছয় থেকে সাত হাজার টাকা রোজগার করছেন। এতে প্রায় দুই বছর ধরে জাহানারার সংসার পরিচালনা অনেকটা সহজ হয়ে এসেছে। এমনকি সংসারে তাঁর কথার গুরুত্বও বেড়েছে। 

অনেকটা একই রকমের গল্পের কথা জানান শেফালী খাতুন (২৪)। তিনিও একই গ্রামের গৃহবধূ। শেফালী খাতুনের স্বামী মো. গোলাম রব্বানী স্ত্রীকে নিয়ে সরকারি আশ্রয়ণ প্রকল্পের ঘরে বসবাস করেন। তাদের সংসারে এক মেয়ে ও এক ছেলেসন্তান আছে। তবে স্বামীর কারখানায় কাজের সামান্য বেতনে তাদের সংসারের টানাটানি কোনোমতেই কুলিয়ে ওঠা যাচ্ছিল না। জাহানারার মতো শেফালীও ওই এনজিওতে হস্তশিল্প প্রকল্পে প্রশিক্ষণ নিয়ে এখন মজুরি বাবদ ছয় হাজার থেকে আট হাজার টাকা রোজগার করছেন। শেফালীর পথ ধরে প্রতাপদীঘি আশ্রয়ণের ঘরে বসবাস করা মো. বেল্লাল হোসেনের স্ত্রী তহুরা খাতুনসহ আরও কয়েকজন গৃহস্থালি কাজের ফাঁকে হস্তশিল্প পণ্য বানিয়ে অর্থ উপার্জন করছেন। 

চলনবিল উন্নয়ন কেন্দ্রে প্রশিক্ষণের মাধ্যমে গৃহস্থালির কাজের ফাঁকে হস্তশিল্প পণ্য বানিয়ে প্রায় ২৭০ নারী নিজেদের স্বাবলম্বী করে তুলতে পেরেছেন। খোঁজ নিয়ে দেখা গেছে, তাদের বেশির ভাগ তাড়াশ ও রায়গঞ্জ উপজেলার একেবারে অজপাড়াগাঁয়ের নারী। 

চলনবিল উন্নয়ন কেন্দ্রের নির্বাহী পরিচালক এসএম আব্দুল আজিজ জানান, প্রথমে তাদের এনজিও কার্যালয়ে ৩০ জন করে নারীকে একেকটি দলে বিভক্ত করে ১৫ দিন হস্তশিল্প পণ্য তৈরির ওপর প্রশিক্ষণ দেওয়া হয়। পরের ১৫ দিন প্রশিক্ষক ওই নারীদের গ্রামে গিয়ে হস্তশিল্পের পণ্য তৈরির উপকরণ দিয়ে ১০৪ ধরনের পণ্য বানানোর কলা কৌশল হাতে-কলমে শিখিয়ে দিয়েছেন। তারপর চলনবিল উন্নয়ন কেন্দ্র থেকে প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত নারীদের বিনামূল্যে ছন, পুরোনো ব্যবহার্য কাপড়, তালপাতা, ভুট্টার আঁশ, নানা ধরনের রঙিন সুতা, সুই সরবরাহ করেন। এসব উপকরণ দিয়ে ওই নারীরা তৈরি করেন টেবিল বক্স, গ্লাস, কিট বক্স, পাখির বাসা, ডক বক্স, বড় পাতিল, বালতি, ফাইল বক্স, চাকা, কিচেন ডালাসহ বিভিন্ন নকশার প্রয়োজনীয় রুচিশীল গৃহস্থালি জিনিসপত্র, শোপিস জাতীয় হরেকরকম হস্তশিল্প পণ্য।

হস্তশিল্প পণ্য তৈরি করে প্রকারভেদে ওই নারীরা পারিশ্রমিক পান তৈরি করা প্রতিটি পণ্যের বিপরীতে। যেমন– একটি পিকনিক বাসকেট তৈরি করে পারিশ্রমিক পান ৪০০ টাকা, গ্লাস ও ডালা ১৫০, টেবিল বক্স ১২০, পাখির বাসা ৪০০, ডিশ ১৫০ টাকা করে। তাড়াশ, রায়গঞ্জ উপজেলা এলাকার নারীদের তৈরি করা হস্তশিল্প সামগ্রী চলনবিল উন্নয়ন কেন্দ্র কিনে নেয়। তারপর সংগঠনটি এ উদ্যোমী নারীদের পণ্য কারিতাস বাংলাদেশ, দেশ বাংলাদেশ ও বেজ ইন্টারন্যাশনাল নামের বায়ার প্রতিষ্ঠানের কাছে বিক্রি করে। পরে বিক্রি করা এ হস্তশিল্প পণ্য বায়ার প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে থাইল্যান্ড, ইংল্যান্ড, আমেরিকাসহ বিশ্বের বিভিন্ন দেশে রপ্তানি হয়।

আরও পড়ুন

×