শিশুর বাকপ্রতিবন্ধিতা
নীরব শৈশব ও মায়ের দীর্ঘশ্বাস
বর্তমান সময়ে শিশুর ‘বাচন বিলম্ব’ সমস্যাটি প্রকট হয়ে দেখা দিচ্ছে
তানজিলা মোস্তাফিজ/ শাহেরীন আরাফাত
প্রকাশ: ০৭ ডিসেম্বর ২০২৫ | ০৭:০৭ | আপডেট: ০৭ ডিসেম্বর ২০২৫ | ১৭:১৯
| প্রিন্ট সংস্করণ
হিম, বয়স দুই বছর দুই মাস। সমবয়সীরা যখন আধো আধো বোলে ঘর মাতাচ্ছে, হিম তখন অনেকটাই নীরব। মা মৌসুমী রহমান শুরুতে ভেবেছিলেন, হয়তো ছেলের কথা ফুটতে একটু দেরি হচ্ছে। পরিবারের মুরব্বিরাও অভয় দিয়েছিলেন, অনেক শিশু দেরিতে কথা বলে, ঠিক হয়ে যাবে। সময় গড়িয়ে যাওয়ার সঙ্গে সঙ্গে সেই অভয়বাণীই পরিণত হয়েছে কাঠগড়ায়। আঙুল উঠল মায়ের দিকে–‘তুমি তো ওকে মোবাইল দিয়ে খাওয়াও, সময় দাও না।’ হিমের মা মৌসুমী একা নন; এমন হাজারো মা প্রতিনিয়ত লড়ছেন এক অদৃশ্য মানসিক চাপের সঙ্গে। সন্তানের কথা বলতে দেরি হলে আমাদের সমাজে প্রথমেই মাকে দায়ী করার এক নিষ্ঠুর প্রবণতা রয়েছে। ‘তুমি ভালো মা নও’, ‘বাচ্চার যত্ন নাও না’–এ ধরনের বাক্যবাণে জর্জরিত হন মায়েরা।
সেলিনা আক্তারের বড় সন্তান শারীরিক প্রতিবন্ধী, ছোট সন্তান কথা বলে না। তিনি বলেন, ‘নিজের ভেতরে প্রশ্ন জাগে, দুই ছেলেরই যদি সমস্যা হয়, সমাজ আমাকে কীভাবে দেখবে? মানুষ কী বলবে? আমার সন্তানদের কী দোষ?’
এই সামাজিক স্টিগমা বা লোকলজ্জার ভয়ে অনেক মা শুরুতে চিকিৎসকের কাছে যান না বা বিষয়টি গোপন রাখেন। এতে করে শিশুর ‘আর্লি ইন্টারভেনশন’ বা প্রাথমিক চিকিৎসার সুযোগ নষ্ট হয়। অথচ স্পিচ থেরাপিস্টদের মতে, প্রাথমিক পর্যায়ে থেরাপি শুরু করলে শিশুর ভাষা শেখার প্রক্রিয়া দ্রুত হয় এবং আত্মবিশ্বাস বাড়ে।
‘স্পিচ ডিলে’ নাকি অন্য কিছু
বাংলাদেশে সাধারণভাবে যাকে আমরা ‘বাকপ্রতিবন্ধিতা’ বলি, বহির্বিশ্বে এবং চিকিৎসাবিজ্ঞানের ভাষায় তাকে আরও সুনির্দিষ্ট করে ‘ভাষা ও বাচন সমস্যা’ বলা হয়। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের যোগাযোগবৈকল্য বিভাগের প্রতিষ্ঠাতা চেয়ারম্যান অধ্যাপক ড. হাকিম আরিফ এ বিষয়ে বিস্তারিত আলোকপাত করেছেন। তাঁর মতে, শিশুর ভাষা ও বাচন সমস্যার নেপথ্যে একাধিক কারণ থাকতে পারে। প্রথমত, শিশুটি যদি স্নায়ু-বিকাশমূলক বৈকল্যে (নিউরো ডেভেলপমেন্টার ডিজঅর্ডারস) আক্রান্ত হয়, যেমন–অটিজম, ডাউন সিনড্রোম, বুদ্ধিপ্রতিবন্ধিতা বা সেরিব্রাল পালসি, তবে তাদের মধ্যে ভাষা ও বাচন সমস্যা থাকাটাই স্বাভাবিক।
দ্বিতীয়ত, কিছু শারীরিক ত্রুটি, যেমন–কানের সমস্যা, বাকপ্রত্যঙ্গের গঠনগত ত্রুটি, তালু ফাটা বা ঠোঁটকাটা শিশুদেরও কথা বলতে সমস্যা হয়। তবে বর্তমান সময়ে যে সমস্যা সবচেয়ে প্রকট হয়ে দেখা দিচ্ছে তা হলো ‘বাচন বিলম্ব’ বা স্পিচ ডিলে। শিশু হয়তো অটিস্টিক নয়, তার বুদ্ধিও স্বাভাবিক, তবুও সে কথা বলছে না। এর পেছনে আধুনিক নগরজীবন ও পরিবেশগত দায়কেই বড় করে দেখছেন বিশেষজ্ঞরা।
অপরিকল্পিত নগরায়ণ
ড. হাকিম আরিফ নগরজীবনে শিশুর দেরিতে কথা বলার পেছনে ‘একান্নবর্তী পরিবার’ ভেঙে ‘একক পরিবার’ তৈরি হওয়াকে প্রধান কারণ হিসেবে চিহ্নিত করেছেন। অতীতে গ্রাম বা শহরের বড় পরিবারগুলোতে দাদা-দাদি, নানা-নানি, ফুফু বা খালাদের কোলাহলে শিশু বেড়ে উঠত। এই স্বজনরাই প্রতিনিয়ত শিশুর সঙ্গে কথা বলতেন, যা শিশুর মস্তিষ্কে ‘ভাষা ইনপুট’ হিসেবে কাজ করত। আজকের ফ্ল্যাটবন্দি জীবনে মা-বাবা দুজনেই যখন কর্মজীবী, তখন দিন শেষে ক্লান্ত শরীরে শিশুর সঙ্গে গল্প করার মতো শক্তি বা সময় তাদের থাকে না। ফলে শিশুটি ভাষা শেখার মতো প্রয়োজনীয় উদ্দীপনা বা ইনপুট পাচ্ছে না।
অপরিকল্পিত নগরায়ণ ও পরিবেশ দূষণও শিশুর বিকাশে বড় বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছে। ঢাকার মতো মেগাসিটিতে খেলার মাঠ নেই, নেই সবুজের ছোঁয়া। চার দেয়ালের বন্দি জীবনে শিশুর একমাত্র সঙ্গী হয়ে উঠছে টেলিভিশন, মোবাইল বা ট্যাব। ডে-কেয়ার সেন্টার বা দিবাযত্ন কেন্দ্রের অভাবে বা সহজলভ্য না হওয়ায় অনেক কর্মজীবী নারী সন্তান জন্মের পর চাকরি ছেড়ে দিতে বাধ্য হন। এতে জাতীয় অর্থনীতিতে যেমন নেতিবাচক প্রভাব পড়ে, তেমনি এটি সাংস্কৃতিক ক্ষেত্রেও জনগোষ্ঠীর অর্ধেককে পিছিয়ে রাখছে।
ভুক্তভোগী মায়েদের অভিজ্ঞতায় উঠে এসেছে এই যান্ত্রিকতার করুণ চিত্র। মা জান্নাত আরা বলেন, ‘বিয়ের ১১ বছর পর অনেক চিকিৎসার মাধ্যমে সন্তান পেয়েছি। এখন সে কথা বলে না। চাকরি ছেড়ে দিয়েছি শুধু বাচ্চার জন্য। কিন্তু সমাজের মানুষের কথায় মানসিক চাপে থাকি।’
অধ্যাপক আরিফ জানান, ঢাকার বাতাসের সিসা অন্তঃসত্ত্বা নারীর শ্বাসের মাধ্যমে শরীরে প্রবেশ করছে, যা অটিজমে আক্রান্ত শিশু জন্মের ঝুঁকি বাড়াচ্ছে। শব্দদূষণ শিশুর শ্রবণশক্তি কমিয়ে দিচ্ছে, যা পরোক্ষভাবে ভাষা শিক্ষায় বাধা সৃষ্টি করছে। শহরের এই ‘খাঁচার মতো’ জীবনে শিশুরা যখন বাইরের জগৎ ও মানুষের মিথস্ক্রিয়া থেকে বঞ্চিত হয়, তখন তারা আসক্ত হয়ে পড়ে স্ক্রিনে। দেরিতে কথা বলা শেখার এটিও একটি কারণ।
পরিসংখ্যান কী বলে
পরিস্থিতি কতটা ভয়াবহ তা বোঝা যায় বাংলাদেশ মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়ের (বিএমইউ) ২০২১ সালের একটি গবেষণায়। সেখানে দেখা গেছে, স্পিচ ডিলে বা কথা বলতে দেরি হওয়ার সমস্যায় আক্রান্তের মধ্যে প্রায় ৭৪ শতাংশ ছেলে শিশু। এ ছাড়া ২০২৫ সালের সাম্প্রতিক গবেষণা বলছে, পাঁচ বছরের কম বয়সী শিশুর মধ্যে যারা বুকের দুধ কম পেয়েছে এবং যাদের নিউরো ডেভেলপমেন্টাল সমস্যা আছে, তাদের মধ্যে এই ঝুঁকি বেশি।
আশার আলো ও করণীয়
এতসব হতাশার মাঝেও আশার কথা হলো, বাংলাদেশে এ সমস্যার আধুনিক চিকিৎসা ও বিশেষায়িত শিক্ষাব্যবস্থা গড়ে উঠছে। ২০১৫ সাল থেকে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে ‘যোগাযোগবৈকল্য’ বিভাগ চালু হয়েছে, যেখানে দক্ষ স্পিচ থেরাপিস্ট তৈরি করা হচ্ছে।
চিকিৎসার ক্ষেত্রে সবচেয়ে অগ্রগামী সাভারে অবস্থিত সিআরপি। এ ছাড়া বাংলাদেশ মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয় ইপনা ও নাক-কান-গলা বিভাগ, বাংলাদেশ সেনাবাহিনী পরিচালিত প্রয়াস, নৌবাহিনী পরিচালিত আশার আলো, বিজিবি পরিচালিত দীপ্ত সীমান্ত, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের যোগাযোগবৈকল্য বিভাগ, বিভিন্ন সরকারি ও বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ে স্থাপিত চাইল্ড ডেভেলপমেন্ট সেন্টারসহ বিভিন্ন বেসরকারি ক্লিনিকে সেবা পাওয়া যাচ্ছে।
শুধু চিকিৎসা দিলেই হবে না, প্রয়োজন দৃষ্টিভঙ্গির পরিবর্তন। শিশুর কথা বলতে দেরি হওয়া মানেই শিশুর বুদ্ধিমত্তা কম বা সে অস্বাভাবিক–এ ধারণা থেকে বেরিয়ে আসতে হবে। সেই সঙ্গে পরিবারকে ‘ব্লেম গেম’ বা দোষারোপের সংস্কৃতি বন্ধ করে মায়ের পাশে দাঁড়াতে হবে।
ড. হাকিম আরিফ বলেন, ‘বাকপ্রতিবন্ধিতা বা ভাষা ও বাচন সমস্যা একটি বিশেষায়িত অধ্যয়ন। এই বিশেষায়িত শিক্ষার প্রয়োজনীয়তা রয়েছে। কারণ আমরা সবসময় একটি একীভূত সমাজ প্রতিষ্ঠার কথা বলে আসছি। অর্থাৎ একটি সমাজের ধর্ম, বর্ণ, জাতি নির্বিশেষে সবাই মিলে একটি সুস্থ ও পরিপূর্ণ সমাজ প্রতিষ্ঠার বিকল্প নেই। এই দৃষ্টিকোণ থেকে বলা যায়, বাংলাদেশের ১০ শতাংশ মানুষ যারা নানা ধরনের ভাষা ও বাচন সমস্যায় আক্রান্ত, তাদের মূলধারায় ফিরিয়ে না আনলে প্রকৃত উন্নয়ন হবে না। তাই এই বিশেষ জনগোষ্ঠীকে মূলধারায় অন্তর্ভুক্ত করার জন্য এই বিশেষায়িত শিক্ষার প্রয়োজনীয়তা রয়েছে।’
- বিষয় :
- শিশু
- শিশুর বাকপ্রতিবন্ধিতা
- শাহেরীন আরাফাত
- শৈশব
