গণহত্যা নিয়ে নিগারের ফরেনসিক গবেষণা
তাবাসসুম নিগার
আশরাফুল ইসলাম আকাশ
প্রকাশ: ২১ ডিসেম্বর ২০২৫ | ০৭:১০ | আপডেট: ০৫ জানুয়ারি ২০২৬ | ১৭:২৮
| প্রিন্ট সংস্করণ
মহান মুক্তিযুদ্ধের ৫৪ বছর পেরিয়েছে। দীর্ঘ এ সময় এখনও মেলেনি কিছু জটিল প্রশ্নের উত্তর! বিশেষ করে গণহত্যা নিয়ে কোনো সমাধানে আসা যায়নি। তাই তো সময়ে সময়ে উঠে প্রশ্ন–একাত্তরে আদৌ কি ঘটেছিল জঘন্য এই অপরাধ? পাকিস্তানি হানাদার বাহিনীর চালানো গণহত্যা রহস্যের জট খুলতে কোমর বেঁধে নেমেছেন গবেষক তাবাসসুম নিগার।
সময়টা ২০২২ সাল। জেনোসাইডের ধুলোপড়া ইতিহাস নিয়ে পড়াশোনা শুরু করলেন আইন বিভাগের তাবাসসুম নিগার। উদ্দেশ্য ছিল স্নাতকের গণ্ডি পেরোনো। আরাকানের রোহিঙ্গা গণহত্যার ওপর থিসিস প্রস্তুত করতে গিয়ে মাথার জট খুলল তাঁর। হঠাৎ মনে হলো আমরা নিজেরাও তো ভুক্তভোগী জনগোষ্ঠী। সেই যে শুরু হলো, এখন নতুন দিনের স্বপ্ন বুনছেন নিগার।
১৯৭১ সালে বাংলাদেশে সংঘটিত গণহত্যা নিয়ে রহস্য উদঘাটনে নেমে গেলেন নিগার। খোঁজ শুরু করলেন গণহত্যা নিয়ে কাজ করা প্রতিষ্ঠানের। দেশেই এর সমাধান পেলেন। মুক্তিযুদ্ধ জাদুঘরের রিসার্চ সেন্টার ফর দ্য স্টাডি অব জেনোসাইড অ্যান্ড জাস্টিস এ নিয়ে কাজ করছে। স্নাতক শেষ করে প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে জড়িয়ে যান তিনি।
দেশের গণহত্যা নিয়ে ফরেনসিক বিজ্ঞানের প্রয়োগ খুবই সীমিত। নেই কোনো একাডেমিক তোড়জোড়ও। তবু হাল ছাড়তে চাননি নিগার। আইন বিভাগে পড়ার সুবাদে গণহত্যার মতো বিষয় তাঁকে উৎসাহী করে তুলেছে। মূলত স্বাধীনতা অর্জনের এত বছর পর এর সত্য উদঘাটন কীভাবে করা যায়? কীভাবে এ কাজটি করা যায়–এ নিয়েই গবেষণা করছেন নিগার। তাঁর বিশাল এই কর্মযজ্ঞে সহায়তা করছে মুক্তিযুদ্ধ জাদুঘর।
বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয় থেকে স্নাতক শেষ করে মুক্তিযুদ্ধ জাদুঘরে স্বেচ্ছাসেবী হিসেবে কাজ শুরু করেন নিগার। সেই সুবাদে তিন বছর আগে বাংলাদেশ ও কম্বোডিয়ার গণহত্যার গবেষণায় হাত দেন। এখন সেই পরিধি আরও বেড়েছে। মূলত রুয়ান্ডার গণহত্যা তাঁকে এই মহাসমুদ্রের সন্ধান দিয়েছে। ১৯৯৪ সালে মাত্র ১০০ দিনে আট লাখ মানুষ প্রাণ হারান। নিজেদের ইতিহাসের কালো অধ্যায়টি তারা যথাযথভাবে সংরক্ষণ করেছেন। দেশটির গণহত্যা নিয়ে বৈজ্ঞানিক-ফরেনসিক আর্কিওলজি, ফরেনসিক অ্যানথ্রোপলজি, গণহত্যাস্থলে খনন, চিহ্নিতকরণ প্রক্রিয়ার সঙ্গে পরিচিত হন; যা এখন নিজ দেশে সংঘটিত গণহত্যা রহস্যের জট খুলতে প্রয়োগ করছেন।
১৯৭১ সালে বাংলাদেশের গণহত্যায় ফরেনসিক অ্যানথ্রোপলজি এবং ফরেনসিক আর্কিওলজি কীভাবে প্রয়োগ করা যায়, তা নিয়ে গবেষণা করছেন নিগার। এগুলো ফরেনসিক বিজ্ঞানের অংশ; যা ব্যবহার করে খুব সহজেই গণহত্যার সত্য উন্মোচিত করা সম্ভব। এর মাধ্যমে হত্যার স্থান শনাক্তকরণ, ঘটনাস্থল থেকে পাওয়া দেহাবশেষ সংগ্রহ ও বিশ্লেষণ করা যাবে সব। গণহত্যা নিয়ে বাংলাদেশে খুব বেশি গবেষণা কিংবা একাডেমিক প্রতিষ্ঠান এখনও গড়ে ওঠেনি। আছে শুধু মুক্তিযুদ্ধ জাদুঘর। সংশ্লিষ্টদের সহায়তায় আন্তর্জাতিক অপরাধ আইন নতুন করে পড়ছেন তিনি। এর মধ্য দিয়ে গণহত্যার স্থান, শিকার ও তাদের পরিচয় শনাক্তে কার্যকরী বিপ্লব ঘটাতে চাইছেন এ গবেষক।
মুক্তিযুদ্ধ জাদুঘরের ট্রাস্টি মফিদুল হক বলেন, ‘মুক্তিযুদ্ধ জাদুঘর অনেক বছর ধরেই জেনোসাইড স্টাডিজ নিয়ে কাজ করছে। সেখানে তরুণদেরই সম্পৃক্ততা। আমরা দেশে বিশেষ করে দেশের বাইরে ইন্টারন্যাশনাল অ্যাসোসিয়েশন অব জেনোসাইড স্কলার্সের মাধ্যমে গণহত্যা আগ্রহীদের গবেষণার সুযোগ তৈরিতে সহযোগিতা করছি। আমাদের দেশে সেভাবে কাজের পরিবেশ এখনও তৈরি হয়নি। আবার এ বিষয়েও খুব বেশি পড়ানো হয় না। সে জন্য যারা আন্তর্জাতিক সংস্থায় কাজের সুযোগ পায় আমরা তাদের সহায়তা করি।’
তাবাসসুম নিগার সম্পর্কে তিনি বলেন, ‘তিনি (তাবাসসুম নিগার) দীর্ঘদিন ধরেই মুক্তিযুদ্ধ জাদুঘরে স্বেচ্ছাসেবী হিসেবে কাজ করছিলেন। এর বাইরে অনেকে ছিলেন; যারা দেশের বাইরে আন্তর্জাতিক অপরাধ আইন নিয়ে পড়তে গেছেন। অনেকেই পিএইচডি করেছেন। এর মধ্যে নিগার যেহেতু একাত্তরে সংঘটিত গণহত্যায় ফরেনসিক বিজ্ঞানের প্রয়োগ নিয়ে কাজ করতে চেয়েছেন, সেটি ছিল দারুণ ব্যাপার। তিনি এখানে খুবই দক্ষতার প্রমাণ দিয়েছেন। বাংলাদেশের সত্যি ইতিহাস তুলে ধরতে তরুণদেরই হাল ধরতে হবে।’
- বিষয় :
- গণহত্যা
- আশরাফুল ইসলাম আকাশ
- গবেষণা