ঢাকা বৃহস্পতিবার, ০৪ জুন ২০২৬

চৈত্রসংক্রান্তি ও বৈশাখ

চৈত্রসংক্রান্তি ও বৈশাখ
×

মেলাকে সামনে রেখে ব্যস্ত সময় কাটাচ্ছেন পালপাড়ার মৃৎশিল্পীরা

ইমতিয়াজ আহমেদ

প্রকাশ: ১২ এপ্রিল ২০২৬ | ০৭:১৩ | আপডেট: ১৬ এপ্রিল ২০২৬ | ২১:৩২

| প্রিন্ট সংস্করণ

প্রকৃতি তখন খরতাপে পুড়ছে। রুক্ষ, কঙ্কালসার নদীর বুকে জেগে ওঠা ধু-ধু বালুচর যেন আবহমান বাংলার ঘাম ঝরানো মানুষের জীবনাচারের প্রতিচ্ছবি। ঠিক তখনই পলির মতো গাঢ় তামাটে রঙের ভূমিপুত্রদের কাছে পূর্ণিমা তিথির চাঁদের মতো পরম মমতাময়ী রূপ নিয়ে হাজির হয় ঋতুচক্রের পালাবদল। গাছে গাছে তখন পলাশ, শিমুল আর কৃষ্ণচূড়ার বহুবর্ণিল আগুনের ছটা। হাওয়ায় ঝরে পড়া হিজল ফুলে স্নিগ্ধ হয়ে ওঠে মেঠোপথ। দুরন্ত শৈশবের জলকেলিতে মুখরিত হয় নদীর ঘাট আর বেলা পড়ে এলে পশুর পাল নিয়ে ঘরে ফেরে রাখাল। জরাজীর্ণ চৈত্রকে বিদায় জানিয়ে নতুন বছরকে বরণের এই যে সাজসাজ রব, তার কেন্দ্রবিন্দুতেই রয়েছে চৈত্রসংক্রান্তি ও পহেলা বৈশাখ। আবহমানকাল ধরে বাংলার এই শিকড়সন্ধানী উৎসবগুলোর প্রাণভোমরা হয়ে আছেন আমাদের গ্রামীণ নারীরা।

লোকগাথায় প্রচলিত আছে, দক্ষরাজের ২৭ জন কন্যার নামকরণ হয়েছিল ২৭টি নক্ষত্রের নাম অনুসারে। এ কন্যাদেরই দুজনের নাম ছিল ‘চিত্রা’ ও ‘বিশাখা’। চিত্রা নক্ষত্রের নাম অনুসারে ‘চৈত্র’ এবং বিশাখার নাম অনুসারে ‘বৈশাখ’ মাসের নামকরণ হয়েছে বলে কথিত আছে।

দিনটি মূলত চৈত্রের শেষ আর বৈশাখের শুরুর এক যুগলবন্দি। ধর্ম-বর্ণ নির্বিশেষে বাংলার মানুষ এই ক্ষণটিকে কেন্দ্র করে মেতে ওঠে নানা আচারে। একসময় গ্রাম-বাংলায় প্রতিটি ঋতুতেই সংক্রান্তি উদযাপিত হলেও, কালের আবর্তে টিকে আছে কেবল চৈত্রসংক্রান্তি। এই দিনের অন্যতম বড় আকর্ষণ ছিল ‘গম্ভীরা’ এবং ‘শিবের গাজন’ বা ‘নীল উৎসব’।

লাল শালু কাপড়ে নিজেকে মুড়িয়ে, মাথায় পাগড়ি, গলায় রুদ্রাক্ষের মালা আর হাতে ত্রিশূল নিয়ে শিব সেজে বাড়ি বাড়ি ঘুরতেন একদল মানুষ। সঙ্গে দেবী পার্বতীর সাজে থাকতেন কোনো নারী। খোল-করতাল আর ঢাক-ঢোলের তালে তালে শিব-পার্বতীর বন্দনা এবং লীলা প্রদর্শন করা হতো। ময়মনসিংহ জেলার ঈশ্বরগঞ্জ উপজেলার আঠারোবাড়ীতে প্রায় ৩০০ বছরের পুরোনো বেহেত্তরী শ্রীধর জিউর আশ্রমে সনাতন ধর্মাবলম্বীরা আজও এই প্রথা টিকিয়ে রেখেছেন। তবে পৃষ্ঠপোষকতার অভাবে পরবর্তী প্রজন্মের কাছে এ উৎসব এখন অনেকটাই অচেনা রূপকথার মতো।
চৈত্রসংক্রান্তির একটি অনন্য এবং প্রকৃতিঘনিষ্ঠ আচার হলো ‘শাকান্ন’। এই দিনে গ্রাম-বাংলার বউ-ঝিরা মিলেমিশে বাড়ির পাশের ঝোপঝাড়, পুকুরপাড় বা পতিত জমি থেকে প্রথা মেনে ১৪ রকমের অচাষকৃত শাক (গিমা, কলমি, থানকুনি, তেলাকুচা ইত্যাদি) সংগ্রহ করে আনেন। সেই ১৪ পদের শাক একসঙ্গে রান্না করে খাওয়া হয়।

এটি নিছক কোনো খাদ্যাভ্যাস নয়; বরং প্রকৃতির সঙ্গে গ্রামীণ নারীর গভীর মিতালির এক অনন্য দৃষ্টান্ত। কোন শাক ভোজ্য আর কোনটি ঔষধি–প্রকৃতির এই গূঢ় জ্ঞান বংশপরম্পরায় নারীরাই ধারণ করে আসছেন। অনেক অঞ্চলে চৈত্রসংক্রান্তির দিনে নিরামিষ খাওয়ার প্রথাও এই শাকান্নেরই অংশ।

চৈত্রসংক্রান্তিকে অবলম্বন করে জন্ম নিয়েছে বাঙালির ঐতিহ্যবাহী ‘হালখাতা’। জমিদারি প্রথায় খাজনার হিসাব-নিকাশ চূড়ান্ত হতো চৈত্রসংক্রান্তির দিনে। এরপর বৈশাখের প্রথম দিনে নতুন খাতায় সেই হিসাব তোলা হতো। পরবর্তী সময়ে এই রেওয়াজ ছড়িয়ে পড়ে গ্রাম থেকে শহরের ছোট-বড় সব ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানে। আজও নববর্ষের প্রাক্কালে গ্রামীণ অর্থনীতি চাঙ্গা হয়ে ওঠে এ হালখাতাকে কেন্দ্র করে।

সংক্রান্তি ও নববর্ষের অবিচ্ছেদ্য অংশ হলো বৈশাখী মেলা। ময়মনসিংহের ফুলবাড়িয়ার শিবগঞ্জ কুমারবাড়িতে একসময় মাসজুড়ে মেলা বসলেও, এখন তা কেবল চৈত্রসংক্রান্তিতেই সীমাবদ্ধ। মেলাকে সামনে রেখে ব্যস্ত হয়ে পড়েন পালপাড়ার মৃৎশিল্পীরা। কাদা-মাটি দিয়ে খেলনা, হাঁড়ি-পাতিল, পুতুল তৈরির কাজে পুরুষদের পাশাপাশি সমানতালে দিনরাত এক করে কাজ করেন পরিবারের গৃহবধূ, কিশোরী থেকে শুরু করে বৃদ্ধারাও।

তবে বাস্তবতা এখন ভিন্ন। শিবগঞ্জ পালপাড়ার প্রবীণ মৃৎশিল্পী সুলেখা রানী পাল আক্ষেপের সুরে বলেন, ‘আগে চৈত্রসংক্রান্তির মেলা করার লাইগা ময়মনসিংহের তারাকান্দা, ফুলপুর, টাঙ্গাইল, নেত্রকোনার পূর্বধলা পর্যন্ত যাইতাম স্বামীর লগে মাটির জিনিসপত্র বেচতে। মেলায় যা বেচতাম, আমগোর কয়েক মাসের খরচ চইলা যাইতো। আগে মেলা আইলেই পালপাড়ায় উৎসব লাইগা যাইতো। অহন মেলাও নাই, কামও নাই।’ প্লাস্টিকের আগ্রাসন আর মেলার প্রচলন কমে যাওয়ায় প্রায় দেড়শ পরিবারের অনেকেই এখন বাধ্য হয়ে পেশা বদল করছেন।

মাটির শিল্পের যখন এই দুর্দিন, তখন মেলাকেন্দ্রিক অর্থনীতিকে কাজে লাগিয়ে নিজেদের ভাগ্য বদলেছেন অন্য একদল নারী। ময়মনসিংহের ফুলবাড়িয়া উপজেলার বিদ্যানন্দ গ্রামটি সবুজে ঘেরা। এই গ্রামটি এখন দেশজুড়ে ‘তালপাখার গ্রাম’ নামে পরিচিত। এখানকার প্রত্যেক মানুষ যেন বাবুই পাখির মতো শৈল্পিক।

পহেলা বৈশাখের মেলা ও প্রচণ্ড গরমকে সামনে রেখে এই গ্রামের পাখা কারিগররা পার করেন ব্যস্ত সময়। এই শিল্পের মূল কারিগর নারীরাই। পাঁচ সন্তানের জননী সালেহা বেগম বলেন, ‘এক কাপড়ে এই সংসারে আইছি, অভাব আর অভাব। মাইষ্যের বাড়িতে কাম কইরা কোনো মতে পোলাপানগরে বড় করছি। পরে শুরু করলাম তালপাখা বানানের কাম। সারা দিন-রাইত পাখা বানাইতাম, মেলায় পোলার বাপ বেচতে নিত। অহন গেরামের কম হইলেও ৫০০ নারী তালপাখা বানায়। আমি আমার পুরা পরিবার লইয়া বানাই। বছরে মেলায় আর বিভিন্ন জেলায় তালপাখা বেইচা তিন-চাইর লাখ টাকা আয় করতে পারি।’
লোকগবেষক স্বপন ধরের মতে, গ্রামীণ অর্থনীতি কিংবা আন্তঃবাণিজ্যের গোড়াপত্তনই ঘটেছিল বাংলা সংক্রান্তির বিভিন্ন উৎসব ও মেলাকে কেন্দ্র করে। মেলাকে ঘিরে ব্যবসা-বাণিজ্যের যে প্রসার ঘটে, তার সঙ্গে সরাসরি যুক্ত থাকেন নারীরা। সংক্রান্তি বা বৈশাখের পূজা-অর্চনা, সাজসজ্জা, খাবার তৈরি থেকে শুরু করে হস্তশিল্প ও পণ্য বিপণন–সব ক্ষেত্রেই গ্রামীণ নারীর অদৃশ্য অথচ সুদৃঢ় অংশগ্রহণ রয়েছে।
চৈত্রসংক্রান্তি ও বৈশাখের এ উৎসবগুলো কেবল নিছক বিনোদন নয়, এগুলো আমাদের আত্মপরিচয় ও গ্রামীণ অর্থনীতির প্রাণভোমরা। শিকড়সন্ধানী এই ঐতিহ্য ও উৎসবগুলোকে পরবর্তী প্রজন্মের কাছে অবিকৃত অবস্থায় পৌঁছে দিতে হলে সরকারি পৃষ্ঠপোষকতার কোনো বিকল্প নেই। লোকজ সংস্কৃতি ও অর্থনীতির মূলে রয়েছে নারীর নীরব অবদান। একে স্বীকৃতি দিয়ে তাদের পাশে দাঁড়ানোই হতে পারে নতুন বছর বরণের সবচেয়ে বড় অঙ্গীকার। 

আরও পড়ুন

×