ঢাকা বৃহস্পতিবার, ০৪ জুন ২০২৬

মায়ের মধুর হাসি – মা দিবসের বিশেষ আয়োজন

মাকে মনে পড়ে

মাকে মনে পড়ে
×

মায়ের সঙ্গে ইনাম আল হক

ইনাম আল হক

প্রকাশ: ১০ মে ২০২৬ | ০৭:১০ | আপডেট: ১০ মে ২০২৬ | ১৬:৫৫

| প্রিন্ট সংস্করণ

‘মা’ কেবল একটি শব্দ নয়। জীবনের প্রতিটি পদক্ষেপে যে নিঃস্বার্থ ভালোবাসার নিবিড় ছায়ায় আমরা বেড়ে উঠি, তার কোনো তুলনা নেই– এক অনন্ত মমতার মহাকাব্য। নাড়ির বাঁধনে বোনা সেই অকৃত্রিম স্নেহের ঋণ কি কখনও শোধ করা যায়? বিশ্ব মা দিবসের বিশেষ আয়োজনে পৃথিবীর সকল মায়ের প্রতি রইল আমাদের বিনম্র শ্রদ্ধা। গ্রন্থনা শাহেরীন আরাফাত
-----------------------------------------------------

মাকে আমার খুব মনে পড়ে। মনে পড়ে, আমাকে কাছে পেলে মা কত খুশি হতেন; বিশেষ করে তাঁর জীবনের অন্তিম দিনগুলোয়! তাঁর সব ছেলেমেয়ের মধ্যে আমিই কিছুটা দূরে বাস করতাম এবং প্রায়ই পাখি-দর্শকদের সঙ্গে গাঁটছড়া বেঁধে আরও দূরে চলে যেতাম। বলতে গেলে সে সময় আমি ছিলাম নার্সিসিস্টিক চরিত্রের কিঞ্চিৎ বাতিকগ্রস্ত এক ব্যক্তি এবং মধ্যবিত্ত সমাজের গতানুগতিক একজন নির্মম পুরুষ। মাকে খুশি করার কথা ভেবে তখন কমই আমি গৃহমুখী হয়েছি। কিন্তু যখনই তা হয়েছি, আমাকে কাছে পাওয়ার আনন্দে মা একেবারেই ভুলে গেছেন আমার দীর্ঘ অনুপস্থিতি নিয়ে অভিযোগ করার কথা।                   

দীর্ঘ জীবন পেয়েছিলেন আমার মা। তাঁরই মতো আমিও পেয়েছি দীর্ঘ জীবন। জীবনের প্রান্তে এসে অবশেষে আমার মনে স্পষ্টতর ও অর্থবহ হয়েছে তাঁর পল্লবিত জীবনের খণ্ডচিত্রগুলো। আমি তাঁর চতুর্থ সন্তান এবং তাঁর প্রথম পুত্র। পরপর তিন কন্যা জন্ম দেওয়ার পর মায়ের ‘অপরাধবোধ’, ‘অযোগ্যতার’ অপবাদ ও অনিশ্চিত ভবিষ্যৎ নিয়ে উৎকণ্ঠায় কাটানো গ্রামীণ সে তরুণীর মনঃকষ্ট কত অসহনীয় ছিল, তা কিছুটা এখন আমি আঁচ করতে পারি। আঁকতে পারি পুত্রলাভ পরবর্তী শঙ্কাকাতর মায়ের সেসব দিনের চিত্র যখন মাতৃকোল খালি করার ষড়যন্ত্রে লিপ্ত ছিল সর্বনাশা হাম, বসন্ত, কলেরা, ম্যালেরিয়া, ডাইনির কুদৃষ্টি ইত্যাদি।

মা ছিলেন পাড়াগাঁয়ের মেয়ে। স্কুলে পড়ার কথাই ওঠেনি তাঁর শৈশবে। পড়েছেন মা-বাবা ও গৃহশিক্ষকের কাছে। পড়ার জন্য তাই তাঁর ছিল অতৃপ্ত ক্ষুধা। সে ক্ষুধা একদা আমার ওপরেও আছর করেছিল। তাঁর প্রিয় বইয়ের মধ্যে প্রথমেই ছিল মীর মশাররফ হোসেন রচিত ‘বিষাদ সিন্ধু’ এবং ফরিদ উদ্দিন আত্তার রচিত ‘তাজকেরাতুল আউলিয়া’। ওই দুটি বইয়ে বর্ণীত প্রতিটি ঘটনা তিনি সত্য মানতেন। বিষাদ সিন্ধুকে আমরা উপন্যাস আখ্যা দিলে তিনি কোনোদিন আমাদের সঙ্গে একমত হননি। লায়লি-মজনুকে পারস্যের দুটি কাল্পনিক চরিত্র বলে দাবি করলে তিনি দুঃখ পেয়েছেন।

মায়ের বিনোদনের সবচেয়ে বড় উপাদান ছিল সাপ্তাহিক ‘বেগম’ পত্রিকা। আমিও তাঁর সঙ্গে ‘বেগম’ পড়তাম মলাট থেকে মলাট পর্যন্ত। কৈশোরে তাই আমার প্রিয় ব্যক্তিত্বের নাম ছিল নুরজাহান বেগম, রাজিয়া খাতুন, সুফিয়া কামাল, শামছুন্নাহার মাহমুদ ও নীলিমা ইব্রাহিম। আমার মা ও তিন বোন রচিত গৃহকোণে বেড়ে উঠেছি বলে আমাদের এই প্রিয় পত্রিকায় পুরুষের অনুপস্থিতি আমার চোখে মোটেই অস্বাভাবিক ঠেকেনি; বড় হয়ে বিশ্বে পুরুষের অসামঞ্জস্যপূর্ণ প্রাধান্য দেখেই বরং বিস্মিত হয়েছি। 

আমরা যখন কলেজে পড়ি, তখন জন মেসফিল্ড ছিলেন যুক্তরাজ্যের পোয়েট লরিয়েট। মাত্র ছয় বছর বয়সে তিনি মা হারিয়েছিলেন। কবির মায়ের নাম ‘ক্যারোলাইন মেসফিল্ড’। মায়ের নামের আদ্যক্ষর দিয়ে ‘সিএলএম’ শিরোনামে তিনি আবেগাপ্লুত এক কবিতা লিখেছিলেন। অনন্য সে কবিতার মাত্র চারটি লাইন আমি তাৎক্ষণিক বাংলা অনুবাদ করলাম আমার মায়ের কথা লিখতে বসে:
কী সাধনা, কী প্রচেষ্টা, কী করেছি ব্যক্ত 
প্রিয় সেই মানবীর প্রতি হয়ে কৃতজ্ঞচিত্ত?    
নারীর ’পরে রয়ে গেছে পুরুষের আধিপত্য, 
নারী-অধিকার আজও পুরুষের পদদলিত। 

আরও পড়ুন

×