ঢাকা বৃহস্পতিবার, ০৪ জুন ২০২৬

শিরিনের রেখে যাওয়া মশাল

শিরিনের রেখে যাওয়া মশাল
×

চার বছর চলে গেছে, ফিলিস্তিনিদের কাছে শিরিনের স্মৃতি আজও অমলিন

স্বর্ণা চৌধুরী 

প্রকাশ: ১৭ মে ২০২৬ | ০৭:২০ | আপডেট: ১৯ মে ২০২৬ | ১৮:১২

| প্রিন্ট সংস্করণ

বুলেটের আঘাতে একটি কণ্ঠস্বরকে হয়তো স্তব্ধ করে দেওয়া যায়। সেই কণ্ঠস্বর যদি এক নিষ্পেষিত জাতিসত্তার অস্তিত্বের প্রতীকে পরিণত হয়? আলজাজিরার প্রখ্যাত সাংবাদিক শিরিন আবু আকলেহকে হত্যার পেছনের মূল উদ্দেশ্য ছিল ফিলিস্তিনিদের মনে ভয় ধরিয়ে দেওয়া, তাদের চিরতরে স্তব্ধ করে দেওয়া। ইতিহাস সাক্ষী, তাঁর রক্ত থেকে জন্ম নিয়েছে হাজারো প্রতিবাদী কণ্ঠস্বর। গাজার একেকজন তরুণের জীবনের দিকে তাকালেই এ সত্যটি স্পষ্ট হয়ে ওঠে। তাঁর শৈশবের এমন কোনো না কোনো স্মৃতির কথা হয়তো মনে পড়বে, যেখানে শিরিন আবু আকলেহের কণ্ঠস্বর রয়েছে। ফিলিস্তিনের অবরুদ্ধ ও পরিবর্তনশীল পটভূমিতে শিরিন ছিলেন এক ধ্রুবতারা।

ফিলিস্তিনের অধিকারের দাবিকে তিনি পরম মমতায় নোঙর করেছিলেন। শিরিন ফিলিস্তিনের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ঘটনাগুলো সাহসিকতার সঙ্গে তুলে ধরেছেন–২০০২ সালের দ্বিতীয় ইন্তিফাদা থেকে শুরু করে জেনিনের রক্তক্ষয়ী যুদ্ধ পর্যন্ত। ২০০৫ সালে প্রথম আরব সাংবাদিক হিসেবে তিনি ইসরায়েলের কুখ্যাত অ্যাশকেলন কারাগারে প্রবেশ করে বছরের পর বছর বন্দি থাকা ফিলিস্তিনিদের সাক্ষাৎকার নিয়েছিলেন।

সাংবাদিক ও গবেষক নূর আবু আয়েশা বলেন, ‘২০১৪ সালে যখন গাজায় ইসরায়েলি আগ্রাসন চলছে, তখন আমার বয়স মাত্র ১২ বছর। কিন্তু ওই বয়সেই নিয়মিত খবর দেখতাম। প্রতি ঘণ্টার শুরুতে টিভির সামনে অধীর আগ্রহে বসে থাকতাম শিরিন কী বলেন, তা শোনার জন্য। যুদ্ধবিরতি কি আসছে? গাজার ওপর বোমাবর্ষণ বন্ধ করতে ইসরায়েল কি কোনো আন্তর্জাতিক চাপে পড়েছে? শিরিনের কথায় গাজার মানুষের সীমাহীন যন্ত্রণার প্রতিধ্বনি থাকলেও, পর্দায় তাঁর উপস্থিতি ফিলিস্তিনিদের মনে এক অদ্ভুত আশা আর বেঁচে থাকার অনুপ্রেরণা জোগাত। ধর্ম বা রাজনৈতিক পরিচয়ের ঊর্ধ্বে উঠে সব ফিলিস্তিনির কাছে তিনি ছিলেন পরম শ্রদ্ধা ও ভালোবাসার এক নাম।’

এরপর আসে ২০২২ সালের ১১ মে। দিনটি ফিলিস্তিনিদের জন্য এক গভীর শোকের বার্তা নিয়ে আসে। সংবাদ সংগ্রহকালে ইসরায়েলি বাহিনীর গুলিতে মাটিতে লুটিয়ে পড়েন সবার প্রিয় শিরিন। পাশে দাঁড়িয়ে সহকর্মীদের মরিয়া হয়ে অ্যাম্বুলেন্স ডাকার সেই দৃশ্য বিশ্ববাসীকে স্তব্ধ করে দেয়। প্রকাশ্য দিবালোকে ফিলিস্তিনের অন্যতম শীর্ষ একজন সাংবাদিকের এই হত্যা শুধু একটি মর্মান্তিক অপরাধই ছিল না, এটি ছিল অনাগত এক ভয়ংকর ভবিষ্যতের অশনিসংকেত। শিরিনকে স্নাইপারের গুলিতে হত্যা করা হয়। অর্থাৎ এটা ছিল ‘টার্গেট কিলিং’।

এ ঘটনার দেড় বছর পর গাজায় শুরু হয় ফিলিস্তিনি সাংবাদিকদের ওপর সুপরিকল্পিত নিধনযজ্ঞ। এখন পর্যন্ত অন্তত ২৬০ জন সংবাদকর্মীকে হত্যা করা হয়েছে। ইসরায়েল আজ বিশ্বজুড়ে ‘সাংবাদিকদের সবচেয়ে বড় হত্যাকারী’ হিসেবে স্বীকৃত। আনাস আল-শরিফ, ফাদি আল-ওয়াহিদি এবং মরিয়ম আবু দাক্কার মতো নির্ভীক সাংবাদিকের রক্তে রঞ্জিত হয়েছে গাজার মাটি। কিন্তু শিরিন কিংবা এই বীর সাংবাদিকদের মৃত্যু কি তরুণদের ভয় দেখাতে পেরেছে? না; বরং তারা ক্যামেরা, মাইক্রোফোন আর কলম হাতে তুলে নিয়ে সত্য প্রকাশের এ লড়াই চালিয়ে যেতে আরও বেশি অনুপ্রাণিত হয়েছে।

নূর আবু আয়েশা তাদেরই একজন। শিরিনের মৃত্যু তাঁর ভেতরের জগৎটাকে ওলটপালট করে দিয়েছিল। সে সময় তিনি ছিলেন ইংরেজি সাহিত্যের শিক্ষার্থী। ভাষা আর গল্প বলার জাদুতে মগ্ন থাকতেন সারাক্ষণ। কিন্তু শিরিনের হত্যাকাণ্ড তাঁকে সাহিত্যের কল্পজগৎ থেকে টেনে এনে দাঁড় করায় রূঢ় বাস্তবতার মুখোমুখি। তিনি গভীরভাবে উপলব্ধি করেন– সাহিত্য মানুষের সংস্কৃতিকে বাঁচিয়ে রাখে ঠিকই, কিন্তু সাংবাদিকতা বর্তমানের সত্যকে রক্ষা করে। তিনি শুধু লিখতেই চাননি; আরও চেয়েছেন বিশ্বস্ত এক সাক্ষী হতে, সত্যের জানান দিতে। শিরিনের মতো হতে চেয়েছেন।

গাজা সিটির একজন বাসিন্দা হিসেবে নূর উত্তর গাজায় ভয়াবহ ধ্বংসযজ্ঞের প্রত্যক্ষ সাক্ষী হন। একাধিক ইসরায়েলি হামলা থেকে প্রাণে বেঁচে যান এবং পরিবারের সঙ্গে বারবার বাস্তুচ্যুত হন। এই অবর্ণনীয় বিভীষিকার মধ্যেই গণহত্যার অভিজ্ঞতা নিয়ে ডায়েরি লিখতে শুরু করেন। যখন ইসরায়েল প্রতি সপ্তাহে সাংবাদিকদের হত্যা করছে, যখন বিশ্ববিবেক এই হত্যাযজ্ঞ থামাতে চরমভাবে ব্যর্থ, তখনও তিনি থামেননি। 

আজ গাজায় একটি ‘যুদ্ধবিরতি’ বিদ্যমান, কিন্তু সাংবাদিকদের হত্যা করা থামেনি। গত মাসেই ইসরায়েলি বাহিনী আলজাজিরার সংবাদদাতা মোহাম্মদ উইশাহকে হত্যা করেছে। তবু ফিলিস্তিনের তরুণেরা আজ ভয়াবহতার মুখেও কলম হাতে রুখে দাঁড়িয়েছে। তাদের শব্দের আঁচড়ে ফুটে উঠছে তীব্র প্রতিবাদ। শিরিনের হাত থেকে খসে পড়া মশালটি এখন তাদের হাতে, আর তারাই তা সামনের দিকে এগিয়ে নিয়ে যাচ্ছে। 

সৌজন্যে: আলজাজিরা

আরও পড়ুন

×