ভেঙে যাওয়া পরিবারে মানসিক যত্ন
বিচ্ছেদ-পরবর্তী ট্রমা শুধু দুজন মানুষকেই নয়, এর সঙ্গে জড়িত একাধিক পরিবারকে সরাসরি প্রভাবিত করে - অলংকরণ:: কেনেথ অ্যাগনেলো
লাবণী মণ্ডল
প্রকাশ: ১৭ মে ২০২৬ | ০৭:২৪ | আপডেট: ১৯ মে ২০২৬ | ১৭:৫৭
| প্রিন্ট সংস্করণ
দাম্পত্য–মানব সমাজের প্রাচীনতম এবং বোধহয় সবচেয়ে সুদৃঢ় প্রতিষ্ঠান। এটি কেবল দুজন প্রাপ্তবয়স্ক মানুষের আইনি, সামাজিক বা ধর্মীয় কোনো চুক্তি নয়; এটি মনস্তাত্ত্বিক, আবেগিক আর আত্মিক বোঝাপড়ার এক নিরন্তর যাত্রা। যখন সেই বোঝাপড়ার সুতোয় টান পড়ে, একই ছাদের নিচে বসবাস করা দুজন মানুষের মধ্যে যোজন যোজন মানসিক দূরত্ব তৈরি হয়, তখন শুধু একটি পরিবার আইনিভাবে ভাঙে না, বরং এর সঙ্গে যুক্ত প্রত্যেক মানুষের– বিশেষ করে স্বামী, স্ত্রী এবং সন্তানদের মানসিক জগতে পরিবর্তন ঘটে যায়। লিখেছেন লাবণী মণ্ডল
--------------------------------------------------------------------
সম্প্রতি বাংলাদেশের শহর থেকে শুরু করে গ্রামীণ সমাজেও বিয়ে বিচ্ছেদের হার বেড়েছে। পারস্পরিক সম্মতিতে সম্পর্ক ভাঙতে পারে। এর বাইরে এর সামষ্টিক প্রভাব এড়িয়ে যাওয়ার মতো নয়। একটি ‘ভগ্ন পরিবার’ বা ব্রোকেন ফ্যামিলি কেবল পরিসংখ্যানের শুষ্ক সংখ্যা নয়; এক বহুমাত্রিক ট্রমার নাম। এই ট্রমা শিশুর ভবিষ্যৎ অন্ধকারে ঠেলে দেয়, স্বামী-স্ত্রীর জীবনে দীর্ঘস্থায়ী শূন্যতা তৈরি করে, সমাজকাঠামোকে দুর্বল করে দেয়। বিচ্ছেদের প্রভাব আইনি কাগজপত্রে সীমাবদ্ধ থাকে না। সংশ্লিষ্ট সবার মানসিক স্বাস্থ্য, প্রাত্যহিক আচরণ ও সামাজিক সম্পর্কের ওপর গভীর ছাপ ফেলে। পাশাপাশি এটিও সত্য, অসম্মানজনক দাম্পত্য সম্পর্ক বজায় রাখার সামাজিক চাপ থেকে অনেকটা মুক্তি মেলায়, অনেক পরিবার একাধিক ক্ষেত্রে বড় ধরনের পারিবারিক সহিংসতা এড়াতে পেরেছে। তাই ট্যাবু ভেঙে ‘ভগ্ন পরিবার’বিষয়ক ভাবনার কেন্দ্র হতে পারে বিচ্ছেদ-পরবর্তী সময়ে নারী, পুরুষ ও শিশু সদস্যদের মানসিক পুনর্বাসন ও পরিচর্যা। পরিচর্যার শর্ত হিসেবে প্রথমেই চাই ক্ষত উন্মোচন। এরপর গভীরতা ও পরিণতি বিচার। সবশেষে উপশমকল্পে কাজ করা। এ লক্ষ্যে বিভিন্ন ভগ্ন পরিবার ও বড় কিছু ক্ষত বিষয়ে খোলামেলা কথা বলা যাক।
নীরব বিচ্ছেদ
আইনি বিচ্ছেদের চেয়েও কখনও কখনও সন্তান ও পরিবারের জন্য ভয়ংকর হয়ে ওঠে ‘সাইলেন্ট ডিভোর্স’ বা নীরব বিচ্ছেদ। এটি এমন এক মনস্তাত্ত্বিক অবস্থা; যেখানে দম্পতি মানসিকভাবে সম্পূর্ণ বিচ্ছিন্ন, যদিও সামাজিকভাবে বিবাহিত। তারা একই ছাদের নিচে থাকেন, এক বিছানায় ঘুমান কিন্তু তাদের মধ্যে কোনো মানসিক সংযোগ থাকে না। এটি আইনি কোনো প্রক্রিয়া নয়, বরং সম্পর্কের এক অদৃশ্য মৃত্যু।
আইটি ব্যবসায়ী আলিফ ও ব্যাংকার মিলার (ছদ্মনাম) ১৫ বছরের সংসার। দুই সন্তান। আর্থিকভাবে সচ্ছল হলেও গত দেড় দশকে তাদের মানসিক দূরত্ব সুস্পষ্ট। একসময় রাতভর গল্প করা এই দম্পতির মধ্যে এখন অর্থপূর্ণ কথোপকথন শূন্য। দৈনন্দিন কাজ ছাড়া ব্যক্তিগত বা আবেগিক কোনো আলোচনা নেই। তারা একে অপরকে এড়িয়ে চলেন, শারীরিক ঘনিষ্ঠতাও প্রায় নেই। এই নীরব শীতল-যুদ্ধ সন্তানদের ওপর নেতিবাচক প্রভাব ফেলে। ভালোবাসা ও অনুভূতির প্রকাশহীন সম্পর্ক দেখে সন্তানরা নিরাপত্তাহীনতায় ভোগে। মনোরোগ বিশেষজ্ঞদের মতে, এমন পরিবারে শিশুরা নানান ভুল ধারণা নিয়ে বড় হয়। সমাজের ভয়ে বা সন্তানের দোহাই দিয়ে যারা এই সাইলেন্ট ডিভোর্সে আটকে থাকেন, তারা একটি ত্রুটিপূর্ণ পরিবেশে সন্তান বড় করেন। আইনি বিচ্ছেদের চেয়েও এর প্রভাব বড় হতে পারে।
অন্তহীন লড়াই
বাংলাদেশের মতো রক্ষণশীল সমাজে বিচ্ছেদ আজও এক ‘ট্যাবু’। সমাজ আজও বিচ্ছেদপ্রাপ্ত নারীকে নেতিবাচক দৃষ্টিতে দেখে। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ক্লিনিক্যাল সাইকোলজি বিভাগের এক গবেষণায় দেখা গেছে, বিচ্ছেদের কারণে নারীরা শারীরিক, আবেগিক, চিন্তনগত, সামাজিকসহ সাতটি ক্ষেত্রে তীব্র বৈকল্যের শিকার হন।
আন্তর্জাতিক সংস্থায় উচ্চপদস্থ কর্মকর্তা সুমাইয়া ভালোবেসে বিয়ে করেছিলেন শাহরিয়ারকে (ছদ্মনাম)। সুমাইয়ার পেশাগত ব্যস্ততা শাহরিয়ারের পুরুষতান্ত্রিক অহমে আঘাত হানে। শুরু হয় মৌখিক ও শারীরিক নির্যাতন। বাধ্য হয়ে সুমাইয়া বিচ্ছেদের পথ বেছে নেন। অন্যদিকে, গুলশানের ধনাঢ্য পরিবারের গৃহবধূ আয়েশাও (ছদ্মনাম) স্বামীর নিয়মিত মদ্যপান ও নির্যাতনের শিকার হয়ে বিচ্ছেদে যান। উচ্চবিত্ত বা নিম্নবিত্ত– কোনো নারীই যেন এই আগ্রাসন থেকে মুক্ত নন। বিচ্ছেদের পর আইনি স্বাধীনতা মিললেও একাকিত্ব, সন্তানের ভবিষ্যৎ আর সমাজের বাঁকা দৃষ্টি তাদের প্রতিনিয়ত দগ্ধ করে।
নিঃশব্দ হাহাকার
বিচ্ছেদের আলোচনায় সমাজ ও মিডিয়া নারীর দুর্দশাকে প্রাধান্য দিলেও পুরুষদের ট্রমাও কম নয়। ‘পুরুষরা কাঁদে না’–এই সামাজিক কাঠামোর কারণে তাদের কষ্টগুলো মূলত ‘নিঃশব্দ হাহাকার’ হয়েই থাকে। বিচ্ছেদের পর পুরুষদের সবচেয়ে বড় সংকট হলো তীব্র একাকিত্ব। গবেষণায় দেখা যায়, বিচ্ছেদপ্রাপ্ত পুরুষরা বিবাহিতদের তুলনায় অনেক বেশি শারীরিক ও মানসিক সমস্যায় ভোগেন। ইউসিএলএ লোনলিনেস স্কেল অনুযায়ী, সঙ্গীহীন পুরুষরা স্মৃতিভ্রম ও দীর্ঘস্থায়ী ব্যাধিতে বেশি ভোগেন। আবেগ প্রকাশের জায়গা না থাকায় অনেকে মাদকের আশ্রয় নেন বা আগ্রাসী আচরণ করেন। সন্তান নিয়ে টানাপোড়েনও পুরুষের মনে মানসিক ক্ষত তৈরি করে। সাংবাদিক রাজিনের (ছদ্মনাম) গল্পটি এমনই। ভালোবেসে বিয়ে করা স্ত্রীর সঙ্গে পাঁচ বছরের সংসারে অবনতি ঘটলে দুই বছর আগে তাদের বিচ্ছেদ হয়। রাজিনের জীবনে সবচেয়ে বড় আঘাত আসে যখন তিনি তাঁর সন্তানের কাছ থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে যান। বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে প্রায় ৯০ শতাংশ ভগ্ন পরিবারে ছেলেরা ‘নন-রেসিডেনশিয়াল প্যারেন্ট’। তারা সন্তানকে কাছে পান না। সন্তানের সঙ্গে এই দূরত্ব বাবার জন্য চরম হতাশা ও অপরাধবোধের জন্ম দেয়।
বিপন্ন শৈশব
বিচ্ছেদে স্বামী-স্ত্রীর আইনি চুক্তি বাতিল হয়, কিন্তু এর নীরব ভুক্তভোগী শিশুরা। এই তিক্ততা একটি শিশুর মানসিক, আবেগিক ও সামাজিক বিকাশের ভিত ধসিয়ে দেয়। গবেষণায় প্রমাণিত, ভগ্ন পরিবারের শিশুরা মানসিক সমস্যা, শিক্ষাজীবনে অবনতি ও সামাজিক অদক্ষতায় বেশি ভোগে। এই প্রভাব কেবল সাময়িক নয়, বরং আন্তঃপ্রজন্মীয় হিসেবে ভবিষ্যৎ জীবনকেও বিষাক্ত করে। পঞ্চম শ্রেণির আরিয়ানার মা-বাবার বিচ্ছেদ হয়েছে। বাবার কাছে থাকলেও মায়ের জন্য তার মন কাঁদে। আরিয়ানা বলে, ‘আমি মা-বাবা দুজনকেই ভালোবাসি, দুজনের সঙ্গেই থাকতে চাই।’ অষ্টম শ্রেণির সিয়াম চার বছর আগে বিচ্ছেদের কথা জানতে পারে। মা-বাবা দুজনেরই আলাদা সংসার হওয়ায় সে নিজেকে খুব একা অনুভব করে।
সন্তানের মনোজগতে ঝড়
মা-বাবার বিচ্ছেদ শুধু একটি দাম্পত্য সম্পর্কের ইতি টানে না, বরং একটি শিশুর মনোজগতে প্রবল আলোড়ন সৃষ্টি করে। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ক্লিনিক্যাল সাইকোলজি বিভাগের অধ্যাপক কামাল চৌধুরীর মতে, এই বিচ্ছিন্নতার প্রভাব নির্ভর করে সন্তানের সঙ্গে মা-বাবার সম্পর্কের গভীরতার ওপর। যখন একজন শিশু মা এবং বাবা উভয়কেই সমানভাবে ভালোবাসে, তখন বিচ্ছেদের সিদ্ধান্ত তাদের এক দিশেহারা করে দেয়। কার কাছে সে থাকবে, এ সিদ্ধান্ত নিতে গিয়ে অপরাধবোধ তাদের গ্রাস করে।
বাবার কাছে থাকলে মায়ের জন্য, মায়ের কাছে থাকলে বাবার জন্য তারা দহনে ভোগে। অন্যদিকে, কোনো এক পক্ষের প্রতি টান কম থাকলে, অপর পক্ষকে সহজেই দোষ দেওয়ার প্রবণতা জন্ম নেয়। তারা কোনো একজন অভিভাবকের শূন্যতা নিয়েই বড় হয়। সামাজিক ও ব্যক্তিত্বের স্বাভাবিক গঠনে এর নেতিবাচক প্রভাব অনিবার্য। সন্তানের জীবনে মা এবং বাবা উভয়েরই রয়েছে ভিন্ন ও অপরিহার্য ভূমিকা। মা-বাবার সম্পর্ক দেখেই একটি শিশু দাম্পত্য নারী-পুরুষ সম্পর্কের প্রথম পাঠ গ্রহণ করে, যেখান থেকে এই শিশুরা বঞ্চিত থেকে যায়। কখনও তারা উভয়পক্ষের ভালোবাসাই হারায়। অনেক সময় সন্তানরা এ বিচ্ছেদের জন্য নিজেদেরই দায়ী করতে শুরু করে। তারা ভাবতে থাকে, হয়তো তাদের কোনো ব্যর্থতার কারণেই মা-বাবার সম্পর্ক টেকেনি। এই ভিত্তিহীন অপরাধবোধ তাদের পরবর্তী জীবনে ক্ষতের সৃষ্টি করে। এমন পরিবেশে বেড়ে ওঠা শিশুরা বিষণ্নতা, মানসিক অবসাদ এবং উদ্বেগজনিত নানা মানসিক রোগের শিকার হয় বেশি। বিশেষ করে ছেলেদের ক্ষেত্রে এই হতাশা বিপজ্জনক রূপ নেয়। বয়ঃসন্ধিকালে নিজের প্রতি ক্ষোভ বা সেলফ-ব্লেম থেকে মুক্তি পেতে অনেকেই মাদকের আশ্রয় নেয়, অপরাধ জগতে পা বাড়ায়। তবে এটি সবার ক্ষেত্রে ঘটে না। বিচ্ছেদের পর সন্তানের সঙ্গে মা-বাবার পরিবর্তিত সম্পর্ক, তাদের পারিপার্শ্বিক পরিবেশ এবং অন্যান্য সাপোর্ট সিস্টেমের ওপরই নির্ভর করে সন্তানের ভবিষ্যৎ মানসিক সুস্থতা।
ভগ্ন পরিবার কেবল একটি পরিসংখ্যান নয়, একটি জীবন্ত ক্ষত। একইসঙ্গে পরিচর্যা পেলে তা স্বাস্থ্যকর সামাজিক পরিবেশের প্রভাবকও হয়ে উঠতে পারে। প্রাক্তন স্বামী-স্ত্রী ও শিশুর মানসিক মৃত্যু কাম্য নয়। সমাজ ও রাষ্ট্রকে এর দায়িত্ব নিতে হবে। বিচ্ছেদ-পরবর্তী মানসিক পরিচর্যার অনুকূল পারিবারিক ও সামাজিক পরিবেশ তৈরিতে পেশাদার কাউন্সেলিং-ব্যবস্থাপনা এখন সময়ের দাবি।
- বিষয় :
- মানসিক স্বাস্থ্য
- লাবণী মণ্ডল
- পরিবার
- সমাজ
