ঢাকা রোববার, ১৯ জুলাই ২০২৬

জলবায়ু সহনশীলতার লড়াইয়ে ‘দুর্বার কন্যা’

জলবায়ু সহনশীলতার লড়াইয়ে ‘দুর্বার কন্যা’
×

প্রকল্পের আয়োজকদের সঙ্গে ‘দুর্বার কন্যা’দের একাংশ

রিক্তা রিচি

প্রকাশ: ০৫ জুলাই ২০২৬ | ০৭:৩৪ | আপডেট: ০৫ জুলাই ২০২৬ | ১৪:৫৮

| প্রিন্ট সংস্করণ

উপকূলের আছড়ে পড়া জলোচ্ছ্বাস কিংবা উত্তরের তীব্র খরা–জলবায়ু পরিবর্তনের যে কোনো বড় ধাক্কা সবচেয়ে আগে এসে লাগে প্রান্তিক নারীর গায়ে। পুরুষ কাজের সন্ধানে অন্যত্র যেতে পারলেও, সংসার আর সন্তানকে আগলে রেখে দুর্যোগের সঙ্গে লড়াই করতে হয় নারীকেই। সামাজিক কাঠামোর সীমাবদ্ধতা, সম্পদের অভাব এবং সিদ্ধান্ত গ্রহণে অংশ নিতে না পারার কারণে যুগ যুগ ধরে নারীই জলবায়ু পরিবর্তনের প্রধান ‘ভুক্তভোগী’। কিন্তু সমতার এই যুগে এসে হিসাবটা বদলাতে শুরু করেছে। নারী কেবল সাহায্যপ্রার্থী বা ভুক্তভোগী হয়ে থাকতে রাজি নন। তারা এখন দুর্যোগ মোকাবিলার প্রস্তুতি থেকে শুরু করে নীতিনির্ধারণ–সব জায়গায় নেতৃত্ব দিতে প্রস্তুত। এ পরিবর্তনের হাওয়াকে বেগবান করতেই বাংলাদেশে যাত্রা শুরু করেছে প্ল্যান ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশের নতুন প্রোগ্রাম মডেল ‘দুর্বার কন্যা’।

বাংলাদেশের জাতীয় অভিযোজন পরিকল্পনা (২০২৩–২০৫০)-এ পরিষ্কার বলা আছে, জলবায়ু ঝুঁকি হ্রাসে অন্তর্ভুক্তিমূলক সমাধান জরুরি। ‘দুর্বার কন্যা’ মডেল এই পরিকল্পনার সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ। এটি স্থানীয় কিশোরী ও যুব নারীদের স্থানীয় সরকার এবং দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা কাঠামোর সঙ্গে সরাসরি যুক্ত করবে। প্ল্যান ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশের কান্ট্রি ডিরেক্টর কবিতা বোসের মতে, ‘জলবায়ু সংকট মোকাবিলায় কিশোরীদের কেবল অংশগ্রহণকারী হিসেবে নয়, বরং পরিবর্তনের নেতৃত্বদানকারী হিসেবে গড়ে তুলতে হবে।’ অর্থাৎ যে নারীরা পরিবেশের বাস্তব অভিজ্ঞতায় সবচেয়ে বেশি সমৃদ্ধ, তাদের কণ্ঠস্বরকেই নীতিনির্ধারণের কেন্দ্রে আনতে হবে।

দুর্যোগের বাস্তবতা সবচেয়ে ভালো বোঝেন তারাই, যারা প্রতিনিয়ত এর সঙ্গে লড়াই করেন। ‘দুর্বার কন্যা’র উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে ভোলার ফারজানা, বরগুনার উম্মি আক্তার ও ইসরাত জাহান এবং খুলনার সাথী তরফদারের মতো যুব নারীদের অভিজ্ঞতা সেটিই প্রমাণ করেছে। তারা শুধু ঘূর্ণিঝড় আর জলোচ্ছ্বাসের ভয়াল গল্প শোনাননি, শুনিয়েছেন ঘুরে দাঁড়ানোর আত্মবিশ্বাসের কথা। তাদের মতে, সঠিক প্রশিক্ষণ, প্রযুক্তিগত জ্ঞান আর সিদ্ধান্ত গ্রহণের সুযোগ পেলে এ তরুণীরাই দুর্যোগের সময় গোটা কমিউনিটির জন্য রক্ষাকবচ হয়ে উঠতে পারেন।

দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা ও ত্রাণ মন্ত্রণালয়ের সচিব মো. সাইদুর রহমান খান বলেছেন, শুধু অবকাঠামো বা প্রযুক্তিগত উন্নয়ন দিয়ে দুর্যোগ মোকাবিলা সম্ভব নয়; প্রয়োজন সচেতন ও দক্ষ মানবসম্পদ। ‘দুর্বার কন্যা’ মডেলটি শুধু দুর্যোগ ঝুঁকি কমানোর কৌশলই শেখাবে না; এটি কিশোরীদের স্বাস্থ্য অধিকার, ডিজিটাল দক্ষতা এবং অর্থনৈতিক ক্ষমতায়নের মতো মৌলিক জায়গাগুলোতেও কাজ করবে। কারণ অর্থনৈতিক ও সামাজিকভাবে স্বাবলম্বী একজন নারীই পারেন সমাজের দৃষ্টিভঙ্গি বদলে দিতে।

পরিবেশ, বন ও জলবায়ু পরিবর্তন মন্ত্রণালয়ের প্রতিমন্ত্রী শেখ ফরিদুল ইসলামের কথায়, ‘কিশোরীরা শুধু জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাবের শিকার নয়; তারা জলবায়ু সমাধানেরও গুরুত্বপূর্ণ অংশীদার।’ এ ধারণাই একটি অন্তর্ভুক্তিমূলক বাংলাদেশের ভিত্তি রচনা করে। নরওয়ের রাষ্ট্রদূত এইচ. ই. হকন আরাল্ড গুলব্রানসেনও যুব নারীর নেতৃত্ব বিকাশের মাধ্যমে শক্তিশালী কমিউনিটি গড়ার ওপর জোর দিয়েছেন।

জলবায়ু পরিবর্তনের অভিঘাত আগামীতে আরও বাড়বে। এই অসম লড়াইয়ে জয়ী হতে হলে সমাজের অর্ধেক জনগোষ্ঠীকে পেছনে ফেলে রাখার কোনো সুযোগ নেই। ‘দুর্বার কন্যা’ তাই কেবল একটি প্রকল্প নয়, এটি ভবিষ্যতের নারী নেতৃত্ব গড়ে তোলার এক যুগান্তকারী বিনিয়োগ। দুর্যোগের কাছে অসহায় আত্মসমর্পণের বদলে যখন এই ‘দুর্বার কন্যা’রা সমতার ভিত্তিতে জলবায়ু মোকাবিলার নেতৃত্বে দাঁড়াবেন, কেবল তখনই নিশ্চিত হবে সত্যিকারের একটি জলবায়ু-সহনশীল বাংলাদেশ।

আরও পড়ুন

×