ঢাকা বৃহস্পতিবার, ০৩ সেপ্টেম্বর ২০২৬

নারী উদ্যোক্তা

পাহাড়ের বুকে ‘স্বপ্নচূড়া’

পাহাড়ের বুকে ‘স্বপ্নচূড়া’
×

নিজের রেস্তোরাঁ ‘স্বপ্নচূড়া’য় নেইম্রা মারমা

লাবণী মণ্ডল

প্রকাশ: ২৬ জুলাই ২০২৬ | ০৭:৩৬ | আপডেট: ২৭ জুলাই ২০২৬ | ২১:৫২

| প্রিন্ট সংস্করণ

খাগড়াছড়ির সবুজ পাহাড়ের ভাঁজে ভাঁজে লুকিয়ে থাকে কতশত না-বলা সংগ্রামের গল্প। তেমনই এক অদম্য সংগ্রামের প্রতিচ্ছবি নেইম্রা মারমা। পাহাড়ের আর দশটা সাধারণ পরিবারের মতোই অভাবের সঙ্গে নিত্য বসবাস ছিল তাঁর। জীবন যখন তাঁকে কঠিনতম পরীক্ষার মুখোমুখি দাঁড় করাল–মা ও ভাইকে হারিয়ে সংসারের পুরো ভার যখন তাঁর কাঁধে এসে পড়ল, তখন তিনি ভেঙে পড়েননি। বরং বেছে নেন কণ্টকাকীর্ণ এক পথ। পুঁজি বলতে হাতে ছিল মাত্র ১২ হাজার টাকা আর পাহাড়সম আত্মবিশ্বাস।

২০১৭ সালের কথা, পারিপার্শ্বিক নানা প্রতিবন্ধকতা আর সামাজিক ভ্রুকুটি উপেক্ষা করে নেইম্রা শুরু করেন একটি ছোট্ট খাবারের দোকান। বুকভরা আশা নিয়ে শখ করে সেই দোকানের নাম দিয়েছিলেন ‘স্বপ্নচূড়া’।

ফুচকা, নুডলস আর জনপ্রিয় পাহাড়ি খাবার ‘মুণ্ডি’ দিয়ে শুরু হয়েছিল স্বপ্নচূড়ার যাত্রা। সাফল্যের পথ কখনোই মসৃণ হয় না। শুরুর দিকে রেস্টুরেন্টে ঝুড়িতে করে খাবার আনা-নেওয়া করতে দেখে অনেকেই তাঁকে নিয়ে উপহাস করেছিলেন। একপর্যায়ে অনাকাঙ্ক্ষিত এক পরিস্থিতিতে তাঁর সবকিছু প্রায় হারানোর উপক্রম হয়। কিন্তু দমে যাওয়ার পাত্রী নন নেইম্রা। অদম্য মনোবল নিয়ে শূন্য থেকে পুনরায় ব্যবসা শুরু করেন। তাঁর আন্তরিক সেবা আর খাবারের স্বাদে ধীরে ধীরে বাড়তে থাকে ক্রেতার আনাগোনা।

নেইম্রারের এই ঘুরে দাঁড়ানোর পেছনে যেমন ছিল কঠোর পরিশ্রম, তেমনি ছিল সঠিক সময়ে পাওয়া সঠিক দিকনির্দেশনা। এই স্বপ্নযাত্রায় সহযোগী হিসেবে যুক্ত হয় বিশ্বব্যাংক ও পল্লী কর্ম-সহায়ক ফাউন্ডেশনের (পিকেএসএফ) অর্থায়নে এবং আইডিএফ কর্তৃক বাস্তবায়িত ‘রেইজ’ প্রকল্প।

২০২৪ সালে একজন সম্ভাবনাময় তরুণ উদ্যোক্তা হিসেবে নেইম্রা এই প্রকল্প থেকে ৫ লাখ টাকা ঋণ সুবিধা পান, যা তাঁর ব্যবসায় এক অভাবনীয় গতির সঞ্চার করে। তবে নেইম্রার মতে, শুধু আর্থিক সহায়তাই নয়, এ প্রকল্পের আওতায় পাওয়া ১৬ দিনের নিবিড় প্রশিক্ষণ ছিল তাঁর জীবনের অন্যতম বড় এক প্রাপ্তি।

নেইম্রা বলেন, ‘এই প্রশিক্ষণ আমার আত্মবিশ্বাস বহুগুণ বাড়িয়ে দিয়েছে। আমি শিখেছি ব্যবসায়ের সব আয় নিছক মুনাফা নয়; ভবিষ্যতের জন্য বিনিয়োগ ও সঞ্চয়ের গুরুত্ব অপরিসীম।’ বর্তমানে অনলাইন মার্কেটিং এবং আধুনিক হিসাবরক্ষণ পদ্ধতি তাঁর ব্যবসার অবিচ্ছেদ্য অংশ।

ঋণের টাকা আর নিজের সঞ্চয় কাজে লাগিয়ে নেইম্রা তাঁর রেস্টুরেন্টের কলেবর বাড়িয়েছেন। এখন সেখানে দুপুরে খাবার থেকে শুরু করে বিকেলে মুখরোচক নানা স্ন্যাকস পরিবেশন করা হয়। আগে যেখানে মাত্র ১০-২০ জন বসতে পারতেন, সেখানে এখন ১০০ জনেরও বেশি মানুষের বসার ব্যবস্থা রয়েছে। পরিবারের ছোট সদস্যদের কথা মাথায় রেখে যুক্ত করা হয়েছে একটি চমৎকার কিডস জোন এবং নান্দনিক ফিশ অ্যাকুয়ারিয়াম।

বর্তমানের ‘স্বপ্নচূড়া’ খাগড়াছড়ির ভোজনরসিকদের কাছে তুমুল জনপ্রিয়। রেস্টুরেন্টটির প্রতিদিনের গড় আয় দাঁড়িয়েছে ২০ হাজার থেকে ২৫ হাজার টাকা। সবচেয়ে অবাক করা বিষয়, তাঁর রেস্টুরেন্টের জনপ্রিয়তা এতটাই ছড়িয়েছে, এটি যে এলাকায় অবস্থিত, স্থানীয়দের কাছে সেটি এখন ‘স্বপ্নচূড়া আবাসিক এলাকা’ নামেই পরিচিতি লাভ করেছে।

ব্যক্তিগত স্বনির্ভরতা অর্জনের পাশাপাশি নেইম্রারের মধ্যে জন্ম নিয়েছে এক গভীর সামাজিক দায়বদ্ধতা। বর্তমানে তাঁর প্রতিষ্ঠানে ১৫ জন নারীর কর্মসংস্থান হয়েছে; যাদের মধ্যে ১২ জন পূর্ণকালীন এবং তিনজন খণ্ডকালীন কাজ করছেন। স্থানীয় পর্যায়ে প্রাতিষ্ঠানিক কাজে যুক্ত করার ভাবনা থেকে সচেতনভাবেই তিনি নারীদের নিয়োগে অগ্রাধিকার দিয়েছেন। বিশেষ করে, পাহাড়ের দুর্গম এলাকা থেকে আসা যেসব শিক্ষার্থী অর্থের অভাবে পড়াশোনা চালিয়ে যেতে পারছিলেন না, তাদের কর্মসংস্থানের ব্যবস্থা করেছেন নেইম্রা।

যে মানুষগুলো একসময় তাঁকে নিয়ে উপহাস করত, আজ সাত বছর পর তাদের কাছেই নেইম্রা এক বিস্ময়। একসময়ের অবহেলিত সেই নারী আজ বিভিন্ন অনুষ্ঠানে অতিথি হিসেবে আমন্ত্রিত হন। ভবিষ্যৎ উদ্যোক্তাদের উদ্দেশ্যে নেইম্রা মারমা বলেন, ‘স্বপ্ন দেখুন, সাহস রাখুন আর কখনও হাল ছাড়বেন না।’

তাঁর ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা হলো–ঢাকা ও চট্টগ্রামের মতো বড় শহরগুলোয় ‘স্বপ্নচূড়া’ ব্র্যান্ডের শাখা বিস্তার করা। নেইম্রা আজ পাহাড়ের নারীদের জন্য এক সংগ্রামী উদাহরণ। তিনি প্রমাণ করেছেন, সঠিক দিকনির্দেশনা আর সুযোগ পেলে নারীরা অর্থনৈতিক মূলধারায় নেতৃত্ব দিতে পারেন।

আরও পড়ুন

×