ঢাকা শনিবার, ১৫ আগস্ট ২০২৬

নিরাপত্তাহীন শৈশব

নিরাপত্তাহীন শৈশব
×

ছবি :: হুজ্জাতুল মুরসালিন

আবু আহমেদ ফয়জুল কবির

প্রকাশ: ২৬ জুলাই ২০২৬ | ০৭:৩৯ | আপডেট: ২৭ জুলাই ২০২৬ | ২১:৫৮

| প্রিন্ট সংস্করণ

শিশুর ওপর নির্যাতনের ঘটনাগুলো বিচ্ছিন্ন ঘটনা নয়; বরং দেশের শিশু অধিকার পরিস্থিতির গভীর সংকটের প্রতিচ্ছবি। প্রতিবার একটি শিশুর রক্তাক্ত শরীর কিংবা অসহায় কান্না আমাদের সেই বাস্তবতার মুখোমুখি দাঁড় করিয়ে দেয়...
-----------------------------------------------------------

২০২৬ সালের মে মাসের এক সকালে রাজধানীর পল্লবীতে আট বছরের দ্বিতীয় শ্রেণির এক ছাত্রীর ধর্ষণের পর হত্যার খবর মুহূর্তেই সারাদেশকে স্তব্ধ করে দিয়েছিল। পাশের একটি ঘরে নিয়ে শিশুটির ওপর চালানো হয় পৈশাচিক নির্যাতন; এরপর হত্যা করা হয়। এ ঘটনায় রাজপথে নেমেছিল মানুষ, সামাজিক মাধ্যমে ছড়িয়ে পড়ে ক্ষোভের ঝড়, দ্রুত বিচারের দাবিতে সোচ্চার হয় সর্বস্তরের মানুষ। বিচারও হয়েছে দ্রুত। কিন্তু একটি প্রশ্নের উত্তর মেলেনি– এমন ঘটনা কি থেমে গেছে? 

সেই ঘটনার রেশ কাটতে না কাটতেই নরসিংদীর মাধবদীতে মাত্র তিন মাস বয়সী একটি শিশুর পা পারিবারিক সহিংসতার জেরে নৃশংসভাবে মুচড়ে দেওয়ার ভিডিও সামাজিক মাধ্যমে ছড়িয়ে পড়ে। অসহায় শিশুটির কান্না পুরো দেশকে নাড়া দেয়। আবার চলতি জুলাই মাসেই নড়াইলে পাঁচ বছরের এক শিশুকে ধর্ষণের পর শ্বাসরোধে হত্যার অভিযোগ ওঠে তারই এক আত্মীয়ের বিরুদ্ধে। তিনটি ঘটনার স্থান আলাদা, সময় আলাদা, অপরাধীর পরিচয়ও আলাদা। একটি জায়গায় বিষয়টি অভিন্ন–বাংলাদেশের শিশুরা ক্রমেই আরও অনিরাপদ হয়ে উঠছে। 

একটি সভ্য রাষ্ট্রের সবচেয়ে বড় পরিচয় তার অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি নয়; বরং সে তার শিশুদের কতটা নিরাপদ রাখতে পারে। মানবাধিকার সংগঠন আইন ও সালিশ কেন্দ্রের (আসক) ২০২৬ সালের জানুয়ারি থেকে জুন পর্যন্ত মানবাধিকার পর্যবেক্ষণে শিশু পরিস্থিতির উদ্বেগজনক একটি চিত্র তুলে ধরেছে। এই ছয় মাসে সহিংসতার শিকার হয়ে ১৯৫ জন শিশু নিহত হয়েছে। একই সময়ে ১৯২ জন শিশু ধর্ষণের শিকার এবং ১০৫ জন শিশু ধর্ষণচেষ্টার শিকার হয়েছে। এতগুলো হত্যাকাণ্ডের পরও শিশুর নিরাপত্তা নিয়ে বিশেষ কোনো উদ্যোগ দেখা যাচ্ছে না। আমরা প্রায়ই সংখ্যার হিসাব করি। সেই সংখ্যার ভেতরে লুকিয়ে থাকা কান্না, ভয়, ট্রমা এবং অপূরণীয় ক্ষতির হিসাব করি না। প্রতিটি সংখ্যার পেছনে রয়েছে একটি অসমাপ্ত শৈশব এবং রাষ্ট্রের কাছে জবাবদিহির এক অনিবার্য প্রশ্ন। 

বাংলাদেশ গত কয়েক দশকে শিশুস্বাস্থ্য, টিকাদান, প্রাথমিক শিক্ষায় অংশগ্রহণ এবং শিশুমৃত্যুর হার কমানোর ক্ষেত্রে উল্লেখযোগ্য সাফল্য অর্জন করেছে। আন্তর্জাতিক পরিমণ্ডলে এসব অর্জনের স্বীকৃতিও মিলেছে। শিশু যদি নিজের বাড়িতে, বিদ্যালয়ে কিংবা পরিচিত মানুষের কাছেই নিরাপদ না থাকে, তাহলে উন্নয়নের সেই অর্জন অসম্পূর্ণ থেকে যায়। শিশু অধিকার কেবল বেঁচে থাকার অধিকার নয়; নিরাপদ, মর্যাদাপূর্ণ এবং ভয়মুক্ত শৈশবের অধিকারও। সবচেয়ে উদ্বেগজনক বিষয় হলো, অধিকাংশ ক্ষেত্রেই অপরাধী কোনো অপরিচিত ব্যক্তি নয়। আত্মীয়, প্রতিবেশী, শিক্ষক, নিয়োগকর্তা কিংবা পরিবারের সদস্য; যাদের ওপর একটি শিশু সবচেয়ে বেশি আস্থা রাখে, অনেক ক্ষেত্রে তারাই হয়ে উঠছে নির্যাতনের উৎস। ফলে শিশু সুরক্ষার প্রশ্নটি এখন আর শুধু আইনশৃঙ্খলার বিষয় নয়; এটি পরিবার, সমাজ ও রাষ্ট্রের সম্মিলিত দায়িত্বের প্রশ্ন। 

এই সংকটের পেছনে বিচারহীনতার সংস্কৃতি একটি বড় কারণ বলে মনে হচ্ছে। অনেক ঘটনায় মামলা হলেও তদন্তে দীর্ঘসূত্রতা, সাক্ষ্যপ্রমাণ সংগ্রহে দুর্বলতা, ফরেনসিক সক্ষমতার সীমাবদ্ধতা এবং দীর্ঘ বিচারপ্রক্রিয়ার কারণে ভুক্তভোগী পরিবার ন্যায়বিচার পায় না। যদিও পল্লবীর ঘটনায় দ্রুত বিচার সম্পন্ন হয়েছে; তবুও অধিকাংশ মামলায় এমন গতি দেখা যায় না। বিচারের বিলম্ব অপরাধীদের মধ্যে শাস্তির ভয় কমিয়ে দেয় এবং সমাজে একটি বিপজ্জনক বার্তা ছড়িয়ে দেয়–অপরাধ করেও পার পাওয়া সম্ভব। 

তথ্যসূত্র :: আইন ও সালিশ কেন্দ্র

আরেকটি বড় সমস্যা সামাজিক নীরবতা। যৌন নির্যাতনের অনেক ঘটনা আজও প্রকাশ পায় না। সামাজিক লজ্জা, পারিবারিক চাপ, ভবিষ্যতের অনিশ্চয়তা কিংবা প্রভাবশালীদের ভয়ে অনেক পরিবার অভিযোগই করতে চায় না। কোথাও কোথাও আবার সালিশ বা আপসের মাধ্যমে ঘটনা ধামাচাপা দেওয়ার চেষ্টা হয়। এতে শুধু বিচারই ব্যাহত হয় না, ভবিষ্যতের আরও অপরাধের পথও প্রশস্ত হয়।

ডিজিটাল যুগ শিশুদের জন্য নতুন ঝুঁকিও তৈরি করেছে। অনলাইন গ্রুমিং, সাইবার বুলিং, ব্ল্যাকমেইল, যৌন শোষণ এবং ডিজিটাল হয়রানির মতো অপরাধ বাড়ছে। পরিবার, বিদ্যালয় এবং রাষ্ট্র–কেউই এখনও এই পরিবর্তিত বাস্তবতার সঙ্গে পুরোপুরি খাপ খাইয়ে নিতে পারেনি। শিশুর ডিজিটাল নিরাপত্তা শিক্ষা এখন সময়ের দাবি।  
একই সঙ্গে মনে রাখতে হবে, শিশু অধিকার লঙ্ঘন শুধু ধর্ষণ বা হত্যার মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয়। শিশুশ্রম, বাল্যবিবাহ, শিশু গৃহকর্মীদের নির্যাতন, বিদ্যালয়ে শারীরিক শাস্তি, প্রতিবন্ধী শিশুর প্রতি বৈষম্য, পথশিশুদের অবহেলা–এসব শিশুর নিরাপদ শৈশব কেড়ে নিচ্ছে। যে শিশু বইয়ের বদলে ইট বহন করে, খেলাধুলার বদলে শ্রমে বাধ্য হয় অথবা প্রতিদিন ভয়ের মধ্যে বড় হয়, তার শৈশবও সমানভাবে লুণ্ঠিত হয়।

বাংলাদেশে শিশু সুরক্ষার জন্য শিশু আইন ২০১৩, নারী ও শিশু নির্যাতন দমন আইন, জাতীয় শিশুনীতি এবং জাতিসংঘের শিশু অধিকার সনদ অনুযায়ী বিভিন্ন আইনি কাঠামো রয়েছে। কিন্তু আইন তখনই কার্যকর হয়, যখন তার বাস্তবায়ন নিশ্চিত হয়। প্রতিটি অভিযোগ গুরুত্বের সঙ্গে গ্রহণ, পেশাদারি তদন্ত, দ্রুত বিচার, ভুক্তভোগী শিশু ও পরিবারের জন্য মনোসামাজিক সহায়তা এবং পুনর্বাসন নিশ্চিত করা এখন সময়ের দাবি। 

একই সঙ্গে প্রতিটি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, মাদ্রাসা, এতিমখানা, আবাসিক প্রতিষ্ঠান এবং শিশুর উপস্থিতি রয়েছে–এমন সব প্রতিষ্ঠানে বাধ্যতামূলক শিশু সুরক্ষানীতি কার্যকর করতে হবে। শিক্ষক, অভিভাবক, পুলিশ, চিকিৎসক, সমাজকর্মী এবং স্থানীয় জনপ্রতিনিধিদের শিশু সুরক্ষা বিষয়ে প্রশিক্ষণ দিতে হবে। গণমাধ্যমকেও কেবল ঘটনার বর্ণনা নয়, তার কারণ, প্রতিরোধ এবং রাষ্ট্রের দায়বদ্ধতা নিয়ে ধারাবাহিক জনআলোচনা তৈরি করতে হবে। 

শিশুর নিরাপত্তা, মর্যাদা ও অধিকার নিশ্চিত করা কোনো অনুগ্রহ নয়–এটি রাষ্ট্রের সাংবিধানিক, আইনগত এবং নৈতিক দায়িত্ব। আমাদের চাওয়া, এমন এক গণতান্ত্রিক বাংলাদেশ, যেখানে কোনো শিশুকে ভয় নিয়ে ঘুমাতে যেতে হবে না, কোনো অভিভাবককে সন্তানের নিরাপত্তা নিয়ে আতঙ্কে থাকতে হবে না।

লেখক: মানবাধিকার কর্মী 

আরও পড়ুন

×