প্রকৃতির রঙে বোনা স্বপ্ন
২০১৬ সাল থেকে প্রাকৃতিক রং নিয়ে কাজ করছেন সাঈদা তানুউম সাথী
লাবণী মণ্ডল
প্রকাশ: ০২ আগস্ট ২০২৬ | ০৭:৩৪ | আপডেট: ০২ আগস্ট ২০২৬ | ১৬:৩১
| প্রিন্ট সংস্করণ
খাবারের প্লেটে লাল, কমলা বা গোলাপি রঙের মোহনীয় উপস্থিতি কার না ভালো লাগে! কিন্তু এই সৌন্দর্যের আড়ালে যদি লুকিয়ে থাকে নীরব ঘাতক রাসায়নিক, তবে তা হয়ে ওঠে শঙ্কার কারণ। এ শঙ্কা থেকেই এক যুগান্তকারী স্বপ্নের বীজ বুনেছেন খুলনার বাগমারার মেয়ে সাঈদা তানুউম সাথী। তাঁর স্বপ্ন–বাংলাদেশের খাদ্য ও পোশাকশিল্প হবে শতভাগ কেমিক্যালমুক্ত। এ লক্ষ্যেই ‘বায়োটিকস বাংলাদেশ’ নামের প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে তিনি কাজ করে যাচ্ছেন প্রাকৃতিক রং ও ফুড কালার উদ্ভাবনে।
সাঈদার জীবনের শুরুটা আর দশটা সাধারণ মেয়ের মতোই হতে পারত। একটি রক্ষণশীল মুসলিম পরিবারে জন্ম নেওয়া এই মানুষটিকে সপ্তম শ্রেণিতে পড়া অবস্থায় পারিবারিক সিদ্ধান্তে বিয়ের পিঁড়িতে বসতে হয়। বিয়ের এক বছরের মাথায় তিনি হয়ে যান সন্তানের মা। বাল্যবিবাহ, সংসার আর সন্তানের দায়িত্ব–আমাদের সমাজের প্রেক্ষাপটে এখানেই হয়তো একটি মেয়ের জীবনের গল্প শেষ হয়ে যায়। কিন্তু সাঈদা ছিলেন ব্যতিক্রম। বড় বোনের অনুপ্রেরণায় সংসারের শত ব্যস্ততার মাঝেই তিনি বাংলাদেশ উন্মুক্ত বিশ্ববিদ্যালয় থেকে এসএসসি সম্পন্ন করেন। এরপর এইচএসসি ও স্নাতক পেরিয়ে বর্তমানে তিনি মাস্টার্সে অধ্যয়নরত। তিন কন্যাসন্তানের জননী সাঈদার এই শিক্ষাজীবনও যেন হার না মানা এক সংগ্রামেরই গল্প।
বড় বোন তাঁকে শিখিয়েছিলেন–শিকড়ের সম্ভাবনাকে কাজে লাগিয়ে বিশ্বমানের চিন্তা করতে হবে। এই মন্ত্র বুকে ধারণ করেই ২০১৬ সালে সাঈদা শুরু করেন কৃষিপণ্য সংরক্ষণ ও প্রক্রিয়াজাতকরণের কাজ। পিঠা, জ্যাম-জেলি, আচার, আপেল সিডার ভিনেগার থেকে শুরু করে ভেষজ চা উৎপাদন শুরু করেন তিনি। কিন্তু বিপত্তি বাধে অন্য জায়গায়। ফুড প্রসেসিং করতে গিয়ে সাঈদাকে বাধ্য হয়েই কৃত্রিম খাদ্য রং ব্যবহার করতে হতো। একজন মা হিসেবে এ বিষয়টি তাঁর বিবেককে তীব্রভাবে দংশন করত। তিনি ভাবতেন, যে খাবার আমি আমার সন্তানকে দিতে ভয় পাচ্ছি, তা অন্যের হাতে তুলে দেব কীভাবে? প্রকৃতির এত ফল, ফুল, পাতা থাকতে সেখান থেকে কেন নিরাপদ রং তৈরি করা যাবে না? বিশ্বব্যাপী যখন অর্গানিক ও টেকসই পণ্যের প্রতি মানুষের ঝোঁক বাড়ছে, তখন সাঈদা সিদ্ধান্ত নিলেন তিনি প্রকৃতির কাছেই ফিরে যাবেন।
শুরু হলো তাঁর নতুন লড়াই। ড্রাগন ফলের ফেলে দেওয়া খোসা, বিটরুট, বেদানা, গাজর, ফালসা, লাল চা আর নানা ধরনের ফুল-পাতার নির্যাস থেকে তিনি তৈরি করতে শুরু করলেন প্রাকৃতিক খাদ্য রং। বিষয়টি তিনি লিখিতভাবে কৃষি বিপণন অধিদপ্তরের কাছে তুলে ধরেন। তাঁর এ উদ্ভাবনী চিন্তার কদরও মেলে। অধিদপ্তরের পার্টনার প্রকল্পের আওতায় এবং বিশুদ্ধ এগ্রো ইন্ডাস্ট্রিজ লিমিটেডের তত্ত্বাবধানে তিনি ন্যাচারাল ডাই, ইকো প্রিন্ট ও ন্যাচারাল ফুড কালার বিষয়ে দীর্ঘমেয়াদি প্রশিক্ষণ গ্রহণ করেন। এই প্রশিক্ষণ তাঁকে নিরাপদ পণ্য উৎপাদন, প্যাকেজিং, লেবেলিং ও ব্র্যান্ডিংয়ের আধুনিক কলাকৌশল শিখতে সাহায্য করে।
শুরুর দিকে পরিবারের সমর্থন পাননি সাঈদা। সমাজের ভ্রুকুটি তো ছিলই। বড় পরিসরের অর্ডারের কাজ নিজস্ব ছোট ব্লেন্ডারে গুঁড়া করে সামলাতে গিয়ে তাঁকে হিমশিম খেতে হয়েছে। আধুনিক যন্ত্রপাতির অভাব এখনও একটি বড় অন্তরায়। এ ছাড়া প্রাকৃতিক রংকে বাণিজ্যিকভাবে আরও টেকসই করতে কৃষি গবেষকদের ল্যাবরেটরি সাপোর্টও তাঁর খুবই প্রয়োজন।
তবে আশার কথা হলো, সাঈদা এখন আর একা নন। তিনি বলেন, ‘পরিবার শুরু থেকেই আমার পাশে ছিল না, বিশেষ করে সমাজ ও পরিবারের দৃষ্টিভঙ্গি বদলাতে সময় লেগেছে। তবে এখন আমার স্বামী নিজেও প্রতিষ্ঠানে কাজ করছেন, আমার মেয়েও যুক্ত হয়েছে। পরিবারের এ সমর্থনই এখন আমার সবচেয়ে বড় শক্তি।’ কৃষি বিপণন অধিদপ্তরের সহযোগিতায় তাঁর ব্যবসায়ের পরিধি ও মুনাফা বেড়েছে প্রায় ২৫ শতাংশ। ‘বিশুদ্ধ মাঠ’ আউটলেটের মাধ্যমে তাঁর পণ্য আজ দেশের বিভিন্ন জেলায় পৌঁছে যাচ্ছে।
সাঈদা তানুউমের স্বপ্ন কেবল নিজের ব্যবসায়ের প্রসারে সীমাবদ্ধ নয়। আয়ের একটি অংশ তিনি ব্যয় করেন সুবিধাবঞ্চিত শিশুদের শিক্ষায়। ভবিষ্যতে বিধবা ও একা নারীদের জন্য একটি নিরাপদ আবাসন ও দক্ষতা উন্নয়ন কেন্দ্র গড়ে তোলার স্বপ্ন দেখেন তিনি।
- বিষয় :
- লাবণী মণ্ডল
- নারী উদ্যোক্তা