ঢাকা বৃহস্পতিবার, ১৭ সেপ্টেম্বর ২০২৬

স ম সা ম য়ি ক

ঘরের ভেতরের অপরাধ ঘরের বিষয় নয়

ঘরের ভেতরের অপরাধ ঘরের বিষয় নয়
×

অলংকরণ: শাফায়েত সাগর

অ্যাডভোকেট সালমা আলী

প্রকাশ: ১৩ সেপ্টেম্বর ২০২৬ | ০৭:৩৬ | আপডেট: ১৩ সেপ্টেম্বর ২০২৬ | ১৭:০৭

| প্রিন্ট সংস্করণ

মানবাধিকার সংগঠন এইচআরএসএসের হিসাবে, ২০২৬ সালের প্রথম ছয় মাসে বাংলাদেশে পারিবারিক সহিংসতায় প্রাণ গেছে ৩২০ জন নারীর। অর্থাৎ প্রতিদিন প্রায় দুজন। এ মৃত্যুগুলোর বড় অংশ ঘটে দুপুরের রান্নাঘরে, উঠানের কোণে, টিনের বেড়ার আড়ালে। খবর হয় সামান্যই। যেটুকু হয়, তাও ‘পারিবারিক কলহের জেরে’–এমন কয়েকটা শব্দের নিচে চাপা পড়ে যায় বছরের পর বছরের মারধর, ভয়, খোঁটাসহ বিভিন্ন নির্যাতনের চাপ।

সমাজ বদলাচ্ছে, রীতিনীতি বদলাচ্ছে। একটা জায়গা কেবল বদলায়নি। ঘরের চার দেয়ালের ভেতরে যা ঘটে, তাকে আমরা আজও ‘পারিবারিক ব্যাপার’ বলে পাশ কাটিয়ে যাই। কলহ বলি, মান-অভিমান বলি; বলি সংসারের টানাপোড়েন। শুধু অপরাধটা বলি না। অথচ সংখ্যা অন্য কথা বলে। বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর ২০২৪ সালের নারী নির্যাতন জরিপ বলছে, দেশের ৭০ শতাংশ নারী জীবনে অন্তত একবার স্বামীর হাতে কোনো না কোনো সহিংসতার মুখে পড়েছেন। ৪১ শতাংশের বেলায় সেটি ঘটেছে জরিপের আগের ১২ মাসের ভেতরে। যারা এর শিকার, তাদের ৬৪ শতাংশ কথাটা কাউকে বলেননি। আইনের দরজা পর্যন্ত গেছেন মাত্র সাত শতাংশের কিছু বেশি। বরিশাল, খুলনার মতো জেলায় নিশ্চুপ থাকার হার ৮০ শতাংশ ছাড়িয়ে গেছে।

এ নীরবতাই আসল সংকট। কারণ যে ঘটনা কেউ জানে না, সে ঘটনার কোনো বিচার নেই। মেয়েটি চুপ থাকে সংসার ভাঙার ভয়ে, বাবার বাড়ির মুখ চেয়ে, সন্তানের কথা ভেবে। প্রতিটি নীরবতা পরের নির্যাতনটিকে আরেকটু সহজ করে দেয়। আবার অনেক সময় পারিবারিক বিষয়ে বাইরের কেউ ঢুকে পড়লে সমস্যা আরও বেড়ে যায়।

নির্যাতনের গোড়ায় বেশির ভাগ সময় বসে থাকে যৌতুক। একটা মোটরসাইকেল দেওয়ার কথা ছিল, দেওয়া হয়নি। নগদ টাকা, বিদেশ যাওয়ার টিকিট, ঘরের আসবাব। উঁচু তলায় দরকষাকষির অঙ্কটা আরও বড়, আরও ভয়ংকর। অথচ স্বামীর বাড়িতে যৌতুকের জন্য মারধরকে আমরা অপরাধ বলে গণ্য করি না। আগে আমাদের অনেকে যৌতুককে কিছুটা অপরাধ বলে মনে করতাম, এখন একেবারে করি না। মামলা হয় না; কারণ মামলা করলে সংসার ভেঙে যাবে।

নির্যাতন আবার উত্তরাধিকারের মতো এক প্রজন্ম থেকে আরেক প্রজন্মে যায়। যে ছেলেটি ছোটবেলায় বাবাকে মায়ের গায়ে হাত তুলতে দেখেছে, সে বড় হয়ে ধরে নেয়, এটাই স্বামীর স্বাভাবিক আচরণ। আবার যে শাশুড়ি নিজে একদিন নির্যাতিত হয়েছিলেন, তিনি পুত্রবধূকে চেপে রাখাকে নিজের ক্ষমতা বলে ভাবতে শেখেন। শিকলটা কেউ ভাঙে না, হাতবদল হয় কেবল।

আইন আছে। পারিবারিক সহিংসতা (প্রতিরোধ ও সুরক্ষা) আইন, ২০১০ একেবারে প্রতিরোধমূলক আইন। এর ভেতরে বলা আছে, ইউনিয়ন থেকে জেলা পর্যন্ত সুরক্ষা কর্মকর্তা থাকবেন। উপজেলার মহিলাবিষয়ক কর্মকর্তার দপ্তরে ভুক্তভোগী তাৎক্ষণিক সহায়তা পাবেন; একজন আইনজীবী পাবেন। অপরাধের মাত্রা অনুযায়ী কোনো কোনো ঘটনা আদালতে না গিয়ে স্থানীয়ভাবে মীমাংসা হবে। থাকবে ভিকটিমকেন্দ্রিক সহায়তা– তাঁকে মাঝখানে রেখে, একটা সুরক্ষাবলয়ের ভেতরে রেখে চিকিৎসা, কাউন্সেলিং, আইনি সহায়তা।

কাগজে সবই আছে। বাস্তবে দেখা যায়, লোকবল নেই, প্রশিক্ষণ নেই, কেউ কাউকে তদারক করছে না। ঢাকায় মেডিকেল কলেজের ভেতরে ওয়ান স্টপ ক্রাইসিস সেন্টার আছে। তেজগাঁওয়ে ভিকটিম সাপোর্ট সেন্টার আছে। গোটা দেশের জন্য দু-চারটা কেন্দ্র দিয়ে কী হয়?

তারপর শুরু হয় বিচারের পথের ভোগান্তি। থানায় গিয়ে মেয়েটি মন খুলে কথা বলতে পারে না। নারী পুলিশ না-ই থাকতে পারে। যিনি বসে আছেন তাঁর কথা ও শরীরী ভাষা এমন হওয়া চাই যাতে ভুক্তভোগী তাঁকে আপনজন ভাবতে পারেন। পুলিশের সংস্কার যতটা দরকার ছিল, ততটা হয়নি। বিচারকদের নিয়মিত প্রশিক্ষণ ও তদারকি দরকার। বার কাউন্সিলের দায়ও কম নয়–সংবেদনশীল মামলাগুলো কীভাবে সামলাতে হয়, সেটা শেখাতে হবে। বিচার দেরি হলে মেয়েটি দ্বিতীয়বার, তৃতীয়বার নির্যাতিত হয়। ঘরের ভেতরের অপরাধে সাক্ষ্যপ্রমাণ এমনিতেই কম; দেরি হলে সেটুকুও মিলিয়ে যায়।

তার মানে এই নয়, এক লাইনের কথা কাটাকাটিতে মামলা ঠুকে দিতে হবে। ছোটখাটো বিরোধের আগে দরকার তাৎক্ষণিক কাউন্সেলিং, দুই পরিবারের বসা, স্বামীকেও বুঝিয়ে বলা। সেই সেবা কোথায়, লোকবলই বা কোথায়? মনে রাখতে হবে, অকারণ মামলার অভিযোগ শেষ পর্যন্ত সত্যিকারের ভুক্তভোগীদের ক্ষতি করে–বিচারক ও সমাজ তখন সব অভিযোগকে সন্দেহের চোখে দেখতে শুরু করেন।

আমরা কিন্তু পারি। এসিড সন্ত্রাসের কথা মনে করুন। চিকিৎসক, শিক্ষক, সমাজকর্মী, তরুণ ছেলেমেয়ে–সবাই রাস্তায় নেমেছিল। আইন হলো, প্রয়োগ হলো, এসিড নিয়ন্ত্রণে এলো। নারী ও শিশুর সুরক্ষার প্রশ্নে তেমন করে কাউকে রাস্তায় নামতে দেখছি কি?

আমাদের দাবিটা তাই খুব সাধারণ। আইনের প্রয়োগ চাই আর ভুক্তভোগীর জন্য বিচারপ্রাপ্তির নিশ্চয়তা চাই। স্বরাষ্ট্র, সমাজকল্যাণ এবং মহিলা ও শিশুবিষয়ক মন্ত্রণালয় একসঙ্গে বসুক। ৯৯৯, ১০৯– হেল্পলাইনগুলো সত্যি কাজ করছে কিনা, ফোন করার পর সেবাটা সত্যি পৌঁছাচ্ছে কিনা, তা যাচাই হোক। সংবাদপত্র শুধু ঘটনা ছেপে দায় সারবে না; ঘটনার পাশে লিখবে, এখন রাষ্ট্রের করণীয় কী– এমনটাই প্রত্যাশা।

ঘরের ভেতরের নির্যাতন ব্যক্তিগত বিষয় নয়। এটি সামাজিক অপরাধ, সামাজিক সংকট। যেদিন আমরা সবাই মিলে কথাটা স্বীকার করব, সেদিন থেকে প্রতিরোধ শুরু। 

লেখক: মানবাধিকার আইনজীবী

আরও পড়ুন

×