গালে লিপস্টিকের দাগ ক্যামেরার দিকে বাড়ানো হাত
ভেনিস চলচ্চিত্র উৎসবে ইতালির অভিনেত্রী গ্রেটা স্কারানো ছবি :: এএফপি
শাহেরীন আরাফাত
প্রকাশ: ১৩ সেপ্টেম্বর ২০২৬ | ০৭:৩৯ | আপডেট: ১৩ সেপ্টেম্বর ২০২৬ | ১৬:৪৬
| প্রিন্ট সংস্করণ
লালগালিচা। দুই পাশে সারি সারি ক্যামেরা, ফ্ল্যাশের ঝলকানি। এমন জায়গায় মানুষ হাসিমুখে আসে কিন্তু ছবির নারীটি হাসছেন না। চুল পেছনে টেনে বাঁধা, কপাল খোলা। পরনে গাঢ় লাল পোশাক। বাম গালে লিপস্টিকের মোটা একটা টান। চোখের নিচ থেকে নেমে এসেছে, দেখে মনে হয় তাজা ক্ষত। যেন কেউ এইমাত্র আঘাত করে গেছে আর দাগটা বসে গেছে চামড়ায়। ডান হাত সোজা ক্যামেরার দিকে বাড়ানো, পাঁচ আঙুল খোলা, তালু সামনে। হাতটা কিছু চাইছে না। ঠেকাচ্ছে। আঙুলের ফাঁক দিয়ে দুটি চোখ সোজা তাকিয়ে আছে, একটুও না কেঁপে।
তিনি ইতালির অভিনেত্রী গ্রেটা স্কারানো। জায়গাটা ভেনিসের লিডো; দিনটা ৬ সেপ্টেম্বর ২০২৬ (রোববার)। ৮৩তম ভেনিস আন্তর্জাতিক চলচ্চিত্র উৎসবে প্রতিযোগিতা বিভাগের ছবি ‘দি একো চেম্বার’-এর প্রদর্শনীর আগে তিনি গালিচায় ওঠেন। আলোকচিত্রীদের সামনে ঠোঁটের লিপস্টিক গালে টেনে দেন। তারপর হাত বাড়ান। মুখে কিছু বলেননি, বলার দরকারও হয়নি। ইতালিতে ওই বাড়ানো হাতের মানে একটাই–থাম। এবারের উৎসবে স্কারানো শুধু অতিথি নন। নিকোলাস মাউপাসের সঙ্গে তিনি উদ্বোধনী ও সমাপনী অনুষ্ঠানের সঞ্চালক। এমন দায়িত্ব পেলে বেশির ভাগ মানুষ মেপে কথা বলেন। তিনি বলেননি। উৎসব শুরুর আগে জানিয়ে রেখেছিলেন, তিনি সব সময় পক্ষ নিয়েছেন। প্রকাশ্যে বলতে ভয় পাননি আর এ দায়িত্ব পেয়েও কিছু বদলায়নি। কয়েকদিন আগে আরেক অনুষ্ঠানে তাঁর হাতে ছিল তরমুজের ফালি আঁকা একটা হাতপাখা–ফিলিস্তিনের প্রতিরোধের রং।
তবে সেদিনের ওই লিপস্টিকের দাগ আঁকা হয়েছিল খুব কাছের একটা শোক থেকে। এর তিন দিন আগে, ৩ সেপ্টেম্বর ফ্লোরেন্সের কাছে এ-১ মহাসড়কের একটি উড়ালসেতু থেকে ফেলে দেওয়া হয় লোরেনা ইসেরিকে। বয়স ৪৫ বছর। সাবেক সঙ্গী তাঁকে বাড়ির গ্যারেজ থেকে অপহরণ করেন। গাড়ির পেছনের ডালায় তুলে নিয়ে যান। মৃত্যুর ঠিক আগে লোরেনা জরুরি নম্বরে ফোন করতে পেরেছিলেন। সাহায্য পৌঁছায়নি। লোকটি এরপর নিজেও সেতু থেকে ঝাঁপ দেন। ইতালির পত্রিকাগুলো তখন থেকে খবরটা প্রকাশ করে যাচ্ছে আর পুরোনো প্রশ্নটাই আবার সামনে আসছে–আগে কি কিছুই চোখে পড়েনি?
ইতালির স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের হিসাবে, ২০২৬ সালের প্রথম ছয় মাসে দেশটিতে খুন হয়েছেন ৩৪ জন নারী। এর মধ্যে ২৭ জনই মারা গেছেন পরিবার বা প্রেমের সম্পর্কের জেরে। ১৯ জনকে মেরেছেন সঙ্গী কিংবা সাবেক সঙ্গী। ২০২৫ সালের ডিসেম্বরে ইতালি আইন করে ‘নারী হত্যা’কে আলাদা অপরাধের স্বীকৃতি দিয়েছে। নতুন সেই ধারায় ছয় মাসে মামলা হয়েছে মাত্র আটটি, অর্থাৎ চারজনে একজনেরও কম। বাকিগুলো আগের মতো সাধারণ খুন। আইন এসেছে, নাম বদলেছে; লাশের সারি বদলায়নি।
যে ছবির প্রদর্শনীতে দাঁড়িয়ে গ্রেটা স্কারানো প্রতিবাদ জানালেন, সেই ‘দি একো চেম্বার’-এর গল্পও ঠিক এই জিনিস নিয়ে। বার্নার্দো বার্তোলুচ্চির লেখা শেষ চিত্রনাট্য, তাঁর মৃত্যুর আট বছর পর পর্দায় এনেছেন আন্দ্রেয়া পাল্লাওরো। এক ঘরের ভেতরে দুজন মানুষের প্রেম, যেখানে যত্ন কখন নিয়ন্ত্রণ হয়ে যায়, ভালোবাসা কখন দখল হয়ে যায়, টেরই পাওয়া যায় না। পর্দার ভেতরে যা গল্প, গালিচার বাইরে তা-ই খবর।
প্রতীকটাও ভেবেচিন্তে বেছে নেওয়া। লিপস্টিক নারীর সাজের জিনিস, তাঁকে সুন্দর দেখানোর জিনিস। সেই সাজের জিনিস দিয়ে তিনি নিজের মুখে ক্ষত এঁকেছেন। যে রঙে তাঁকে ছবির মতো লাগার কথা, সেই রং দিয়ে দেখিয়ে দিলেন সুন্দরের আড়ালে কী ঘটে।
সমস্যাটা কেবল ইতালির নয়। জাতিসংঘের মাদক ও অপরাধবিষয়ক দপ্তর এবং ইউএন উইমেনের যৌথ হিসাব বলছে, ২০২৪ সালে দুনিয়াজুড়ে খুন হয়েছেন ৮৩ হাজার নারী ও মেয়ে। তাদের ৬০ শতাংশ অর্থাৎ প্রায় ৫০ হাজার জন মারা গেছেন সঙ্গী বা পরিবারের কারও হাতে। দিনে গড়ে ১৩৭ জন। প্রতি ১০ মিনিটে একজন। পুরুষের বেলায় এই হার ১১ শতাংশ। তার মানে দুনিয়ার সবচেয়ে বিপজ্জনক যুদ্ধক্ষেত্রের নাম–ঘর।
ছবিটা জরুরি। কারণ দেখতে সুন্দর হলেও ছবিটা স্বস্তির নয়। যে মানুষটি ক্যামেরার সামনে দাঁড়িয়ে নিজের সাজ নষ্ট করলেন, তিনি জানতেন– নামডাক জমিয়ে রাখার জিনিস নয়, খরচ করার জিনিস। কেউ লালগালিচা থেকে নিয়ে যান চুক্তি, প্রচ্ছদ, হাততালি। কেউ কেউ বরং কিছু রেখে যান। এই ছবির সবচেয়ে তাৎপর্যপূর্ণ জিনিসটা কিন্তু গালের দাগ নয়। ওই বাড়ানো হাতটা। খোলা তালু, পাঁচ আঙুল। যে হাত মেরে ফেলার আগেই ঠেকাতে চায়। যে হাত বলে, এই পর্যন্তই–এবার থাম।