ঢাকা বৃহস্পতিবার, ১৭ সেপ্টেম্বর ২০২৬

নারী উদ্যোক্তা

বগুড়ার আচারওয়ালির জয়যাত্রা

বগুড়ার আচারওয়ালির জয়যাত্রা
×

আফসানা নিরা

এস এম কাওসার

প্রকাশ: ১৩ সেপ্টেম্বর ২০২৬ | ০৭:৩৮ | আপডেট: ১৩ সেপ্টেম্বর ২০২৬ | ১৭:০৩

| প্রিন্ট সংস্করণ

‘ওই দেখ আচারওয়ালি যাচ্ছে!’ বগুড়া শহরের সেউজগাড়ী ও সবুজবাগ এলাকার অলিগলিতে হেঁটে যাওয়ার সময় একসময় এ কথাটি শুনে মুখ নিচু করতে হতো মেয়েটিকে। পাড়া-প্রতিবেশী আর পরিচিতজনদের তির্যক টিপ্পনি কিংবা তাচ্ছিল্যের হাসি ছিল নিত্যদিনের সঙ্গী। সময় ও আত্মপ্রত্যয় কীভাবে পাশা উল্টে দিতে পারে, তার এক জীবন্ত রূপকথা গড়লেন বগুড়ার মেয়ে আফসানা নিরা। যে মানুষগুলো একদিন তাঁকে নিয়ে উপহাস করেছিলেন, আজ সে হাতগুলো জীবিকার তাগিদে কাজ করছেন নিরার আচার কারখানায়। নিরার হাতে তৈরি এক বয়াম আচার আজ কেবল দেশেই সীমাবদ্ধ নেই; সমুদ্র পেরিয়ে পৌঁছে যাচ্ছে ইংল্যান্ড, পোল্যান্ড কিংবা সৌদি আরবের বাঙালি পরিবারগুলোর খাবার টেবিলে।

নিরার আজকের অর্জনের পেছনের গল্পটি মোটেই সহজ ছিল না; বরং তা ছিল এক বন্ধুর, দীর্ঘ পথ। নিরা যখন অবুঝ শিশু, তখন তাঁর বাবা দ্বিতীয় বিয়ে করেন। নিরার মাও সেই সম্পর্ক ছিন্ন করে অন্যত্র বিয়ে করেন।

বাবার সংসারে নিরার শৈশব-কৈশোর কাটতে থাকে অনাদর আর অবহেলায় কিন্তু প্রতিকূল স্রোতের সামনে মাথা নোয়ানোর মানুষ ছিলেন না নিরা। নিজের অদম্য চেষ্টায় পড়াশোনা চালিয়ে যান এবং সফলতার সঙ্গে ডিগ্রি পাস করেন। ২০১৪ সালে বিয়ে করেন সিহাবুর রহমানকে। তিনি তখন একটা বেসরকারি প্রতিষ্ঠানে কর্মরত ছিলেন। বর্তমানে তাদের ঘরে রয়েছে আট বছর বয়সী এক কন্যাসন্তান।

পড়াশোনা শেষ করে নিরা বাংলাদেশ ব্যাংকের একটি উন্নয়ন প্রকল্পে চাকরি শুরু করেন। ২০১৬ সালে প্রকল্পটি বন্ধ হয়ে গেলে হঠাৎ চাকরি হারান তিনি। পরে ২০২০ সালে করোনাভাইরাস মহামারির সময় স্বামী সিহাবও চাকরি হারান। পরিবারে নেমে আসে ঘোর অনিশ্চয়তা। এই মহামারি ও বেকারত্বের অন্ধকারে নিরা খুঁজে পান আলো জ্বালানোর নতুন পথ।

২০১৮ সালে একদম ঘরোয়া আমেজে পরীক্ষামূলক ‘গরুর মাংসের আচার’ তৈরির মাধ্যমে উদ্যোক্তা হিসেবে নাম লেখান নিরা। শুরুতে হাতেগোনা কয়েকটি বয়াম নিয়ে দোকানে দোকানে ঘুরে বিক্রি করতেন। প্রাতিষ্ঠানিক জ্ঞান অর্জনের জন্য তিনি যুব উন্নয়ন অধিদপ্তর থেকে প্রশিক্ষণ গ্রহণ করেন। প্রশিক্ষণ শেষে পণ্যের তালিকায় যোগ করেন জলপাই, বড়ই, তেঁতুল ও চালতার আচার।

গুণগত মান বজায় রাখার নিরলস প্রচেষ্টার পর ২০২২ সালে বিএসটিআই থেকে সরকারি অনুমোদন পায় তাঁর প্রতিষ্ঠান। নাম দেন ‘আচারি ফুড প্রোডাক্ট লিমিটেড’। চাহিদাও বাড়ে জ্যামিতিক হারে। ঘরের ছোট আঙিনা পেরিয়ে বাড়ির পাশে গড়ে তোলেন একটি আধুনিক কারখানা। যে কারখানায় এখন কাজ করছেন নারী-পুরুষ মিলে ১৫ জন কর্মী; যাদের মাসিক বেতন ১০ হাজার থেকে ১৫ হাজার টাকা।

আচারি ফুড কারখানার পেছনের গল্পে লুকিয়ে আছে এক অদ্ভুত মানসিক পরিবর্তনের উপাখ্যান। কারখানায় কর্মরত শামীমা আক্তার অকপটে স্বীকার করেন, ‘একদিন যে নিরাকে দেখে আমরা ঠাট্টা-বিদ্রূপ করতাম, আজ তাঁর প্রতিষ্ঠানে কাজ করেই আমার সংসার চলছে।’ শামীমার মতো রুবি খাতুন কিংবা মরিয়ম বেগমদের কাছে নিরা এখন আর ঠাট্টার কেউ নন; বরং আশ্রয়স্থল। নীরব কাজের মাধ্যমে এমন মানবিক জবাব দেওয়ার নজির সমাজে বিরল। বর্তমানে নিরার কারখানায় প্রতি মাসে গড়ে উৎপাদিত হয় প্রায় দুই হাজার কেজি আচার। এর মধ্যে সবচেয়ে জনপ্রিয় ‘গরুর মাংসের আচার’ খুচরা বিক্রি হয় প্রতি কেজি দেড় হাজার টাকায়। অন্যান্য ফলের আচার কেজিপ্রতি ৭০০ টাকা এবং বিশেষ কম্বো প্যাক বিক্রি হয় ৯৯০ টাকায়।

০নিজস্ব ব্র্যান্ডিং ছাড়াও দেশের একাধিক নামিদামি করপোরেট প্রতিষ্ঠানে বড় অর্ডারের আচার সরবরাহ করেন নিরা। প্রবাসীদের হাত ধরে তাঁর এ আচার এখন নিয়মিত র০প্তানি হচ্ছে ইংল্যান্ড, পোল্যান্ড ও সৌদি আরবে। বিশেষ করে রমজান বা উৎসবের সময় এর চাহিদা দ্বিগুণ হয়ে যায়।

সাফল্যের স্বীকৃতিস্বরূপ ২০২৪ সালে নিরা জেলা পর্যায়ে ‘সেরা জয়িতা উদ্যোক্তা’ নির্বাচিত হন। একই বছর তিনি বিভাগীয় পর্যায়ে অর্জন করেন ‘অনন্য নারী সম্মাননা’। এছাড়া যুব উন্নয়ন অধিদপ্তর থেকে ‘সফল আত্মকর্মী অ্যাওয়ার্ড’, প্রাণিসম্পদ অধিদপ্তর এবং গ্রাম উন্নয়ন কর্ম (গাক) থেকে পেয়েছেন সম্মাননা পুরস্কার।

বগুড়া যুব উন্নয়ন অধিদপ্তরের উপপরিচালক মো. সাহাবুদ্দীন সরদার বলেন, ‘আফসানা নিরা বগুড়ার নারী উদ্যোক্তাদের জন্য এক উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত। সততা আর কঠোর পরিশ্রম থাকলে শূন্য থেকে যে নিজের ভাগ্য পরিবর্তন করা যায়, নিরা তা প্রমাণ করে দেখিয়েছেন।’

নিজের পথচলা নিয়ে আফসানা নিরা বলেন, ‘আমার পথচলা কখনোই সহজ ছিল না। জীবনের মোড়ে অনেকবার আছাড় খেয়ে পড়েছি, কিন্তু প্রতিবার আবার নতুন শক্তিতে উঠে দাঁড়িয়েছি। আমার বিশ্বাস ছিল, সততা আর ধৈর্য থাকলে একদিন আমি লক্ষ্যে পৌঁছাবই।’

সফল নারী উদ্যোক্তা আফসানা নিরার এই ঘুরে দাঁড়ানোর গল্প কেবল স্বাবলম্বী হওয়ার কাহিনি নয়, এটি সমাজের দৃষ্টিভঙ্গি বদলে দেওয়ার এক জীবন্ত প্রেরণা। 

আরও পড়ুন

×