ঢাকা বৃহস্পতিবার, ১৭ সেপ্টেম্বর ২০২৬

পারিবারিক সহিংসতার শেষ কোথায়?

পারিবারিক সহিংসতার শেষ কোথায়?
×

শিল্পকর্ম:: নাজলী লায়লা মনসুর

রেজওয়ানা করিম স্নিগ্ধা

প্রকাশ: ১৩ সেপ্টেম্বর ২০২৬ | ০৭:৪১ | আপডেট: ১৩ সেপ্টেম্বর ২০২৬ | ১৭:১০

| প্রিন্ট সংস্করণ

ঢাকায় সম্প্রতি একজন নারী স্বামীর হাতে নির্মমভাবে নিহত হওয়ার অভিযোগ সামনে এসেছে। এমন মৃত্যু আমাদের ক্ষুব্ধ করে। কারণ মৃতদেহ সহিংসতাকে দৃশ্যমান করে। আঘাত ও মৃত্যু দেখলে অপরাধ চিনতে আমাদের অসুবিধা হয় না। কঠিন হলো তার আগের ঘটনাগুলোকে চেনা; যখন একজন নারী বেঁচে আছেন, কিন্তু তাঁর জীবন ধীরে ধীরে অন্য একজনের সিদ্ধান্তের অধীন হয়ে যাচ্ছে। লিখেছেন রেজওয়ানা করিম স্নিগ্ধা
-----------------------------------------

সহিংসতা সব সময় আঘাত দিয়ে শুরু হয় না। তার শুরু হতে পারে একটি নিষেধে, সন্দেহে, ফোন দেখার দাবিতে, বন্ধুত্বে আপত্তিতে, পোশাক নির্ধারণে, বাইরে যাওয়ার অনুমতিতে, অর্থ নিয়ন্ত্রণে কিংবা একটি ‘না’কে অগ্রাহ্য করায়। বিচ্ছিন্নভাবে ঘটনাগুলো ছোট মনে হতে পারে; ধারাবাহিকভাবে ঘটলে এগুলো একটি মানুষের নিজের জীবন সম্পর্কে সিদ্ধান্ত নেওয়ার পরিসর সংকুচিত করে। সহিংসতার আগে আসে নিয়ন্ত্রণ, নিয়ন্ত্রণের আগে অধিকারবোধ আর অধিকারবোধের পেছনে থাকে তাঁকে স্বাভাবিক মনে করার সামাজিক শিক্ষা।

বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরো ও জাতিসংঘ জনসংখ্যা তহবিলের ২০২৪ সালের নারী নির্যাতনবিষয়ক জাতীয় জরিপে বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটভিত্তিক বিস্তৃত সূচক অনুযায়ী, বিবাহিত বা আগে বিবাহিত নারীদের প্রায় ৭৬ শতাংশ জীবনের কোনো না কোনো সময়ে স্বামী বা সঙ্গীর কাছ থেকে কোনো না কোনো ধরনের সহিংসতার অভিজ্ঞতার কথা জানিয়েছেন। প্রায় ৬৮ শতাংশ জানিয়েছেন নিয়ন্ত্রণমূলক আচরণের অভিজ্ঞতা।

সমাজবিজ্ঞানী ইভান স্টার্ক এই ক্ষমতার ধরনকে ‘জবরদস্তিমূলক নিয়ন্ত্রণ’ হিসেবে ব্যাখ্যা করেছেন। এর কেন্দ্রে রয়েছে অন্য একজন মানুষের নিজের মতো জীবনযাপনের পরিসর সংকুচিত করা। কোথায় যাবেন, কার সঙ্গে সম্পর্ক রাখবেন, নিজের অর্থ কীভাবে ব্যয় করবেন কিংবা নিজের শরীর সম্পর্কে কী সিদ্ধান্ত নেবেন– এসব যখন ধারাবাহিকভাবে অন্য কারও অনুমতির বিষয় হয়ে ওঠে, তখন মানুষটি সংসারে উপস্থিত থাকলেও নিজের জীবনের পূর্ণ কর্তৃত্ব আর তাঁর হাতে থাকে না।

ভালোবাসা, নিয়ন্ত্রণ, কর্তৃত্বের প্রশ্ন
নিয়ন্ত্রণকে শনাক্ত করা কঠিন হওয়ার একটি কারণ হলো, এটি প্রায়ই নিষ্ঠুরতার ভাষায় আসে না। ‘তোমাকে নিয়ে চিন্তা করি’, ‘সময় ভালো নয়’, ‘আমাদের পরিবারের মেয়েরা এমন করে না’, ‘আমি তোমার স্বামী, জানার অধিকার আমার আছে’–এসব বাক্যে ভালোবাসা, নিরাপত্তা, সম্মান ও দাম্পত্যের ভাষা আছে। একটি সহজ প্রশ্ন দিয়ে পার্থক্য বোঝা যায়–সিদ্ধান্তটি শেষ পর্যন্ত কে নিচ্ছেন? যত্ন অন্য মানুষের মঙ্গল চায় তাঁর স্বাধীনতা অক্ষুণ্ন রেখে; নিয়ন্ত্রণ মঙ্গলের যুক্তি দেখিয়ে তাঁর হয়ে সিদ্ধান্ত নেয়। এই কর্তৃত্বের ধারণা শূন্য থেকে তৈরি হয় না। যে সমাজ নারীর পোশাক, প্রেম, যৌনতা, চলাচল, বিয়ে কিংবা জনপরিসরে উপস্থিতি নিয়ে নিয়মিত নৈতিক পাহারা দেয়, সেখানে একটি ধারণা সহজে স্বাভাবিক হয়ে ওঠে–নারীর স্বাধীনতা আছে। তবে তাঁর সীমা অন্য কেউ নির্ধারণ করতে পারে।

সেই ‘অন্য’ কখনও পরিবার, কখনও স্বামী, কখনও সমাজ, কখনও ধর্মের নির্বাচিত ব্যাখ্যা, কখনও জনতার নৈতিকতা, কখনও রাজনৈতিক বক্তব্য। এখানে রাজনৈতিক বলতে শুধু দলীয় রাজনীতি নয়; কে কার আচরণের সীমা নির্ধারণ করবে, সেটিও ক্ষমতার রাজনীতি। ব্যক্তি বদলায়, কিন্তু নারীর ওপর অভিভাবকত্বের ধারণাটি থেকে যেতে পারে। সমাজ কাউকে সরাসরি বলে না, ‘স্ত্রীকে মার’ কিন্তু সমাজ যদি বলে, ‘স্ত্রীকে সামলানো তোমার দায়িত্ব’, তাহলে ‘সামলানোর অধিকার’টি কোথা থেকে এলো– সেই প্রশ্ন তোলা জরুরি। এতে অপরাধীর ব্যক্তিগত দায় কমে না। অপরাধের দায় ব্যক্তিরই; সামাজিক বিশ্লেষণ শুধু দেখায়, কর্তৃত্বের পক্ষে ব্যবহৃত কিছু যুক্তি ব্যক্তির বাইরেও তৈরি হতে পারে।

সহিংসতার সামাজিক সহনসীমা
সন্দেহকে ভালোবাসা, ফোন দেখাকে দাম্পত্যের অধিকার, চলাফেরায় বাধাকে নিরাপত্তা, অপমানকে ‘স্বামী-স্ত্রীর ব্যাপার’ এবং কখনও গায়ে হাত তোলাকেও ‘রাগের মাথায় হয়ে গেছে’ বলে ছোট করার প্রবণতা পুরুষতান্ত্রিক কর্তৃত্বকে সহনশীলতার ভাষা দান করে। যেন একটি অঘোষিত সীমারেখা কাজ করে–কিছু আচরণ ‘সংসারের ব্যাপার’, তার পরে নির্যাতন, আরও পরে অপরাধ। অর্থাৎ সমস্যাটি শুধু কোন কাজটি বেআইনি তা নয়; কোন পর্যায় পর্যন্ত ক্ষমতার অপব্যবহারকে আমরা স্বাভাবিক বলে সহ্য করি, সেটিও গুরুত্বপূর্ণ।

ভালোবাসায় ‘আমার’, মালিকানায় ‘আমার’
পুরুষত্ব নিয়েও তাই কথা বলা প্রয়োজন; তবে ‘পুরুষ মানেই সহিংস’–এই সরলীকরণ দিয়ে নয়। সমাজ যদি পুরুষত্বকে কর্তৃত্ব, পরিবারের নিয়ন্ত্রণ এবং নারীর আনুগত্যের সঙ্গে যুক্ত করে, তাহলে ‘নিজের স্ত্রীকে সামলাতে পারে না?’– এমন একটি সাধারণ বাক্যও ক্ষমতার গভীর ধারণা বহন করতে পারে। 

‘সে আমার স্ত্রী, অন্য কারও সঙ্গে কথা বলবে কেন?’–এখানে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ শব্দটি ‘অন্য’ নয়, ‘আমার’। ভালোবাসায় ‘আমার’ সম্পর্কের ভাষা; মালিকানায় ‘আমার’ অধিকারের ভাষা। প্রথমটি বলে, তুমি আমার জীবনের মানুষ। দ্বিতীয়টি বলে, তোমার জীবনের ওপরও আমার অধিকার আছে।

‘সে চলে গেল না কেন?’
নির্যাতনের ইতিহাস সামনে এলে এ প্রশ্নটি প্রায়ই করা হয়। অথচ সম্পর্ক ছেড়ে বেরিয়ে যাওয়া শুধু ব্যক্তিগত সাহসের সিদ্ধান্ত নয়। সন্তান, অর্থনৈতিক নির্ভরতা, আশ্রয়ের অভাব, বিবাহ বিচ্ছেদের ‘সামাজিক কলঙ্ক’, পরিবারের চাপ, আইনি জটিলতা এবং প্রতিশোধের ভয়–সবকিছু মিলিয়ে দৃশ্যমান একটি দরজাও বাস্তবে বন্ধ থাকতে পারে। তাই ‘সে কেন যায়নি?’ প্রশ্নটির চেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হলো–‘তাঁর যাওয়ার মতো নিরাপদ জায়গা ছিল কি?’ 

শরীরটি কার?
নিয়ন্ত্রণের সবচেয়ে মৌলিক প্রশ্নটি শেষ পর্যন্ত শরীরে এসে দাঁড়ায়। বিয়ের পর একজন নারীর শরীরের ওপর চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত কার? স্ত্রী ‘না’ বললে সেই ‘না’ কতটা পূর্ণ? বিয়ে কি একবারের সম্মতিকে স্থায়ী অনুমতিতে পরিণত করে? 

নারীর শরীরকে আমরা প্রায়ই তাঁর ব্যক্তিসত্তার আগে পরিবারের সম্মান, দাম্পত্য, মাতৃত্ব কিংবা সন্তান জন্মদানের সঙ্গে যুক্ত করে দেখি। অথচ মূল সত্যটি খুব সাধারণ–শরীরটি তাঁর। বিয়ে মালিকানা নয়, ঘনিষ্ঠতা অধিকার নয়, সম্মতিও স্থায়ী দলিল নয়। ভালোবাসার সম্পর্ক একজন মানুষকে আরেকজন মানুষের শরীরের ওপর স্থায়ী কর্তৃত্ব দেয় না।

একটি মৃত্যুরও ইতিহাস থাকে
স্বামী বা ঘনিষ্ঠ সঙ্গীর হাতে কোনো নারী নিহত হলে তাই শুধু শেষ রাতটির দিকে তাকালে পুরো ঘটনাটি বোঝা যায় না। তার আগে ভয়, হুমকি, বিচ্ছিন্নতা, অর্থনৈতিক নিয়ন্ত্রণ, আগের আঘাত কিংবা সম্পর্ক ছাড়ার চেষ্টা ছিল কিনা–এসবও অনুসন্ধানের বিষয়। সব হত্যার ইতিহাস এক নয় এবং সব নিয়ন্ত্রণমূলক সম্পর্ক হত্যায় শেষ হয় না। তবু আগের ক্ষমতার সম্পর্কগুলো না দেখলে আমরা মৃত্যুর কারণের একটি গুরুত্বপূর্ণ সামাজিক স্তর হারিয়ে ফেলি। কখনও হত্যা সহিংসতার প্রথম বাক্য; কখনও সেটি দীর্ঘ একটি বাক্যের শেষ পূর্ণচ্ছেদ।

শেষ প্রশ্নটি স্বাধীনতার
বিষয়টি শুধু ঘরের সহিংসতা নয়। মূল প্রশ্ন হলো–একজন নারীর ওপর অন্য মানুষের কতখানি কর্তৃত্বকে আমরা বৈধ বলে মনে করি। পরিবার, সামাজিক নৈতিকতা, পুরুষত্বের ধারণা, অর্থনৈতিক নির্ভরতা এবং প্রাতিষ্ঠানিক নীরবতা– সবকিছু মিলিয়ে যদি একজন নারীর স্বাধীনতা অন্যের অনুমতির ওপর নির্ভরশীল হয়ে পড়ে, তাহলে সেটি পূর্ণ স্বাধীনতা নয়; সেটি অনুমোদিত স্বাধীনতা।

ঢাকার সাম্প্রতিক মৃত্যুর ঘটনাটি শেষ পর্যন্ত আদালতে প্রমাণ, দায় ও শাস্তির প্রশ্নে বিচার হবে। কিন্তু সমাজের সামনে প্রশ্নটি আরও বিস্তৃত। তাঁর মৃত্যুর পরে বিচার চাওয়ার আগে তাঁর জীবিত অবস্থায় বলা ‘না’কে কি আমরা পূর্ণ একটি বাক্য হিসেবে গ্রহণ করি? 

লেখক: অধ্যাপক, নৃবিজ্ঞান বিভাগ, জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়

আরও পড়ুন

×