ঢাকা রোববার, ০১ নভেম্বর ২০২৬

মাদ্রাসায় যৌন নিপীড়ন

লজ্জা শিশুর নয় জবাব দিক প্রতিষ্ঠান

লজ্জা শিশুর নয় জবাব দিক প্রতিষ্ঠান
×
×

আবু আহমেদ ফয়জুল কবির, মানবাধিকারকর্মী

আবু আহমেদ ফয়জুল কবির

প্রকাশ: ০১ নভেম্বর ২০২৬ | ০৭:৫০

| প্রিন্ট সংস্করণ

শৈশবে যৌন নির্যাতনের ক্ষত শরীরে যতটা থাকে, মনে থাকে তার চেয়ে ঢের গভীরে। নিরাপত্তাবোধ ভাঙে, আত্মমর্যাদা চুরমার হয়, বড়দের ওপর বিশ্বাস আর ফেরে না। সেই ঘা অনেককে বয়ে বেড়াতে হয় সারাজীবন। ঘটনাটা যদি ঘটে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে, যেখানে শিশুর জ্ঞান আর নীতিবোধ গড়ে ওঠার কথা, তখন আঘাত শুধু একটি শিশুর গায়ে লাগে না। ভেঙে পড়ে প্রতিষ্ঠানের ওপর রাখা আস্থাও।
সংখ্যাই বলে দেয় ভাঙনের মাপ। জাস্টিসমেকার্স বাংলাদেশ ইন ফ্রান্স (জেএমবিএফ) সংবাদমাধ্যমের খবর ঘেঁটে দেখিয়েছে, চলতি বছরের জানুয়ারি থেকে ২৪ অক্টোবর পর্যন্ত অন্তত ২৩৫টি ছেলেশিশু যৌন নির্যাতনের শিকার হয়েছে। এর ১৫৩ জন মাদ্রাসার, ৬৩ জন স্কুলের শিক্ষার্থী। প্রাণ গেছে ৯টি শিশুর। মামলা বা জিডি হয়েছে ১৪৮টি ঘটনায়, অথচ একটিতেও এখনও অভিযোগপত্র বা সাজার খবর মেলেনি। এটা কেবল খবরে আসা ঘটনার হিসাব। সংগঠনটির ধারণা, প্রকৃত সংখ্যা এর কয়েক গুণ। কন্যাশিশুর ওপর নিপীড়নের চিত্রও কম ভয়াবহ নয়। নির্যাতন কোনো একটি লিঙ্গ বা প্রতিষ্ঠানের সমস্যা নয়। তবে ছেলেশিশুর বেলায় লজ্জা আর ‘ছেলেদের কাঁদতে নেই’ জাতীয় ধারণা মুখ খোলার পথ আরও সরু করে দেয়।

বেশির ভাগ ঘটনা সামনে আসে দেরিতে। শিশু দিনের পর দিন সয়ে যায়। অসুস্থ হয়ে পড়লে বা ভেঙে পড়লে তবে পরিবার টের পায়। একটি শিশুকে কেন এতটা একা হয়ে যেতে হবে? কেন সে নির্ভয়ে কারও কাছে হাত বাড়াতে পারবে না? ভয়, লজ্জা, অভিযুক্তের দাপট, শাস্তির আশঙ্কা আর অভিযোগ করলে কী হবে সেই অনিশ্চয়তা তার মুখ বন্ধ রাখে।
এখানেই কর্তৃপক্ষের দায়। যারা শিশুকে নৈতিকতা শেখান, তার নিরাপত্তাও তাদেরই দায়িত্ব। অথচ একের পর এক অভিযোগের পরও মাদ্রাসা কর্তৃপক্ষ কী ব্যবস্থা নিয়েছে, ভুক্তভোগী শিশু কী সুরক্ষা পেয়েছে, অভিযুক্তকে আইনের হাতে তুলে দিতে কী করা হয়েছে–এসব প্রশ্নের জবাব জনসমক্ষে মেলে না। অভিযুক্ত শিক্ষকদের কোনো কেন্দ্রীয় তালিকাও নেই। ফলে একই মানুষ নতুন নামে আরেক জায়গায় প্রতিষ্ঠান খুলে বসতে পারেন। সুনাম বাঁচানোর নামে অভিযোগ চাপা দেওয়া, সালিশে মিটমাট কিংবা টাকায় আপস, কোনোটাই মেনে নেওয়া যায় না।
সংকটটা শুধু মাদ্রাসার নয়, সাধারণ স্কুলেও নিপীড়নের খবর আসে। ২০০৯ সালে হাইকোর্ট মাদ্রাসাসহ সব শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে যৌন হয়রানি প্রতিরোধ কমিটি গঠনের নির্দেশ দিয়েছিলেন। ১৭ বছরেও সে নির্দেশনা পুরোপুরি কার্যকর হয়নি। তবে সবার দায়ের কথা তুলে নির্দিষ্ট অভিযোগ এড়িয়ে যাওয়ারও সুযোগ নেই। প্রতিটি অভিযোগের নিরপেক্ষ তদন্ত, প্রমাণের ভিত্তিতে বিচার আর শিশুর সুরক্ষাই একমাত্র পথ। 

আরও পড়ুন

×