মাটির নিচের পাইপলাইন সাশ্রয় করবে সময় ও ব্যয়
.
সারোয়ার সুমন, চট্টগ্রাম
প্রকাশ: ০৯ আগস্ট ২০২৫ | ০০:৩১
বাইশ নদী-খাল পেরিয়ে মাটির নিচ দিয়ে জ্বালানি পরিবহনের জন্য প্রস্তুত হয়েছে ২৫০ কিলোমিটার দৈর্ঘ্যের এক পাইপলাইন। এ জন্য চট্টগ্রামের পতেঙ্গা গুপ্তাখাল থেকে গোদনাইল পর্যন্ত ১৬ ইঞ্চি ব্যাসের ২৪১ দশমিক ২৮ কিলোমিটার পাইপলাইন পাঁচ ফুট মাটির নিচে বসানো হয়েছে। গোদনাইল থেকে ফতুল্লা পর্যন্ত বসানো হয়েছে ১০ ইঞ্চি ব্যাসের ৮ দশমিক ২৯ কিলোমিটার সংযোগ পাইপলাইনও। বাংলাদেশ পেট্রোলিয়াম করপোরেশন (বিপিসি) বলছে, জ্বালানি বিতরণের নতুন এই ব্যবস্থা সরবরাহের সময়, সড়কপথে যানজট ও পরিবহন ব্যয় কমাবে। তেলবাহী ট্যাঙ্কারে সড়ক দুর্ঘটনার ঝুঁকিও অনেকাংশে কমিয়ে আনবে। এটি সাশ্রয় করবে অর্থও। কারণ বর্তমানে চট্টগ্রাম থেকে ঢাকা পর্যন্ত তেল পরিবহনে তাদের বার্ষিক খরচ হয় প্রায় ৩২৬ কোটি টাকা। একই পরিমাণ তেল মাটির নিচের এই পাইপলাইনে সরবরাহ করতে খরচ হবে মাত্র ৯০ কোটি টাকা। এই হিসাবে বছরে অন্তত ২২৬ কোটি টাকা সাশ্রয় হবে। কমবে সিস্টেম লস। ঠেকানো যাবে চুরিও।
ইতোমধ্যে পরীক্ষামূলকভাবে তেল সরবরাহ করেছে বিপিসি। এ সময় জিরো সিস্টেম লস অর্জিত হওয়ার রেকর্ড হয়েছে বলে দাবি করছে তারা। জ্বালানি উপদেষ্টা মুহাম্মদ ফাওজুল কবির খানের ১৬ আগস্ট চট্টগ্রামে এসে গুপ্তাখাল পদ্মা অয়েল কোম্পানির ডিপোতে পাইপলাইনে জ্বালানি তেল সরবরাহের এ কার্যক্রম আনুষ্ঠানিকভাবে উদ্বোধন করার কথা রয়েছে।
জ্বালানি পরিবহনের খরচ কমানো ও চুরি ঠেকানোর লক্ষ্যে ২০১৫ সালে এই পাইপলাইনের পরিকল্পনা গ্রহণ করে বিপিসি। তখন ভারতীয় প্রতিষ্ঠান ইঞ্জিনিয়ার্স ইন্ডিয়া লিমিটেডকে দিয়ে বিপিসি একটি সম্ভাব্যতা যাচাই পরীক্ষাও (ফিজিবিলিটি স্টাডি) সম্পন্ন করে। ২০১৮ সালের অক্টোবরে জাতীয় অর্থনৈতিক পরিষদের নির্বাহী কমিটি (একনেক) ‘চট্টগ্রাম থেকে ঢাকা জ্বালানি তেল পরিবহনের পাইপলাইন নির্মাণ’ প্রকল্প অনুমোদন দেয়। সমীক্ষাতে বলা হয়েছিল এই প্রকল্পটি বাস্তবায়ন করা গেলে বছরে ২৭ থেকে ৩০ লাখ টন জ্বালানি পরিবহনের সক্ষমতা তৈরি হবে; যা ভবিষ্যতে ৫০ লাখ টন পর্যন্ত বাড়ানো যাবে।
প্রকল্প পরিচালক আমিনুল হক বলেন, ‘চট্টগ্রাম থেকে নারায়ণগঞ্জের গোদনাইল পর্যন্ত ডিজেল সরবরাহের একাধিক সফল ট্রায়াল এরই মধ্যে সম্পন্ন করেছি আমরা। গত জুনের শেষ দিকে চট্টগ্রামের পতেঙ্গা থেকে নারায়ণগঞ্জে ৩২ হাজার টন পরিশোধিত ডিজেল তিন দিনে সফলভাবে সরবরাহ করা হয়। এখন পর্যন্ত সাড়ে ৪ কোটি লিটার তেল পরীক্ষামূলকভাবে পরিবহন করেছে এই পাইপলাইন। তাই আগামী ১৬ আগস্ট এটি আনুষ্ঠানিকভাবে উদ্বোধন করবেন জ্বালানি উপদেষ্টা মোহাম্মদ ফাওজুল কবির খান।’
যেভাবে ঠেকাবে অপচয় ও চুরি
দেশে চাহিদার ৭০ লাখ টন জ্বালানির অন্তত ২৫ থেকে ৩০ লাখ টন ব্যবহৃত হয় ঢাকা ও কুমিল্লা অঞ্চলে। এসব জ্বালানির বেশির ভাগ এখন বেসরকারি অয়েল ট্যাঙ্কারের মাধ্যমে নৌপথে পরিবাহিত হয়। এতে কোটি কোটি টাকার তেল চুরি হচ্ছে। ঘটছে নানা অনিয়মও। ট্যাঙ্কারে জ্বালানি তেল পরিবহনের ক্ষেত্রে শূন্য দশমিক ১৭ শতাংশ সিস্টেম লস বিপিসি মেনে নিলেও বাস্তবে এটা হচ্ছে আরও বেশি। এ জন্য মাটির নিচ দিয়ে নেওয়া হয়েছে নতুন এই পাইপ লাইন। এটি নিতে গিয়ে ২২টি নদী ও খালের নিচ দিয়েও পাইপ টানতে হয়েছে বিপিসিকে। ৫০ লাখ টন ধারণক্ষমতার পাইপলাইনে বর্তমানে ৩০ লাখ টন জ্বালানি তেল সরবরাহ দেওয়া হবে। পর্যায়ক্রমে বাড়ানো হবে এটি। এ জন্য ভবিষ্যতে কুমিল্লা থেকে চাঁদপুর পর্যন্ত ৮ ইঞ্চি ব্যাসের ৫৯ দশমিক ২৩ কিলোমিটার দীর্ঘ আরেকটি পাইপলাইন স্থাপনের পরিকল্পনা রয়েছে বিপিসির। সেটি হলে চাঁদপুর অঞ্চলে জ্বালানি বিতরণ সহজতর হবে আরও।
তেল যাবে স্বয়ংক্রিয় সিস্টেমে
এই পাইপলাইন ব্যবহার করে তিনটি তেল বিপণন কোম্পানি জ্বালানি তেল সরবরাহ করবে। চট্টগ্রাম থেকে কুমিল্লার বরুড়া হয়ে জ্বালানি তেল যাবে নারায়ণগঞ্জের গোদনাইল এবং ঢাকার ফতুল্লায়। এ জন্য কুমিল্লার বরুড়ায় স্থাপন করা হয়েছে সর্বাধুনিক প্রযুক্তিসমৃদ্ধ অটোমেটেড ডিপো। এই ডিপো থেকে চাঁদপুর, ব্রাহ্মণবাড়িয়াসহ সন্নিহিত অঞ্চলের প্রয়োজনীয় জ্বালানি তেল সরবরাহ করা হবে; যা এখন চাঁদপুরে পাঠানো হয় নৌপথে। এই ডিপোতে জ্বালানি তেল গ্রহণ এবং সরবরাহ সবকিছু নিয়ন্ত্রিত হবে সর্বাধুনিক প্রযুক্তিতে। তেলের ওজন, তাপমাত্রা, সরবরাহ সবই পরিচালিত হবে কম্পিউটারাইজড প্রযুক্তিতে। এ জন্য চট্টগ্রামের ডেসপ্যাচ টার্মিনালের স্ক্যাডা মাস্টার কন্ট্রোল স্টেশন থেকেই পুরো পাইপলাইনের কার্যক্রম নিয়ন্ত্রণ এবং পরিচালনা করা হবে। স্ক্যাডা, টেলিকমিউনিকেশন এবং লিক ডিটেকশন করতে এই পাইপলাইনের সঙ্গে অপটিক্যাল ফাইবার কেবল লাইন সংযুক্ত রয়েছে। অবশ্য গত ১১ ফেব্রুয়ারি চট্টগ্রামের পতেঙ্গায় অবস্থিত জ্বালানি তেলের মূল স্থাপনা (এমআই) থেকে তেল পরীক্ষামূলকভাবে পরিবহন করার উদ্যোগ নেওয়া হয় নারায়ণগঞ্জের গোদনাইল ডিপোতে। কিন্তু পাইপে করে জ্বালানি তেল নারায়ণগঞ্জের ফতুল্লা ডিপোতে পৌঁছার আগে জটিলতা তৈরি হয় কুমিল্লা পয়েন্টে। পরে সারানো হয় এই ত্রুটি।
পাইপলাইন স্থাপনে ব্যয় বেড়েছে দ্বিগুণ
পাইপলাইন স্থাপনের প্রকল্পটি ২০১৮ সালের অক্টোবরে একনেকে অনুমোদন পেয়েছিল। দ্বিতীয় দফায় প্রকল্পের মেয়াদ বাড়িয়ে ২০২৪ সালের ডিসেম্বর পর্যন্ত নির্ধারণ হয়। শুরুতে প্রকল্পটির ব্যয় ধরা হয়েছিল দুই হাজার ৮৬১ কোটি টাকা। ব্যয় বেড়ে দাঁড়িয়েছে প্রায় তিন হাজার ৬৯৯ কোটি টাকায়।
- বিষয় :
- পাইপলাইন
