অভিমত
অভ্যন্তরীণ ও আন্তর্জাতিক কারণে গতি হারিয়েছে পোশাক খাত
মো. মহিউদ্দিন রুবেল
মো. মহিউদ্দিন রুবেল
প্রকাশ: ১৭ জানুয়ারি ২০২৬ | ০৭:২৮
| প্রিন্ট সংস্করণ
অনেক বছর ধরেই বাংলাদেশের রপ্তানি আয়ের মূল ভিত্তি হিসেবে কাজ করছে তৈরি পোশাকশিল্প। তবে ২০২৫ সালে এসে সেই খাতটি বেশ কিছু অভ্যন্তরীণ ও আন্তর্জাতিক কারণে গতি হারিয়েছে। ২০২৪ সালে সময়োপযোগী পুনরুদ্ধারের ধারায় পোশাক রপ্তানি বেড়ে দাঁড়ায় ৩৮ দশমিক ৪৮ বিলিয়ন ডলার। আগের বছরের তুলনায় প্রবৃদ্ধি হয় ৭ দশমিক ২৩ শতাংশ। ২০২৫ সালে রপ্তানি সামান্য বেড়ে ৩৮ দশমিক ৮২ বিলিয়ন ডলার হলেও প্রবৃদ্ধি হয়েছে মাত্র শূন্য দশমিক ৮৯ শতাংশ। এই ধীরগতি স্পষ্ট করে যে, খাতটি বিভিন্ন ধরনের চাপে পড়েছে।
এই মন্থরতার পেছনে বেশ কয়েকটি কারণ রয়েছে। আন্তর্জাতিক বাণিজ্য সম্পর্কের টানাপোড়েন এখানে গুরুত্বপূর্ণ। প্রধান বাজারগুলো বিশেষ করে যুক্তরাষ্ট্র থেকে শুল্ক আরোপের হুমকি, ক্রয়াদেশ স্থগিত এবং শর্ত কঠোর হওয়ার মতো পদক্ষেপে পোশাক রপ্তানিতে অনিশ্চয়তা তৈরি হয়েছে।
অনেক ক্রেতা নতুন অর্ডার দিতে সতর্ক হয়ে উঠেছে। কেউ কেউ সাময়িকভাবে অন্য রপ্তানিকারক দেশের দিকে ঝুঁকেছে। খাত হিসেবে তৈরি পোশাক শিল্প দীর্ঘমেয়াদি ও স্থায়ী ক্রেতা-বিক্রেতা সম্পর্কের ওপর নির্ভরশীল। তাই এই ধরনের মন্থরতা উৎপাদন পরিকল্পনা, বিনিয়োগ সিদ্ধান্ত এবং দীর্ঘমেয়াদি কৌশলগত প্রস্তুতিকে ব্যাহত করেছে।
দেশের অভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক পরিস্থিতিও এ সময়ে ব্যবসায়িক আস্থাকে দুর্বল করেছে। এটি স্বাভাবিক বাণিজ্যপ্রবাহে বিঘ্ন ঘটিয়েছে। সরবরাহ শৃঙ্খল ভেঙে পড়ার ঝুঁকি বেড়েছে, যা সময়মতো পণ্য সরবরাহকে কঠিন করে তুলেছে। এ ধরনের পরিবেশে স্থানীয় ও বিদেশি–দুই ধরনের বিনিয়োগকারীই সিদ্ধান্ত নিতে বিলম্ব করছে। অন্যদিকে রপ্তানিকারকরা কাঁচামাল আমদানি বা উৎপাদন সক্ষমতা বাড়ানোর বিষয়ে আরও রক্ষণশীল হয়ে উঠেছে।
২০২৫ সালে শ্রম অস্থিরতাও নতুন মাত্রায় পৌঁছায়; যার সরাসরি প্রভাব পড়ে পোশাক খাতে। সড়ক অবরোধ, কারখানা বন্ধ থাকা এবং উৎপাদন বারবার ব্যাহত হওয়ার ফলে সামগ্রিক উৎপাদন কমে গেছে। সময়মতো পণ্য পাঠাতে না পারার ফলে বাংলাদেশকে একটি নির্ভরযোগ্য সোর্সিং হাব হিসেবে দেখার প্রবণতায় আঘাত লেগেছে। আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ ঘটনা ছিল কাস্টম হাউসের পূর্ণাঙ্গ কার্যক্রম বন্ধ হয়ে যাওয়া, যা বৈশ্বিক প্রেক্ষাপটে খুবই বিরল। যে দেশে রপ্তানি আয়ের বড় অংশই পোশাক খাত থেকে আসে, সেখানে কাস্টম হাউস অচল হয়ে যাওয়া রপ্তানি প্রক্রিয়াকে সরাসরি থামিয়ে দেয় এবং ক্রয়াদেশ কমার ঝুঁকি ব্যাপকভাবে বাড়িয়ে তোলে। আন্তর্জাতিক ক্রেতাদের চোখে এটি প্রশাসনিক সক্ষমতা ও ঝুঁকি ব্যবস্থাপনা নিয়ে প্রশ্ন তোলে। এ ছাড়া বিমানবন্দরে ভয়াবহ অগ্নিকাণ্ডে বিপুল পরিমাণ পণ্য পুড়ে যায়। এ ধরনের দুর্ঘটনা নিরাপত্তা মান, ঝুঁকি ব্যবস্থাপনা ও অবকাঠামো সক্ষমতা সম্পর্কে ক্রেতার আস্থা আরও নড়বড়ে করে।
এদিকে রপ্তানি প্রণোদনা ধীরে ধীরে কমে যাওয়ার পাশাপাশি মূল্যস্ফীতি উৎপাদন ব্যয় বাড়িয়ে দিয়েছে, যার প্রভাব পড়েছে আন্তর্জাতিক বাজারে মূল্য প্রতিযোগিতায়। কাঁচামাল, জ্বালানি, পরিবহন, মজুরিসহ ইউনিট মূল্য বেড়ে যাওয়ায় অনেক ক্ষেত্রে অর্ডার ধরে রাখা কঠিন হয়েছে। প্রণোদনা কমে যাওয়ায় আগের মতো দামে প্রতিযোগিতামূলক থাকা আর সহজ থাকেনি। এর সঙ্গে যোগ হয়েছে কাঠামোগত সমস্যা ও বৈশ্বিক প্রতিযোগিতা। ইউরোপীয় বাজারে আরও শক্তিশালী প্রতিদ্বন্দ্বী উঠে আসায় বাংলাদেশ সেখানে চাপের মুখে পড়েছে। অপ্রচলিত বা নতুন বাজারগুলোতে খুব বেশি সাফল্য না পাওয়ায় ইইউ ও যুক্তরাষ্ট্রের মতো কয়েকটি বড় রপ্তানি গন্তব্যের ওপর অতিরিক্ত নির্ভরশীলতা স্পষ্ট হয়েছে। পণ্যের বৈচিত্র্যও তুলনামূলক কম।
এসব চ্যালেঞ্জের মাঝেও কিছু গুরুত্বপূর্ণ ইতিবাচক পরিবর্তন ঘটেছে, যা দীর্ঘ মেয়াদে খাতটিকে টেকসই করার পথে গুরুত্বপূর্ণ সংকেত দেয়। সাম্প্রতিক শ্রম আইন সংশোধনের মাধ্যমে শ্রমিকদের অধিকারের সুরক্ষা বাড়ানো এবং আন্তর্জাতিক মানের সঙ্গে সামঞ্জস্য আনার চেষ্টা হয়েছে। ক্রেতার আস্থা, ব্র্যান্ড ইমেজ বাড়ানো এবং টেকসই উন্নয়নের জন্য এগুলো অত্যন্ত প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ। ২০২৫ সালে বাংলাদেশি আরএমজি খাত নতুন ৩৮টি এলইইডি সার্টিফায়েড সবুজ কারখানা যুক্ত হয়েছে।
আগামীতে দেশের আরএমজি খাত কতটা প্রতিযোগিতামূলক থাকবে, তা নির্ভর করবে কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ের ওপর। যেমন–অবকাঠামোগত ঘাটতি কমাতে হবে। উন্নত সড়ক, বন্দর, গুদামজাতকরণ এবং ডিজিটাল অবকাঠামো ছাড়া সরবরাহ শৃঙ্খল দক্ষ করা কঠিন। অভ্যন্তরীণ অচলাবস্থা ও অনিশ্চয়তার বিষয়টিও গুরুত্বপূর্ণ। রাজনৈতিক ও সামাজিক স্থিতিশীলতা এবং নীতির ধারাবাহিকতা প্রয়োজন।
এ ছাড়া উচ্চমূল্য সংযোজিত পণ্য, ডিজাইননির্ভর প্রডাক্ট, ব্র্যান্ডিং ও মার্কেটিং, উৎপাদনশীলতা বাড়ানো, প্রযুক্তি আপগ্রেড, অটোমেশন, দক্ষ জনবল প্রশিক্ষণে বিনিয়োগ বাড়ানো দরকার। গবেষণা, উদ্ভাবন ও বাজার সম্প্রসারণেও মনোযোগী হতে হবে। আর্থিক খাতকে এমনভাবে শক্তিশালী করতে হবে, যাতে একদিকে সমস্যাগ্রস্ত কারখানাগুলো পুনর্বাসনের সুযোগ পায়, অন্যদিকে সম্ভাবনাময় ও দক্ষ প্রতিষ্ঠানগুলো ভবিষ্যৎ প্রবৃদ্ধির জন্য পর্যাপ্ত অর্থায়ন পায়। স্বল্পোন্নত দেশ (এলডিসি) থেকে উত্তরণের ফলে যে শুল্ক সুবিধা ও বিশেষ সুযোগ কমে যাবে, তার প্রভাব সম্পর্কে পরিষ্কার ধারণা নিয়ে আগাম নীতি পরিকল্পনা করতে হবে।
বর্তমান চ্যালেঞ্জ সত্ত্বেও বাংলাদেশের আরএমজি খাতে এখনও বেশ কিছু বড় শক্তি রয়েছে। যেমন– বৃহৎ উৎপাদন সক্ষমতা, দীর্ঘদিনের ক্রেতা সম্পর্ক, সাপ্লাই চেইন অভিজ্ঞতা এবং টেকসই পোশাক উৎপাদনে বৈশ্বিক নেতৃত্বের অবস্থান। তবে এটাও মনে রাখতে হবে যে, আমাদের প্রতিযোগী দেশগুলোর কোনোটাই এককভাবে একটি খাতের ওপর এতটা নির্ভরশীল নয়। আমরা যদি সমন্বিত কৌশল, নীতির ধারাবাহিকতা এবং বাস্তবায়নের প্রতি দৃঢ় অঙ্গীকার বজায় রাখতে পারি, তাহলে রপ্তানি প্রবৃদ্ধি আবারও গতি পেতে পারে। এতে বাংলাদেশ বৈশ্বিক পোশাক বাণিজ্যে তার অবস্থান আরও সুদৃঢ় করতে পারবে।
লেখক: সাবেক পরিচালক, বিজিএমইএ
- বিষয় :
- অভিমত
