ঢাকা বৃহস্পতিবার, ০৪ জুন ২০২৬

স্টার্টআপ বিনিয়োগের বড় অংশ এসেছে একটি লেনদেন থেকে

স্টার্টআপ বিনিয়োগের বড় অংশ  এসেছে একটি লেনদেন থেকে
×

সমকাল প্রতিবেদক

প্রকাশ: ২৮ ফেব্রুয়ারি ২০২৬ | ০৭:৪৮

| প্রিন্ট সংস্করণ

বাংলাদেশে স্টার্টআপে গত বছর ১২৪ মিলিয়ন ডলারের বিনিয়োগ হয়েছে। মোট বিনিয়োগ আগের বছরের চেয়ে বাড়লেও মাত্র একটি ডিল বা লেনদেন থেকে এসেছে বেশির ভাগ অর্থ, যার পরিমাণ ১১০ মিলিয়ন ডলার। এটি শপআপ এবং সৌদি আরবের ‘সারি’ একীভূত হয়ে সিলকিউ গ্রুপ নামে যে উদ্যোগ নেওয়া হয়, তার সঙ্গে সংশ্লিষ্ট বিনিয়োগ। ব্যবস্থাপনা পরামর্শক প্রতিষ্ঠান লাইটক্যাসল পার্টনার্সের ‘বাংলাদেশে ২০২৫ সালে স্টার্টআপ বিনিয়োগ পর্যালোচনা’ শিরোনামের প্রতিবেদনে এমন তথ্য দেওয়া হয়েছে।
প্রতিবেদনে বলা হয়, বাংলাদেশে ২০২৫ সালে ১২টি ডিলে মোট স্টার্টআপ ফান্ডিং দাঁড়ায় ১২৪ মিলিয়ন ডলার। ২০২৪ সালে ৪১টি ডিলে মোট বিনিয়োগ ছিল ৪২ মিলিয়ন ডলার। গত বছর একটি ডিল বাদ দিলে ফান্ডিং কার্যক্রম মোটামুটি সীমিতই ছিল। এটি প্রমাণ করে, ২০২৫ সাল ছিল ব্যাপক পুনরুদ্ধারের চেয়ে বেশি ঘনীভবনের বছর।
প্রসঙ্গত, স্টার্টআপ বলতে বোঝায় নতুন একটি ব্যবসা বা উদ্যোগ। এটি সাধারণত নতুন আইডিয়া, নতুন পণ্য বা সেবা নিয়ে শুরু হয় এবং ভবিষ্যতে দ্রুত বড় হওয়ার লক্ষ্য থাকে। উদহারণস্বরূপ, কেউ যদি একটি নতুন অ্যাপ, অনলাইন ব্যবসা বা ভিন্নভাবে কোনো সমস্যা সমাধানের আইডিয়া নিয়ে ব্যবসা শুরু করে তাহলে তাকে স্টার্টআপ বলা হয়।

বাংলাদেশ কোথায় আছে
লাইটক্যাসল পার্টনার্সের প্রতিবেদনে বলা হয়, বাংলাদেশের সামষ্টিক অর্থনৈতিক ভিত্তি এখনও দীর্ঘমেয়াদি প্রবৃদ্ধির সম্ভাবনার দিকেই ইঙ্গিত করে। অনেক আঞ্চলিক প্রতিদ্বন্দ্বী দেশের তুলনায় বাস্তব জিডিপি প্রবৃদ্ধি ইতিবাচক রয়েছে এবং প্রযুক্তিনির্ভর ব্যবসার জন্য অন্তর্নিহিত চাহিদার চলকগুলোও সক্রিয় আছে। তবে জিডিপির অনুপাতে স্টার্টআপ বিনিয়োগের হার এখনও খুবই কম, আনুমানিক মাত্র ০.০৩ শতাংশ। এই ব্যবধান বলে দেয়, অর্থনীতি একটি শক্তিশালী স্টার্টআপ ইকোসিস্টেমকে ধারণ করার সক্ষমতা রাখলেও, পুঁজি গঠন এখনও সেই অনুপাতে বিস্তৃত হয়নি। 
গত এক দশকে বাংলাদেশের স্টার্টআপ ইকোসিস্টেম একাধিক চক্রের মধ্য দিয়ে গেছে। শুরুর বছরগুলোতে গুরুত্ব ছিল ইকোসিস্টেম গঠন ও ছোট অঙ্কের বিনিয়োগে। পরবর্তী সময়ে প্রাতিষ্ঠানিক বিনিয়োগকারীদের অংশগ্রহণ বেড়েছে এবং কিছু বড় ডিলের মাধ্যমে মাঝেমধ্যে বিনিয়োগে উল্লম্ফন দেখা গেছে। কভিড সময়কালে ব্যতিক্রমী মাত্রায় মূলধন প্রবাহ ঘটলেও, পরে বৈশ্বিক ঝুঁকি গ্রহণের প্রবণতা কমে যায়। 

লাইটক্যাসলের পর্যালোচনায় বলা হয়, ২০২৫ সালে স্টার্টআপ বিনিয়োগ স্পষ্টভাবে কম সংখ্যক। বড় অঙ্কের এবং প্রতিষ্ঠিত পর্যায়ের কোম্পানির প্রতি ঝোঁক দেখা গেছে। মোট বিনিয়োগের প্রায় সবটাই গেছে এ ধরনের কৌশলগত লেনদেনে। শীর্ষ তিনটি ডিলই মোট মূলধনের প্রায় ৯৫ শতাংশ দখল করে। প্রথম পর্যায়ের বিনিয়োগের গতি তুলনামূলকভাবে ধীর ছিল। 
প্রতিবেদনে আরও বলা হয়, বিনিয়োগকারীদের গঠনও এই প্রবণতাকে জোরদার করেছে। ভেঞ্চার ক্যাপিটাল ফার্মগুলোই ছিল প্রধান অর্থের উৎস এবং মোট বিনিয়োগের সিংহভাগ তাদের থেকেই এসেছে। খাতভিত্তিকভাবে আর্থিক সেবাখাত মোট ফান্ডিংয়ের ৮৯ শতাংশ দখল করেছে। সফটওয়্যার ও এন্টারপ্রাইজ সল্যুশন, ই-কমার্স, এনার্জি ও ক্লাইমেট এবং শিক্ষা খাতেও কার্যক্রম ছিল, তবে বিনিয়োগের অংক ছিল উল্লেখযোগ্যভাবে কম। এই বণ্টন দেখায় যে কঠোর মূলধন পরিবেশে বিনিয়োগকারীরা স্পষ্ট আয়ের পথে থাকা খাতের দিকেই বেশি ঝোঁকেন।
২০২৫ সালে বৈশ্বিক মূলধনের ওপর নির্ভরতা আরও বেড়েছে। মোট ফান্ডিংয়ের প্রায় ৯৯ শতাংশই এসেছে আন্তর্জাতিক বিনিয়োগকারীদের কাছ থেকে। স্থানীয় বিনিয়োগকারীদের অংশগ্রহণ মূল্য ও ডিল সংখ্যায়–উভয় দিক থেকেই আগের বছরের তুলনায় কমেছে। আন্তর্জাতিক প্রবাহের মধ্যে উপসাগরীয় অঞ্চলের বিনিয়োগকারীরা তুলনামূলকভাবে বেশি দৃশ্যমান হয়েছে, যা ঐতিহ্যবাহী বাজারের বাইরে আগ্রহের ধীরে ধীরে বৈচিত্র্য বাড়ার ইঙ্গিত দেয়।

সতর্ক কিন্তু গঠনমূলক দৃষ্টিভঙ্গি
প্রতিবেদনে বলা হয়, স্টার্টআপ ইকোসিস্টেমজুড়ে কৌশলগত লেনদেন, বৈশ্বিক বিনিয়োগকারীদের অব্যাহত আগ্রহ এবং ধীরে ধীরে নীতিগত অগ্রগতি–সব মিলিয়ে প্রবৃদ্ধির জন্য প্রয়োজনীয় ভিত্তি এখনও বিদ্যমান। এ কারণে ২০২৫ সালকে সম্পূর্ণ পুনরুদ্ধার হিসেবে নয় বরং আরও সচেতন ও পরিকল্পিত ইকোসিস্টেম উন্নয়নের দিকে একটি রূপান্তরকাল হিসেবে দেখা উচিত। যদি পুঁজি গঠন বিস্তৃত হয়, বাস্তবায়ন শক্তিশালী হয় এবং বিভিন্ন স্তরে অংশগ্রহণ গভীর হয়, তবে ভবিষ্যতের প্রবৃদ্ধি হবে বেশি টেকসই। 

বৈশ্বিক পরিস্থিতি
২০২৫ সালে বৈশ্বিক স্টার্টআপ ফান্ডিংয়ে পুনরুদ্ধার দেখা যায়। মোট বিনিয়োগ বেড়ে দাঁড়ায় ৪৬৯ বিলিয়ন মার্কিন ডলারে, যা ২০২৪ সালের প্রায় ৩২০ বিলিয়ন ডলার থেকে উল্লেখযোগ্যভাবে বেশি। এতে বছরে প্রবৃদ্ধি হয়েছে প্রায় ৪৭ শতাংশ। এই পুনরুদ্ধারের মূল চালিকাশক্তি ছিল লেট-স্টেজ লেনদেন । 
এশিয়ায় প্রবৃদ্ধির গতি ছিল তুলনামূলকভাবে মৃদু। ২০২৪ সালের প্রায় ৫০ বিলিয়ন ডলার থেকে ২০২৫ সালে এ অঞ্চলে মোট স্টার্টআপ ফান্ডিং বেড়ে দাঁড়ায় আনুমানিক ৫৩ বিলিয়ন ডলারে, যা প্রায় ৬ শতাংশ প্রবৃদ্ধি নির্দেশ করে। 
এই বৈশ্বিক ও আঞ্চলিক প্রেক্ষাপটের মধ্যেই বাংলাদেশের স্টার্টআপ ইকোসিস্টেমের বিকাশ ঘটেছে। সামগ্রিকভাবে ফান্ডিং পরিস্থিতির উন্নতি হলেও, বিনিয়োগকারীদের আচরণে পরিবর্তন দেখা যায়নি; তারা ব্যাপক আর্লি-স্টেজ সম্প্রসারণের পরিবর্তে তুলনামূলকভাবে কম সংখ্যক, বড় অংকের এবং বেশি টেকসই ডিলকে অগ্রাধিকার দিয়েছেন।

আরও পড়ুন

×