দেশের ব্যবসার পরিবেশ কর্মসংস্থানমুখী নয়
আনোয়ার ইব্রাহীম
প্রকাশ: ১৮ এপ্রিল ২০২৬ | ০৭:৪৮
| প্রিন্ট সংস্করণ
দেশের অর্থনীতি এক গভীর বৈপরীত্যের মধ্য দিয়ে যাচ্ছে। ২০২৪ সাল পর্যন্ত পূর্ববর্তী এক দশকে গড়ে ৬ শতাংশ হারে জিডিপি প্রবৃদ্ধি হয়েছে। তবে সেই প্রবৃদ্ধি পর্যাপ্ত এবং মানসম্মত কর্মসংস্থান তৈরি করতে পারেনি। এর প্রধান কারণ দেশের ব্যবসা পরিবেশ কর্মসংস্থান সৃষ্টির উপযোগী ছিল না।
চলতি এপ্রিলে প্রকাশিত ‘বাংলাদেশ ডেভেলপমেন্ট আপডেট’ প্রতিবেদনে এমন মন্তব্য করে বিশ্বব্যাংক। সংস্থাটি সতর্ক করে বলেছে, বিশ্ববাজারে বাংলাদেশের অগ্রাধিকারমূলক রপ্তানি সুবিধা (জিএসপি) ধীরে ধীরে কমবে। এ অবস্থায় ব্যবসা প্রতিযোগিতায় টিকে থাকতে উৎপাদনশীলতা বাড়ানোর কোনো বিকল্প নেই। বিশ্বব্যাংকের এবারের প্রতিবেদনটি ‘ব্যবসা পরিবেশ’-এর ওপর বিশেষ গুরুত্ব দিয়ে তৈরি করা হয়েছে। এর ওপর আলাদা বিশ্লেষণ প্রতিবেদনে স্থান পেয়েছে।
বিশ্বব্যাংকের মতে, এ সমস্যার সমাধান করতে হবে সরকারকেই। কেবল প্রবৃদ্ধির পেছনে না ছুটে এমন একটি ব্যবসায়িক পরিবেশ তৈরি করতে হবে, যেখানে ক্ষুদ্র উদ্যোক্তারা স্বচ্ছন্দে ব্যবসা করতে পারে এবং নতুন কর্মসংস্থান তৈরি হয়। এ জন্য নিয়ন্ত্রণ কমানোর পথে হাঁটতে সরকারকে পরামর্শ দিয়ে এ সংস্থা বলছে, এ নীতির সফল বাস্তবায়ন করা হলে বাংলাদেশ তার বিপুল শ্রমশক্তিকে সম্পদে রূপান্তর করতে সক্ষম হবে।
বিশ্বব্যাংক এ সময় এই বিষয়ে গুরুত্ব দিয়েছে যখন জুলাই গণঅভ্যুত্থানের পর সংসদ নির্বাচনে নিরঙ্কুশ বিজয় নিয়ে সরকার গঠন করেছে বিএনপি। এ সরকারের অর্থমন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী নির্বাচনের আগে থেকেই ব্যবসার পরিবেশ উন্নয়ন এবং ডি-রেগুলেশন বাস্তবায়নের কথা বলে আসছেন।
বিশ্বব্যাংকের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ২০১৬ থেকে ২০২৪ সালের মধ্যে দেশে প্রতিবছর গড়ে মাত্র ৯ লাখ কর্মসংস্থান তৈরি হয়েছে। কিন্তু শ্রমবাজারে প্রতিবছর যুক্ত হচ্ছে প্রায় ২০ লাখ নতুন মুখ। এই বিশাল ঘাটতি শুধু আয় বা উৎপাদনশীলতাকেই কমিয়ে দিচ্ছে না, বরং দেশের সামাজিক স্থিতিশীলতাকেও হুমকির
মুখে ফেলছে।
উৎপাদনশীলতার বৈপরীত্য ও বেসরকারি খাতের স্থবিরতা
প্রতিবেদনে বাংলাদেশের অর্থনীতির একটি প্রধান সমস্যা হিসেবে ‘উৎপাদনশীলতার বৈপরীত্য’ চিহ্নিত করা হয়েছে। বিশ্বব্যাংক বলছে, উচ্চ জিডিপি প্রবৃদ্ধি সত্ত্বেও কোম্পানি পর্যায়ে উদ্ভাবন বা ব্যাপকভিত্তিক গতিশীলতা পরিলক্ষিত হচ্ছে না। উৎপাদন এবং সেবা খাতে শ্রমিকপ্রতি আয় দক্ষিণ এশিয়ার গড়ের বিবেচনায় অনেক কম। সবচেয়ে উদ্বেগের বিষয় হলো, সেবা খাতে উৎপাদনশীলতা ২০১৬ সাল থেকে কার্যত স্থবির হয়ে আছে।
নতুন কোম্পানি গঠনের হারও আশঙ্কাজনকভাবে কমেছে। বর্তমানে আনুষ্ঠানিক খাতের মাত্র ৮ শতাংশ প্রতিষ্ঠান গত পাঁচ বছরে প্রতিষ্ঠিত হয়েছে, যা চীন (৩২ শতাংশ) বা ভিয়েতনামের (৪০ শতাংশ) তুলনায় অনেক কম। সরাসরি বৈদেশিক বিনিয়োগ (এফডিআই) জিডিপির ১ শতাংশের নিচে, যা বৈশ্বিক মানদণ্ডে সর্বনিম্ন পর্যায়ের। এই বিনিয়োগ আবার উৎপাদনমুখী খাতের চেয়ে ইউটিলিটি খাতে বেশি হচ্ছে। ফলে প্রযুক্তিগত জ্ঞান হস্তান্তরের সুযোগ কমছে।
বেসরকারি খাতে দ্বৈত কাঠামো এবং কর্মসংস্থানের সংকট
বিশ্বব্যাংকের বিশ্লেষণ অনুযায়ী, বাংলাদেশের বেসরকারি খাতে একটি প্রকট ‘দ্বৈত কাঠামো’ গড়ে উঠেছে। এর একদিকে রয়েছে মুষ্টিমেয় কিছু উচ্চ উৎপাদনশীল বড় প্রতিষ্ঠান বা ‘ফ্রন্টিয়ার ফার্মস’, যারা মোট আনুষ্ঠানিক খাতের রাজস্বের ৭৫ শতাংশ নিয়ন্ত্রণ করে। কিন্তু বিস্ময়কর বিষয় হলো, এই বিশাল আয়ের মালিক হলেও তারা দেশের মোট কর্মসংস্থানের মাত্র ১৫ শতাংশ সৃষ্টি করে।
বিপরীতে দেশের সিংহভাগ কর্মসংস্থান তৈরি করে ছোট ও মাঝারি প্রতিষ্ঠান এবং অপ্রাতিষ্ঠানিক খাতের ব্যবসাগুলো, যারা প্রতিনিয়ত নীতিগত বৈষম্য এবং প্রতিকূল ব্যবসায়িক পরিবেশের শিকার। তৈরি পোশাক খাতে এই বৈষম্য আরও স্পষ্ট। এখানকার অগ্রগামী প্রতিষ্ঠানগুলো মোট রাজস্বের অর্ধেক আয় করলেও বেসরকারি খাতের প্রতি ১২টি চাকরির মধ্যে মাত্র একটি চাকরি তৈরি করছে। ফলে ক্ষুদ্র ও মাঝারি উদ্যোক্তাদের বড় হওয়ার সুযোগ না দিলে দেশে কর্মসংস্থান সংকট কাটানো সম্ভব নয় বলে রিপোর্টে সতর্ক করা হয়েছে।
আমলাতান্ত্রিক জটিলতার পাহাড়
ব্যবসায়িক পরিবেশের অন্যতম প্রধান অন্তরায় হিসেবে উচ্চ নিয়ন্ত্রণমূলক ব্যয় বা ‘রেগুলেটরি বার্ডেন’-কে চিহ্নিত করা হয়েছে বিশ্বব্যাংকের প্রতিবেদনে। এতে বলা হয়েছে, বাংলাদেশে বেসরকারি খাতের উচ্চপদস্থ কর্মকর্তাদের তাদের কর্মঘণ্টার গড়ে ১৩ শতাংশ ব্যয় করতে হয় কেবল সরকারি নিয়মকানুন পরিপালনের পেছনে, যাকে রিপোর্টটিতে ‘টাইম ট্যাক্স’ হিসেবে অভিহিত করা হয়েছে। এই বোঝা দেশের সব জায়গায় সমান নয়। যেমন– চট্টগ্রামে কর্মকর্তাদের ৪০ শতাংশ এবং বরিশালে প্রায় ৬০ শতাংশ সময় এই আমলাতান্ত্রিক কাজে অপচয় হয়।
বিশ্বব্যাংক বলছে, একটি অপারেটিং লাইসেন্স পেতে বাংলাদেশে গড়ে ২৮ দিন সময় লাগে এবং নির্মাণ অনুমতির জন্য লাগে প্রায় ৪৯ দিন, যা চীন বা ভারতের তুলনায় প্রায় দ্বিগুণ। এ ছাড়া একটি আনুষ্ঠানিক ব্যবসা শুরু করার প্রাথমিক খরচ আনুমানিক ১০ হাজার মার্কিন ডলার, যা তরুণ উদ্যোক্তাদের জন্য প্রবেশাধিকার সীমিত করে দিচ্ছে। যারা এই উচ্চ নিয়ন্ত্রক ব্যবস্থার মধ্যে কাজ করছেন, তাদের বিনিয়োগের আগ্রহ ১৯ শতাংশ পর্যন্ত কমে যায়।
কেন প্রতিষ্ঠানগুলো অনানুষ্ঠানিক থাকতে চায়
বাংলাদেশে অধিকাংশ ব্যবসা কেন নিবন্ধিত হয়ে মূলধারায় আসতে চায় না, তার ওপর এই প্রতিবেদনে বিস্তারিত আলোকপাত করা হয়েছে। বলা হয়েছে, প্রায় ৭৩ শতাংশ অনানুষ্ঠানিক প্রতিষ্ঠান মনে করে নিবন্ধন ফি ও জটিল প্রক্রিয়াই তাদের প্রধান বাধা। এ ছাড়া ৭১ শতাংশ প্রতিষ্ঠানের মতে, নিবন্ধিত হলে তাদের ওপর বড় করের বোঝা চাপিয়ে দেওয়া হবে। ৬১ শতাংশ প্রতিষ্ঠান সরকারি কর্মকর্তাদের পরিদর্শন বা হয়রানি এড়াতে অনানুষ্ঠানিক থাকাকেই বেশি নিরাপদ ভাবছে।
প্রতিষ্ঠানগুলো অনানুষ্ঠানিক থাকার ফলে তাদের উৎপাদনশীলতাও কম থাকে এবং তারা ব্যাংক ঋণ বা সরকারি সুবিধা থেকে বঞ্চিত হয়। ফলে তারা কখনোই বড় হয়ে কর্মসংস্থান সৃষ্টি করতে পারে না। ৫৯ শতাংশ অনানুষ্ঠানিক প্রতিষ্ঠান মনে করে ব্যাংক ঋণ পাওয়া সহজ হলে তারা নিবন্ধিত হতে রাজি হতো।
অবকাঠামো ও অর্থায়নের ঘাটতি
বিদ্যুৎ বিভ্রাটকে ব্যবসার জন্য বর্তমানে সবচেয়ে বড় সমস্যা হিসেবে দেখা হচ্ছে। বাংলাদেশে গড়ে প্রতি মাসে ২৬ বার বিদ্যুৎ বিভ্রাট ঘটে, যার ফলে প্রতিষ্ঠানগুলোর বার্ষিক বিক্রির প্রায় ৯ শতাংশ ক্ষতি হয়। এই কারণে প্রায় এক-চতুর্থাংশ প্রতিষ্ঠান জেনারেটরের ওপর নির্ভরশীল হতে বাধ্য হচ্ছে, যা উৎপাদন খরচ বাড়িয়ে দিচ্ছে।
অর্থায়নের ক্ষেত্রেও ব্যাপক বৈষম্য বিদ্যমান। রপ্তানিমুখী বড় প্রতিষ্ঠানগুলো মাত্র ২ শতাংশ সুদে ঋণ পেলেও সাধারণ উদ্যোক্তাদের ১৩ শতাংশ পর্যন্ত সুদ গুনতে হচ্ছে। বর্তমানে ৪২ শতাংশ বড় প্রতিষ্ঠান ব্যাংকিং সুবিধা পেলেও ক্ষুদ্র ও মাঝারি প্রতিষ্ঠানের ক্ষেত্রে এই হার মাত্র ২৯ শতাংশ। ঋণের অভাব উৎপাদনশীলতাকে সাড়ে ৪ শতাংশ পর্যন্ত কমিয়ে দিচ্ছে।
উত্তরণের পথরেখা স্মার্ট ডি-রেগুলেশন
সংকটময় পরিস্থিতি থেকে উত্তরণে বিশ্বব্যাংক একটি তিন স্তরের ‘স্মার্ট ডি-রেগুলেশন’ মডেল প্রস্তাব করেছে। এর মূল লক্ষ্য হলো ব্যবসায়িক অনিশ্চয়তা কমানো এবং ডি-রেগুলেশনের মাধ্যমে উৎপাদনশীলতা বাড়ানো।
স্বল্পমেয়াদি সংস্কার পথরেখায় কম ঝুঁকিপূর্ণ ব্যবসার ক্ষেত্রে লাইসেন্সিং প্রক্রিয়া সহজ করা এবং সম্পূর্ণ ডিজিটাল ‘এন্ড-টু-এন্ড’ সেবা নিশ্চিত করার পরামর্শ দিয়েছে বিশ্বব্যাংক। এ ছাড়া অনানুষ্ঠানিক প্রতিষ্ঠানগুলোকে মূলধারায় আনতে কর ছাড়ের মতো প্রণোদনা দেওয়ার কথা বলেছে। মধ্যমেয়াদি সংস্কার পথরেখায় লাইসেন্সিং ব্যবস্থা সহজ এবং বাণিজ্যিক বিরোধ নিষ্পত্তির জন্য ডিজিটাল ব্যবস্থা ও বিশেষায়িত আদালত স্থাপনের সুপারিশ করা হয়েছে।
দীর্ঘমেয়াদি সংস্কার রূপরেখায় বাণিজ্যের ক্ষেত্রে শুল্ক ও অশুল্ক বাধা কমিয়ে ‘জাতীয় শুল্ক নীতি’ বাস্তবায়ন করার পরামর্শ বিশ্বব্যাংকের। প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, বড় প্রতিষ্ঠানের পাশাপাশি ছোট ও মাঝারি প্রতিষ্ঠানের জন্য সাপ্লায়ার ডেভেলপমেন্ট প্রোগ্রাম চালু করা, যাতে তারা বড় প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে যুক্ত হতে পারে।
- বিষয় :
- ব্যবসা
