ঢাকা বৃহস্পতিবার, ০৪ জুন ২০২৬

সাক্ষাৎকার : নুজহাত আনোয়ার

লিস্টিং ও ডিলিস্টিং একসঙ্গে চলবে

লিস্টিং ও ডিলিস্টিং একসঙ্গে চলবে
×

সমকাল ডেস্ক

প্রকাশ: ২৫ এপ্রিল ২০২৬ | ০৭:১০ | আপডেট: ২৫ এপ্রিল ২০২৬ | ০৭:১২

| প্রিন্ট সংস্করণ

সমকাল: আপনি সম্প্রতি ঢাকা স্টক এক্সচেঞ্জের দায়িত্ব নিয়েছেন। দায়িত্ব গ্রহণের আগে দেশের পুঁজিবাজার সম্পর্কে ধারণা কেমন ছিল?

নুজহাত আনোয়ার: আমি যখন বিশ্বব্যাংকে কাজ করতাম, তখন জয়েন্ট ক্যাপিটাল মার্কেট ডেভেলপমেন্ট প্রোগ্রামের আওতায় বাংলাদেশের বাজার সংস্কার নিয়ে কাজ করেছি। এছাড়া লন্ডন স্টক এক্সচেঞ্জে বিডিটি বন্ড ইস্যু করা এবং সিটিএনএতে কাস্টডি লাইসেন্সিং নিয়েও আমার কাজ করার অভিজ্ঞতা ছিল। আমার পর্যবেক্ষণ ছিল যে, দেশের পুঁজিবাজারকে আমরা সঠিকভাবে ব্যবহার করতে পারছি না। উন্নত দেশগুলোতে দীর্ঘমেয়াদি অর্থায়নের উৎস হয় পুঁজিবাজার, কিন্তু আমাদের এখানে স্বচ্ছতার অভাব এবং বিনিয়োগকারী ও ইস্যুকারীদের আস্থার সংকটের কারণে এটি আন্ডার-ইউটিলাইজড থেকে গেছে।

সমকাল: দায়িত্ব নেওয়ার পর ভেতরের অবস্থা ও বাস্তবতায় কী ধরনের পার্থক্য দেখলেন?

নুজহাত আনোয়ার: বাইরে থেকে একটা ধারণা ছিল যে, এখানে হয়তো সক্ষমতার অভাব আছে। ভেতরে এসে দেখলাম অনেক সিস্টেম আছে এবং এখানকার কর্মীরাও বেশ দক্ষ। তবে তাদের ক্ষমতায়নের অভাব ছিল, যার ফলে তারা সাহসী সিদ্ধান্ত নিতে পারতেন না। বড় সমস্যা হলো বাজারটি এখনও সমন্বিত নয়। একটি কার্যকর ক্যাপিটাল মার্কেটে স্টক এক্সচেঞ্জ সেন্টারে থাকে এবং ডিপোজিটর বা ক্লিয়ারিং হাউসের সঙ্গে রিয়েল-টাইম তথ্য আদান-প্রদান করে, যা এখানে পুরোপুরি গড়ে ওঠেনি।

সমকাল: কার্যকর বাজার গঠনে আপনি কী ধরনের প্রযুক্তিগত বা কাঠামোগত চ্যালেঞ্জের মুখোমুখি হচ্ছেন?

নুজহাত আনোয়ার: সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হলো ডেটা ট্রান্সপারেন্সি বা তথ্যের স্বচ্ছতা। যেমন, সিডিবিএলের সঙ্গে আমাদের এপিআই কানেক্টিভিটি নেই। ফলে আমরা রিয়েল-টাইম ডেটা পাই না, ওনারা দিনে একবার ডেটা দেন। এতে নজরদারি বাধাগ্রস্ত হয়। ই-কেওয়াইসি না থাকায় একাধিক অ্যাকাউন্ট এবং সার্কুলার ট্রেডিং শনাক্ত করা কঠিন হয়ে পড়ে। এছাড়া আমাদের একটি শক্তিশালী ক্লিয়ারিং সিস্টেম বা

সিসিবিএল প্রয়োজন। বর্তমানে আমরা নিজস্ব ডেভেলপ করা সিস্টেম ব্যবহার করছি, যাতে সব আধুনিক ফিচার নেই।
সমকাল: তালিকাভুক্ত কোম্পানিগুলোর অডিট রিপোর্ট এবং তথ্যের স্বচ্ছতা নিয়ে প্রশ্ন রয়েছে। এ বিষয়ে আপনার পরিকল্পনা কী?

নুজহাত আনোয়ার: ডেটা ট্রান্সপারেন্সি নিশ্চিত করা শুধু ডিএসইর একার কাজ নয়, এখানে নিয়ন্ত্রক সংস্থারও সহযোগিতা প্রয়োজন। আমাদের বর্তমান অর্গানোগ্রামটি ২০১৩ সালের, যা কিছুটা ত্রুটিপূর্ণ এবং আমাদের হাত-পা বেঁধে রাখে। অডিট কোয়ালিটি নিয়ে বড় সমস্যা আছে। ডিএসইর কাজ অডিটরের ভাউচার চেক করা নয়, বরং অডিট রিপোর্টের ওপর আস্থা রাখা। কিন্তু বর্তমানে আমাদের ইনভেস্টিগেশন করতে হয়। আমরা এখন সারভাইলেন্স সিস্টেম আপগ্রেড করছি এবং কিছু দক্ষ লোক নিয়োগ দিচ্ছি; যাতে অসামঞ্জস্য দ্রুত ধরা পড়ে। যদি কোনো কোম্পানিতে বড় ধরনের অনিয়ম পাই, তবে ইমিডিয়েট সাসপেন্ড করার ক্ষমতা আমরা চর্চা করতে চাই। পাশাপাশি আইনগত ব্যবস্থা নিতে বিএসইসির কাছে সুপারিশ পাঠাতে চাই, যাতে দ্রুত ব্যবস্থা নেওয়া যায়।

সমকাল: সামনের দিনগুলোতে আপনার কাজের অগ্রাধিকার কী কী?

নুজহাত আনোয়ার: আমরা একটি পাঁচ বছর মেয়াদি লক্ষ্য নির্ধারণ করেছি। স্বল্প মেয়াদে অর্থাৎ জুনের মধ্যে শেয়ার নেটিং এবং বছরের শেষের মধ্যে টি+১ সেটেলমেন্ট সাইকেল চালুর চেষ্টা করছি, যা বিদেশি বিনিয়োগ টানতে অত্যন্ত জরুরি। এছাড়া আমাদের লক্ষ্য হলো অক্টোবর নাগাদ ফ্রন্টিয়ার মার্কেট থেকে ইমার্জিং মার্কেটে যাওয়ার ওয়াচলিস্টে অন্তর্ভুক্ত হওয়া। এজন্য সিডিবিএলের সঙ্গে ইন্টিগ্রেশন এবং ডেটা ট্রান্সপারেন্সি বাড়ানো আমাদের প্রধান অগ্রাধিকার। চেষ্টা থাকবে ভালো কোম্পানিকে তালিকাভুক্ত করার কাজটি এগিয়ে নেওয়া। অন্তত এ বছরই যাতে কিছু কোম্পানি তালিকাভুক্ত হয়।

সমকাল: বাজারে অনেক ‘জাঙ্ক’ বা অস্তিত্বহীন কোম্পানি রয়েছে। ইমার্জিং মার্কেটে কী এসব শেয়ারও থাকবে?

নুজহাত আনোয়ার: আমরা ইতোমধ্যে পোর্টফোলিও ক্লিনিংয়ের কাজ শুরু করেছি। যারা বাজারে নয়েজ তৈরি করছে, কিন্তু কোনো অস্তিত্ব নেই, তাদের ডিলিস্টিং করার প্রক্রিয়া নিয়ে কাজ চলছে। কাজটা সহজ নয়, কিন্তু এটা করতেই হবে। আমরা ক্রাইটেরিয়া সেট করছি যে, কারা ফিরে আসার ক্ষমতা রাখে, আর কাদের বাদ দিতে হবে। তবে হঠাৎ করে কিছু না করে আমরা বিনিয়োগকারীদের আগে থেকে সচেতন করতে চাই। তাদের বুঝতে হবে, লিস্টিং যেমন প্রক্রিয়া, ডিলিস্টিংও তেমন স্বাভাবিক প্রক্রিয়া। একজন বিনিয়োগকারী যখন কোনো কোম্পানির শেয়ার কিনছেন, তাকে জানতে হবে তিনি কী কিনছেন। মালিকানা বোধ নিজের মধ্যে সৃষ্টি করতে হবে। এটা শুধু তালিকাভুক্ত কোম্পানি নয়, আইপিওতে আসা কোম্পানির ক্ষেত্রে এটা বেশি দরকার। মনে রাখতে হবে, আপনার কোম্পানি আইন অনুযায়ী না চললে অন্য বিনিয়োগকারীদের ক্ষতি থেকে রক্ষার স্বার্থে আপনার কোম্পানিটিকে তালিকাচ্যুত করা হতে পারে। তাই নিজেই কোম্পানির বিষয়ে খোঁজ রাখুন। অন্তত এমন শেয়ার কেনা থেকে বিরত থাকুন। তাহলেই অনেক কিছু ঠিক হয়ে যাবে।

 সাক্ষাৎকার নিয়েছেন আনোয়ার ইব্রাহীম

আরও পড়ুন

×