সাক্ষাৎকার : সাইফুল ইসলাম
পুঁজিবাজারকেন্দ্রিক অর্থনীতি গড়তে হবে
সাইফুল ইসলাম সভাপতি ডিএসই ব্রোকার্স অ্যাসোসিয়েশন
সমকাল ডেস্ক
প্রকাশ: ২৫ এপ্রিল ২০২৬ | ০৭:১১
| প্রিন্ট সংস্করণ
সমকাল: দেশের শেয়ারবাজারের বয়স কম নয়। এ বাজার নিয়ে কখনোই ভালো কিছু শুনি না। কেন?
সাইফুল ইসলাম: কারণ আমাদের একটি ‘পারসেপশনাল প্রবলেম’ বা উপলব্ধির সমস্যা আছে।
শেয়ারবাজার যেভাবে ব্যবহার করা উচিত, যাদের জন্য এ বাজারটি হওয়া উচিত তা কখনও হয়নি। এই যে বাজারটিকে আমরা সবসময় ‘শেয়ারবাজার’ বলি, কিন্তু কখনও ‘পুঁজিবাজার’ বলি না। আদতে এ বাজারটি হওয়ার কথা ছিল উদ্যোক্তাদের পুঁজির জোগান দেওয়ার একটি মাধ্যম। আমরা এটিকে কেবল একটি ট্রেডিং প্ল্যাটফর্ম হিসেবে ব্যবহার করছি। পুঁজি সংগ্রহের প্ল্যাটফর্ম হয়নি। ভালো শেয়ার আসেনি। ভালো বিনিয়োগকারী তৈরি হয়নি। তালিকাভুক্ত কোম্পানির প্রায় অর্ধেক কোম্পানি ‘রটেন’ বা পচা। অনেকগুলোর অস্তিত্ব নেই। বিনিয়োগকারীরা অর্থ লগ্নি করে এসব শেয়ার থেকে কী পাবে? ১৯৯৬ ও ২০১০ সালের ধসে লাখ লাখ মানুষ পুঁজি হারিয়েছে। বহু তদন্ত হয়েছে। কারও সাজা হয়নি। ফলে ভালো কথা কীভাবে শুনবেন।
সমকাল: আপনি বলছেন, জেনেশুনে অস্তিত্বহীন কোম্পানির শেয়ার লেনদেন হচ্ছে। এটা কি বিনিয়োগকারীদের সঙ্গে প্রতারণা নয়?
সাইফুল ইসলাম: অবশ্যই। এটি একটি প্রচণ্ড অস্বস্তিকর বাস্তবতা। পৌনে ৪০০ কোম্পানির মধ্যে প্রায় ১০০টির অস্তিত্ব নেই, অথচ আমরা জেনেশুনেই তাদের ট্রেড করতে দিচ্ছি। এটি কোনো অনিচ্ছাকৃত ভুল নয়, বরং জ্ঞাতসারে করা একটি অপরাধ, যার মাধ্যমে নির্দিষ্ট কিছু মানুষকে অনৈতিক সুবিধা নেওয়ার সুযোগ করে দেওয়া হচ্ছে। আবার শেয়ারহোল্ডারদের মধ্যে কোম্পানির মালিকানাবোধ সৃষ্টি হয়নি। ফলে তারা কেবল শেয়ার কেনেন, পেছনে কিছু আছে কী নেই, তা খোঁজেন না। আমরা ময়লাগুলোকে কার্পেটের নিচে লুকিয়ে রেখে ওপরটা পরিষ্কার দেখাতে চাইছি। এভাবে একটি বাজার চলতে পারে না। এটিও বিএসইসি, স্টক এক্সচেঞ্জ এবং আমাদের মতো মধ্যস্থতাকারীদের একটি সম্মিলিত ব্যর্থতা।
সমকাল: কোম্পানির ব্যালান্সশিট নিয়েও গুরুতর অভিযোগ আছে বলে শোনা যায়। তাহলে বিনিয়োগকারীরা কোন তথ্যের ওপর ভিত্তি করে বিনিয়োগ করছেন?
সাইফুল ইসলাম: এটা বাজারের মূল সমস্যা। বিনিয়োগকারীরা তো আর রংপুরের ফ্যাক্টরিতে গিয়ে দেখে আসবে না সেখানে কী হচ্ছে; তাদের ভরসা করতে হয় প্রকাশিত আর্থিক প্রতিবেদনের ওপর। বর্তমানে অনেক কোম্পানির ব্যালান্সশিট ভুয়া এবং অনৈতিক তথ্যে ভরপুর। অডিটরদের মান অত্যন্ত নিম্নমুখী। এমন কোনো পরীক্ষার ব্যবস্থা নেই; যা এই রিপোর্টগুলোকে চ্যালেঞ্জ করবে। যখন তথ্যের ভিত্তিই ভুল হয়, তখন বিনিয়োগকারীদের সুরক্ষা কেবল কাগজে-কলমেই সীমাবদ্ধ থাকে।
সমকাল: গত দুই বছর আইপিওবাজার শূন্য। কেন?
সাইফুল ইসলাম: এমন একটা অবস্থা বিশ্বের আর কোনো শেয়ারবাজারে পাওয়া যাবে কিনা, তা আমার অন্তত জানা নেই। অথচ বাংলাদেশে এটিই বাস্তবতা। নীতিনির্ধারকদের এ নিয়ে কোনো মাথাব্যথা নেই। এখানে কমিশন আইপিওর ক্ষেত্রে বিনিয়োগকারীদের ‘গ্যারান্টেড রিটার্ন’ নিশ্চিত করার দায়িত্ব নিজের কাঁধে নিয়েছে, যা তাদের কাজ নয়। একজন উদ্যোক্তা ১০-১৫ বছর পরিশ্রম করে একটি কোম্পানি দাঁড় করানোর পর যখন আইপিওতে আসতে চান, তাঁকে তাঁর ন্যায্যমূল্য দেওয়া হয় না। বিনিয়োগকারী সুরক্ষার নামে উদ্যোক্তাদের নিরুৎসাহিত করা হচ্ছে। এমন আইন করা হয়েছে, যার ফলে কেউ এ বাজারে আসতে চাইছে না। যেমন–এখন পর্যন্ত দেশের অর্থনীতি পুরোপুরি ব্যাংকনির্ভর। যখন কোনো কোম্পানির উদ্যোক্তার নতুন করে পুঁজির দরকার নেই, উচ্চ সুদের ঋণ শোধে আইপিওতে আসতে চায়, আইন তা অনুমোদন করে না। অংশীজনদের কথা এবং বাজার বাস্তবতা বিবেচনায় নিয়ে আইন না করলে এমনই হবে। বিএসইসির নীতির কারণে ভালো কোম্পানি না এসে এমন সব কোম্পানি আসছে যাদের লক্ষ্য বাজার থেকে টাকা সরানো, দীর্ঘমেয়াদি পুঁজি সংগ্রহ নয়।
সমকাল: অতীতে সরকারগুলো নিজেদের পুঁজিবাজারবান্ধব দাবি করেছে। তারপরও এ অবস্থা কেন? বর্তমান পরিস্থিতিতে সরকারের ভূমিকা কী হওয়া উচিত?
সাইফুল ইসলাম: বিগত ১৭-১৮ বছর সরকার মুখে পুঁজিবাজারের কথা বললেও কাজে এর উল্টোটা করেছে। কমিশনকে বিপুল ক্ষমতা দেওয়া থাকলেও তারা তা প্রয়োগ করেনি। এখন ‘আউট অফ দ্য বক্স’ চিন্তা করতে হবে। এনবিআর, বাংলাদেশ ব্যাংক এবং অর্থ মন্ত্রণালয়কে সমন্বিতভাবে কাজ করতে হবে; যাতে ভালো কোম্পানিগুলো বাজারে আসতে বাধ্য হয়। ব্যাংক থেকে ইচ্ছামতো ঋণ নেওয়ার পথ বন্ধ করে ইক্যুইটি রেশিও ঠিক করে দিতে হবে, যাতে উদ্যোক্তারা বাজারের দিকে ঝুঁকতে বাধ্য হয়। সরকারকে এমন নীতি করতে হবে এবং বলতে হবে– কারও দীর্ঘমেয়াদি পুঁজি লাগলে পুঁজিবাজারে যাও, বন্ড ইস্যু কর বা শেয়ার বেচ। চলতি মূলধনের জন্য ব্যাংকে যাও। জনগণের সঙ্গে বড় ব্যবসা করে এমন কোম্পানিকে ‘পাবলিক এনটিটি’ ঘোষণা করে সেগুলোকে শেয়ারবাজারে আসার নীতি করতে হবে। এ নীতি না করা পর্যন্ত দেশের আর্থিক সুশাসন আসবে না, বর্তমান অবস্থারও বদল হবে না। সরকারি কোম্পানির শেয়ার ছাড়তে হবে। প্রকল্প বাস্তবায়নে বন্ড ইস্যু করতে হবে। সরকার নিজে পুঁজিবাজার ব্যবহার না করে বেসরকারি খাতকে ব্যবহার করতে বললে ফল আসবে না।
সমকাল: এখন পর্যন্ত ৮০ লাখ বিও অ্যাকাউন্ট খোলা হলেও সক্রিয় মাত্র ১৬ লাখ। এ পরিস্থিতির কারণ কী?
সাইফুল ইসলাম: মানুষ কেবল লোকসানের কারণে শেয়ারবাজার ছাড়ে না। এখানে বড় সমস্যা হলো জালিয়াতি। বিনিয়োগকারী যখন দেখে সেখানে জালিয়াতি হচ্ছে, কেন সে এখানে থাকবে। মার্কেট ইন্টারমিডিয়েটরি, মার্চেন্ট ব্যাংক এবং স্টক এক্সচেঞ্জের কিছু অসাধু চক্র মিলে বিনিয়োগকারীদের সর্বস্বান্ত করেছে। প্রায় ৫০ লাখ বিনিয়োগকারী বাজার থেকে চলে গেছে, কারণ আস্থার জায়গাটি খুঁজে পাচ্ছে না।
সমকাল: দেশের ব্যাংক খাত এখন গভীর সংকটে। আপনি কি মনে করেন এই সংকট পুঁজিবাজারের জন্য কোনো সুযোগ তৈরি করছে?
সাইফুল ইসলাম: বাংলাদেশে ব্যাংক খাতের মাধ্যমে অর্থনীতি চালানোর চ্যাপ্টার প্রায় শেষ। হাতেগোনা কয়েকটি ব্যাংক বাদে বাকিগুলো সংকটে এবং মানুষের আস্থা হারিয়েছে। এখন আর সরকারের সামনে কোনো বিকল্প নেই। টিকে থাকতে হলে ‘ক্যাপিটাল মার্কেট ড্রিভেন ইকোনমি’ বা পুঁজিবাজারকেন্দ্রিক অর্থনীতির দিকে যেতেই হবে। এটিই এখন একমাত্র বাস্তবমুখী পথ।
সাক্ষাৎকার নিয়েছেন আনোয়ার ইব্রাহীম
- বিষয় :
- সাক্ষাৎকার
