প্রকল্পে বিদেশি ঋণনির্ভরতা বেড়েছে
সমকাল প্রতিবেদক
প্রকাশ: ০৯ মে ২০২৬ | ০৭:২৫
| প্রিন্ট সংস্করণ
গত পাঁচ অর্থবছরে সরকারের প্রকল্প বাস্তবায়নে বৈদেশিক ঋণ-অনুদাননির্ভরতা কিছুটা বেড়েছে। কমেছে অভ্যন্তরীণ সম্পদ ব্যবহারের হার। গত ২০২০-২১ অর্থবছরের সংশোধিত বার্ষিক উন্নয়ন কর্মসূচিতে (এডিপি) মোট বরাদ্দের মধ্যে প্রকল্প ঋণ-অনুদান হিসেবে বরাদ্দ ছিল ৩০ দশমিক ১০ শতাংশ অর্থ। গত ২০২৪-২৫ অর্থবছরে এ হার বেড়ে হয়েছে ৩৫ দশমিক ৮১ শতাংশ।
পরিকল্পনা মন্ত্রণালয়ের বাস্তবায়ন পরিবীক্ষণ ও মূল্যায়ন বিভাগের (আইএমইডি) এক প্রতিবেদন থেকে এ তথ্য পাওয়া গেছে। ২০২৪-২৫ অর্থবছরের বার্ষিক উন্নয়ন কর্মসূচি বাস্তবায়ন অগ্রগতি পর্যালোচনা শীর্ষক প্রতিবেদনটি সম্প্রতি প্রকাশ করা হয়।
আইএমইডির প্রতিবেদনের তথ্য বিশ্লেষণে দেখা যায়, গত পাঁচ অর্থবছরের মধ্যে শুধু ২০২২-২৩ অর্থবছর সংশোধিত এডিপির মোট বরাদ্দের মধ্যে প্রকল্প ঋণ-অনুদান হিসেবে বরাদ্দ অর্থের হার আগের অর্থবছরের তুলনায় সামান্য কমে যায়। এ ছাড়া বাকি চার অর্থবছরে এ হার বেড়েছে।
২০২২-২৩ অর্থবছরে এটি ছিল মোট বরাদ্দের ৩১ দশমিক ৪৯ শতাংশ। এর পরের অর্থবছরের এটি আবার বাড়ে। ২০২৩-২৪ অর্থবছরে এ হার বেড়ে হয় ৩২ দশমিক ৮২ শতাংশ। পরের অর্থবছরে তা আরও বেড়েছে।
অন্যদিকে উন্নয়ন প্রকল্প বাস্তবায়নে অভ্যন্তরীণ সম্পদের হার কিছুটা কমে এসেছে। গত ২০২০-২১ অর্থবছরের সংশোধিত এডিপিতে মোট বরাদ্দের ৬৯ দশমিক ৯০ শতাংশ দেওয়া হয় অভ্যন্তরীণ সম্পদ থেকে। ২০২৪-২৫ অর্থবছরে এ হার কমে হয়েছে ৬৪ দশমিক ১৯ শতাংশ।
প্রসঙ্গত, আইএমইডির প্রতিবেদন প্রকল্প বাস্তবায়নে ঋণ-অনুদানের নির্ভরতার যে কথা বলা হয়েছে, সেটি মূলত ঋণ নির্ভরতা। কারণ, বর্তমানে সরকারের উন্নয়ন প্রকল্পগুলোতে বৈদেশিক ঋণ-অনুদানের প্রায় পুরোটাই মূলত ঋণ। অনুদান খুবই সামান্য। অর্থনৈতিক সম্পর্ক বিভাগের (ইআরডি) তথ্যমতে, গত ২০২৪-২৫ অর্থবছরে উন্নয়ন সহযোগীদের কাছ থেকে যে অর্থ ছাড় হয়েছিল তার ৯০ দশমিক ৬৭ শতাংশই ছিল ঋণ। মাত্র ৯ দশমিক ৩৩ শতাংশ ছিল অনুদান।
স্বাধীনতার ঠিক পরের সময়টাতে যুদ্ধবিধ্বস্ত দেশ পুনর্গঠনের স্বার্থে ও দারিদ্র্য পরিস্থিতি বিবেচনায় ঋণের তুলনায় অনুদানই বেশি পাওয়া যেত উন্নয়ন সহযোগীদের কাছ থেকে। ১৯৭১-৭২ সালে বিদেশি সহায়তার ৯০ দশমিক ৫ শতাংশই ছিল অনুদান। ঋণ ছিল মাত্র ৯ দশমিক ৫০ শতাংশ। এ ছাড়া স্বাধীনতার পর উন্নয়ন প্রকল্পের বেশির ভাগ ছিল বিদেশি অনুদান বা ঋণনির্ভর।
ধীরে ধীরে এই পরিস্থিতির পরিবর্তন হয়েছে। বিদেশি সহায়তায় ঋণের অংশ বেড়ে অনুদানের অংশ একেবারে কমে এসেছে। সেই সঙ্গে প্রকল্প বাস্তবায়নেও বিদেশি ঋণ-অনুদানের অংশ কমেছে, বেড়েছে নিজস্ব অর্থায়ন। তবে সাম্প্রতিক কয়েক বছরে উন্নয়ন প্রকল্প বাস্তবায়নে ঋণ নির্ভরতা ফের কিছুটা বাড়তে দেখা গেল।
এদিকে গত ২০২৪-২৫ অর্থবছরে সংশোধিত এডিপির বাস্তবায়নের হার ছিল একেবারেই কম। আইএমইডির প্রতিবেদনে বলা হয়, অর্থবছরটিতে সংশোধিত এডিপির আকার ছিল প্রায় দুই লাখ ২৬ হাজার ১৬৬ কোটি টাকা। এর মধ্যে ব্যয় হয়েছে প্রায় এক লাখ ৫৪ হাজার ১৮৯ কোটি টাকা, যা মোট বরাদ্দের ৬৮ দশমিক ১৮ শতাংশ। সংশোধিত এডিপি বাস্তবায়নের এই হার গত পাঁচ অর্থবছরের মধ্যে সবচেয়ে কম।
এর আগে সংশোধিত এডিপি বাস্তবায়নের হার ছিল ২০২৩-২৪ অর্থবছরে ৮০ দশমিক ৬৩ শতাংশ, ২০২২-২৩ অর্থবছরে ৮৫ দশমিক ১৭ শতাংশ, ২০২১-২২ অর্থছরে ৯২ দশমিক ৭৪ শতাংশ এবং ২০২০-২১ অর্থবছরে ৮২ দশমিক ১১ শতাংশ। গত ২০২০-২১ থেকে ২০২৩-২৪ অর্থবছর পর্যন্ত চার বছরে সংশোধিত এডিপি বাস্তবায়নের গড় হার ছিল ৮৫ শতাংশ।
গত পাঁচ অর্থবছরের সংশোধিত এডিপি বাস্তবায়নের তথ্য পর্যালোচনা করে আইএমইডির প্রতিবেদনে বলা হয়, গত ২০২৪-২৫ অর্থবছরে যে আর্থিক অগ্রগতির হার, তা তার আগের চার অর্থবছরের গড় আর্থিক অগ্রগতির হারের চেয়ে ১৬ দশমিক ৮৫ শতাংশ কম।
গত অর্থবছরে বিভিন্ন প্রকল্পে বাস্তবায়নের হার কম হওয়ার পেছনে সুনির্দিষ্ট কিছু কারণ উল্লেখ করা হয়েছে প্রতিবেদেন। এতে বলা হয়, গত অর্থবছরের শুরুর দিকে রাজনৈতিক পট পরিবর্তনের কারণে নির্বাচিত ঠিকাদারদের অনেকে কাজ অসমাপ্ত রেখে নিরুদ্দেশ হয়। ফলে এ ধরনের ঠিকাদারদের অনেকের কার্যাদেশ বাতিল করে বাকি কাজ শেষ
করার জন্য ফের ঠিকাদার নির্বাচনে বিলম্ব হয়েছে। এতে বার্ষিক পরিকল্পনা অনুযায়ী সব উন্নয়নকাজ না হওয়ায় অর্থ অব্যাহত থেকে যায়।
আবার গত অর্থবছর কিছু ক্ষেত্রে ক্রয় কার্যক্রম ও অর্থ ছাড় সাময়িক স্থগিত থাকার জন্য অর্থ ব্যয় করা সম্ভব হয়নি। অনেক ক্ষেত্রে সংশোধিত এডিপি বা আরএডিপিতে অন্তর্ভুক্ত কিছু প্রকল্প অসমাপ্ত রেখে সমাপ্ত ঘোষণা করায় ব্যয় কম হয়েছে। কোনো কোনো প্রকল্পের কাজ ছয় মাসও বন্ধ ছিল।
- বিষয় :
- প্রকল্প
