অভিমত
কৃষি-প্রতিবেশভিত্তিক চাষাবাদে বদলে যাচ্ছে ফরিদপুরের চর
জিয়াউর রহমান
জিয়াউর রহমান
প্রকাশ: ১২ সেপ্টেম্বর ২০২৬ | ০৭:৫১
| প্রিন্ট সংস্করণ
একসময় অনুর্বর বালুময় জমি, কম ফসল আর দারিদ্র্যের জন্য পরিচিত ছিল ফরিদপুরের চরাঞ্চল। সেই জনপদেই এখন নীরবে ঘটছে এক ইতিবাচক পরিবর্তন। পরিবেশবান্ধব কৃষি পদ্ধতির হাত ধরে বদলে যাচ্ছে জমি, কৃষি আর মানুষের জীবন।
ফরিদপুরের নর্থ চ্যানেলসহ আশপাশের চরগুলোতে শত শত কৃষক এখন কৃষি-প্রতিবেশভিত্তিক (এগ্রো-ইকোলজিক্যাল) চাষাবাদে যুক্ত হয়েছেন। এই পদ্ধতি অনুর্বর জমির উর্বরতা ফিরিয়ে আনছে, বাড়াচ্ছে ফসলের বৈচিত্র্য এবং সৃষ্টি করছে নতুন আয়ের সুযোগ।
প্রচলিত একমুখী কৃষির পরিবর্তে কৃষকরা এখন মিশ্র সবজি চাষ, সঙ্গী ফসল চাষ, শস্য পর্যায়ক্রম, ভার্মি কম্পোস্ট, জৈব সার এবং সৌরশক্তিচালিত সেচ ব্যবস্থা ব্যবহার করছেন। এতে রাসায়নিক সারের ওপর নির্ভরতা কমছে, মাটির স্বাস্থ্য উন্নত হচ্ছে এবং সারাবছর বিভিন্ন ধরনের ফসল উৎপাদন সম্ভব হচ্ছে। ফলে কৃষি যেমন লাভজনক হচ্ছে, তেমনি জলবায়ু পরিবর্তনের বিরূপ প্রভাব মোকাবিলাও সহজ হচ্ছে।
এই পরিবর্তনের অন্যতম উদাহরণ নর্থ চ্যানেল চরের ৫৫ বছর বয়সী কৃষক মজিবর মোল্লা। কয়েক বছর আগেও বালুময় জমিতে চাষ করে কোনোমতে সংসার চালাতেন তিনি। কৃষি-প্রতিবেশভিত্তিক চাষাবাদ গ্রহণের পর তাঁর জীবনে আসে বড় পরিবর্তন। মাত্র কয়েক বিঘা জমি নিয়ে তিন বছর আগে যাত্রা শুরু করেছিলেন মজিবর। ধীরে ধীরে খামারের পরিধি বাড়িয়েছেন। এখন তাঁর খামার টেকসই ও বহুমুখী সবজি চাষের একটি সফল মডেল। মজিবর মোল্লা বলেন, ‘আগে অল্প কিছু জমিতে চাষ করতাম। সংসার চালানোই ছিল কঠিন। এখন বছরে প্রায় ১২ লাখ টাকা আয় করি। আগে একই জমি থেকে আয় হতো মাত্র ৪ থেকে ৫ লাখ টাকা।’
শুধু আয়ই বাড়েনি, বেড়েছে জমির উৎপাদন ক্ষমতাও। আগে যেখানে বছরে দুটি ফসল হতো, এখন সেখানে চার থেকে পাঁচটি ফসল উৎপাদিত হচ্ছে। যে জমি থেকে আগে বছরে ৪০ থেকে ৫০ হাজার টাকা আয় হতো, এখন সেই জমিতেই বিভিন্ন ধরনের সবজি চাষ করে বছরে এক থেকে দেড় লাখ টাকা পর্যন্ত আয় হচ্ছে। মজিবর মোল্লা একা নন। চরাঞ্চলের বহু কৃষকের জীবনে এসেছে একই রকম পরিবর্তন।
স্থানীয় উন্নয়ন সংস্থা আমরা কাজ করি (একেকে)-এর নির্বাহী পরিচালক এম. এ. জলিল বলেন, ‘এটি একজন বা দুজন কৃষকের সাফল্যের গল্প নয়। চরাঞ্চলের নানা প্রান্তে এখন এমন অনেক উদাহরণ তৈরি হচ্ছে। কৃষি-প্রতিবেশভিত্তিক চাষাবাদ বদলে দিচ্ছে মানুষের জীবন, বদলে দিচ্ছে পুরো চরাঞ্চলের কৃষি ব্যবস্থা।’
পল্লী কর্ম-সহায়ক ফাউন্ডেশনের (পিকেএসএফ) রুরাল মাইক্রোএন্টারপ্রাইজ ট্রান্সফরমেশন প্রজেক্ট (আরএমটিপি)-এর আওতায় একেকে এই কর্মসূচি বাস্তবায়ন করছে। এর লক্ষ্য নিরাপদ সবজি উৎপাদন, উচ্চমূল্যের ফসল চাষ, বাজারে প্রবেশের সুযোগ বাড়ানো এবং প্রান্তিক কৃষকদের জলবায়ু-সহনশীল ও পরিবেশবান্ধব কৃষি পদ্ধতির সঙ্গে যুক্ত করা।
সম্প্রতি চরাঞ্চল ঘুরে দেখা যায়, কৃষকেরা মিষ্টি কুমড়া, আলু, গাজর, পেঁয়াজ, রসুন, বাঁধাকপিসহ নানা ধরনের সবজি চাষ করছেন। একটি ফসলের ওপর নির্ভর না করে তারা এখন সারাবছর মৌসুমি বিভিন্ন সবজি উৎপাদন করছেন। সঙ্গী ফসল চাষের মাধ্যমে একই জমিতে একাধিক ফসল উৎপাদন করা হচ্ছে। এতে প্রাকৃতিকভাবেই পোকামাকড়ের আক্রমণ কমে, মাটির উর্বরতা বজায় থাকে এবং সূর্যালোক ও জমির সর্বোত্তম ব্যবহার নিশ্চিত হয়।
চরাঞ্চলে ধীরে ধীরে ধাননির্ভর কৃষির জায়গা নিচ্ছে সবজি চাষ। কারণ সবজিতে সেচের প্রয়োজন কম, দ্রুত ফলন পাওয়া যায় এবং লাভও অনেক বেশি। যেখানে এক বিঘা জমিতে ধান, গম বা ডাল চাষ করে প্রায় ৩০ হাজার টাকা আয় হয়, সেখানে সবজি চাষে আয় হয় প্রায় এক লাখ টাকা। নিরাপদ ও বিষমুক্ত খাদ্যের ক্রমবর্ধমান চাহিদাও কৃষকদের এই পরিবর্তনে উৎসাহিত করছে। অনেক কৃষি উদ্যোক্তা এখন ভার্মি কম্পোস্ট, জৈব সার, জৈব বালাইনাশক এবং উন্নত মানের সবজির বীজ উৎপাদন করছেন। এমনই একজন উদ্যোক্তা নর্থ চ্যানেলের আনোয়ার হোসেন। অতিরিক্ত রাসায়নিক ব্যবহারে মাটির উর্বরতা কমে যাওয়ায় তিনি জৈব কৃষির দিকে ঝুঁকেন। আরএমটিপি প্রকল্পের প্রশিক্ষণ নিয়ে এখন তিনি প্রতি মাসে কয়েক টন ভার্মি কম্পোস্ট উৎপাদন করছেন। আনোয়ার বলেন, ‘শুরুতে আশপাশের বাড়ি থেকে গোবর, গমের খড় আর ভুট্টাগাছ সংগ্রহ করতাম। সেগুলো পচিয়ে কেঁচো ছেড়ে দিতাম। কিছুদিন পর সেগুলো পুষ্টিসমৃদ্ধ জৈব সারে পরিণত হতো। শুরুটা কঠিন ছিল। এখন আমরা ছোট একটি দল নিয়ে বাণিজ্যিকভাবে ভার্মি কম্পোস্ট উৎপাদন করছি। এ ব্যবসা এখন আমাদের পরিবারের প্রধান আয়ের উৎস।’
ফরিদপুরের চরাঞ্চলের এই পরিবর্তন কেবল কয়েকজন সফল কৃষক বা কৃষি উদ্যোক্তার গল্প নয়। এটি একটি জনপদের ঘুরে দাঁড়ানোর গল্প। স্থানীয় জ্ঞান, উদ্ভাবনী উদ্যোগ এবং পরিবেশবান্ধব কৃষি পদ্ধতির সমন্বয়ে বদলে যাচ্ছে কৃষি, বাড়ছে আয় এবং ফিরছে মানুষের স্বপ্ন। একসময় অনুর্বরতা ও দারিদ্র্যের প্রতীক ছিল যে চরগুলো, আজ সেগুলোই টেকসই কৃষি ও গ্রামীণ সমৃদ্ধির উজ্জ্বল উদাহরণ হয়ে উঠছে।
লেখক: জ্যেষ্ঠ সাংবাদিক
- বিষয় :
- অভিমত