১৩ ব্যাংকে খেলাপি ঋণের হার ৫ শতাংশের কম
ছবি- এআই দিয়ে তৈরি
ওবায়দুল্লাহ রনি
প্রকাশ: ১২ সেপ্টেম্বর ২০২৬ | ০৭:৫৫ | আপডেট: ১২ সেপ্টেম্বর ২০২৬ | ০৯:৪৬
| প্রিন্ট সংস্করণ
খেলাপি ঋণ কমাতে বিভিন্ন নীতি সহায়তা দিয়েও তেমন ফল আসছে না। অনিয়ম-দুর্নীতির ঋণ আদায় না হওয়ায় খেলাপি ঋণের হারে এখন বিশ্বের শীর্ষে রয়েছে বাংলাদেশ। সামগ্রিক ব্যাংক খাতের এমন চিত্র দেখা গেলেও কিছু ব্যাংক রয়েছে অনেক ভালো অবস্থানে। দেশীয় ৫২টি ব্যাংকের মধ্যে ১৩টির খেলাপি রয়েছে ৫ শতাংশের নিচে। এ তালিকার সবই বেসরকারি খাতের ব্যাংক। এ যেন শীর্ষ খেলাপি ঋণের দেশে সর্বনিম্ন খেলাপির ব্যাংক।
দেশে মোট ব্যাংক এখন ৬১টি। ব্যাংকগুলোর খেলাপি ঋণ বেড়ে গত জুন শেষে হয়েছে ছয় লাখ ছয় হাজার ৫৫৫ কোটি টাকা, যা মোট বিতরণকৃত ঋণের ৩২ দশমিক ৭৮ শতাংশ হয়েছে। এর মধ্যে রাষ্ট্রীয় মালিকানার বাণিজ্যিক ব্যাংগুলোতে রয়েছে এক লাখ ৫২ হাজার ৪৬৪ কোটি টাকা। এসব ব্যাংকের মোট ঋণের যা ৪৭ দশমিক ৩০ শতাংশ। বেসরকারি খাতের ব্যাংকগুলোর খেলাপি চার লাখ ৩৩ হাজার ৭০৪ কোটি টাকা, যা ৩০ দশমিক ৭৪ শতাংশ। বিশেষায়িত ব্যাংকে ১৬ হাজার ৯০৫ কোটি টাকা বা ৩৬ দশমিক ২১ শতাংশ। আর বিদেশি ব্যাংকের খেলাপি তিন হাজার ৪৮১ কোটি টাকা, যা ৪ দশমিক ৯৪ শতাংশ।
ব্যাংকাররা জানান, খেলাপি ঋণ কমাতে নানা ছাড় দিচ্ছে কেন্দ্রীয় ব্যাংক। বিশেষ করে দুই বছরের গ্রেস পিরিয়ডসহ ১৫ বছরের জন্য পুনঃতপশিল, সুদ মওকুফ করে হলেও ঋণ আদায়, বন্ধ কারখানা সচল করতে কম সুদে ঋণের ব্যবস্থাসহ নানা উদ্যোগ চলমান আছে। তবে খেলাপি কমছে না। কেননা, খেলাপি হওয়া এসব ঋণের বড় অংশই বিগত সরকারের সময়ে সৃষ্ট। ঋণ জালিয়াতিতে আলোচিত এস আলম, বেক্সিমকো, সিকদার, নাসা, অ্যাননটেক্স, হলমার্ক, মাইশা, ক্রিসেন্ট লেদার এবং সাইফুজ্জামান চৌধুরী জাভেদ, সাদ মুসাসহ বিভিন্ন ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠান নামে-বেনামে ঋণ নিয়ে আত্মসাৎ করা হয়েছে। বেশির ভাগ ক্ষেত্রে তা পাচার করেছেন। এসব ঋণের বিপরীতে বন্ধকি সম্পত্তি নেই। যে কারণে এসব ঋণ আদায়ের তেমন সম্ভাবনা নেই। আবার অর্থঋণ আদালতে দ্রুত মামলা নিষ্পত্তিতে দীর্ঘসূত্রতা রয়েছে। ফলে যাদের বন্ধকি সম্পত্তি রয়েছে, তা বিক্রি করে ঋণ আদায় হয় খুব কম। এখন খেলাপি ঋণ কিনে নেওয়ার জন্য কোম্পানি গঠনের একটি আইন হচ্ছে। একই সঙ্গে ঋণ অবলোপনে জোর দিচ্ছে কেন্দ্রীয় ব্যাংক।
৫ শতাংশের নিচে ১৩ ব্যাংকের খেলাপি
আওয়ামী লীগের সময়ে ২০২২ সালে দেশে বৈদেশিক মুদ্রার চরম সংকট তৈরি হয়। ডলার সংকট মেটাতে আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিলের (আইএমএফ) সঙ্গে ৪৭০ কোটি ডলারের (পরবর্তী সময় যা বেড়ে ৫৫০ কোটি ডলার) ঋণচুক্তি করে বাংলাদেশ। ওই কর্মসূচির অন্যতম শর্ত ছিল, ২০২৬ সালের জুনের মধ্যে বেসরকারি খাতের ব্যাংকগুলোর খেলাপি ঋণ ৫ শতাংশের নিচে এবং সরকারি ব্যাংকের খেলাপি ঋণ ১০ শতাংশের নিচে নামাতে হবে। এটা হবে সব ধরনের নীতি সহায়তার বাইরে। এর মধ্যে আওয়ামী লীগ সরকারের পতন হয়েছে। অন্তর্বর্তী সরকার দায়িত্ব নিয়ে খেলাপি ঋণের আসল চিত্র দেখানোর ওপর জোর দেয়। ফলে তা না কমে মোট ঋণের এক-তৃতীয়াংশ এখন খেলাপিতে পরিণত হয়েছে। ২০২৩ সালে যেখানে মোট ঋণের মাত্র ৯ শতাংশ খেলাপি দেখানো হচ্ছিল।
বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, খেলাপি ঋণের এই খারাপ পরিস্থিতির মধ্যেও অনেক ব্যাংক ভালো অবস্থানে রয়েছে। খেলাপি ঋণ ৫ শতাংশের নিচে রয়েছে ১৩টি ব্যাংকের। মন্দ ঋণ কম থাকার দিক দিয়ে এখন সবচেয়ে ভালো অবস্থানে রয়েছে ব্র্যাক ব্যাংক। গত জুন পর্যন্ত ব্যাংকটির মাত্র এক হাজার ৫৪৮ কোটি টাকা বা ২ দশমিক শূন্য ৫ শতাংশ খেলাপি। এর পরের অবস্থানে রয়েছে পূবালী ব্যাংক। ব্যাংকটির মাত্র এক হাজার ৭৮৯ কোটি টাকা বা ২ দশমিক ৪৬ শতাংশ খেলাপি। বেসরকারি খাতের অন্যতম আরেক ব্যাংক প্রাইমের খেলাপি মাত্র ৯৪৮ কোটি টাকা বা ২ দশমিক ৭৪ শতাংশ।
সিটি ব্যাংকের এক হাজার ৫১৪ কোটা টাকা বা মোট ঋণের ২ দশমিক ৭৯ শতাংশ, ইস্টার্ন ব্যাংকের এক হাজার ৫২০ কোটি টাকা বা ৩ দশমিক ২৮ শতাংশ খেলাপি। কম খেলাপির বিবেচনায় এর পরের অবস্থানে থাকা যমুনা ব্যাংকের ৫৩৩ কোটি টাকা বা ৩ দশমিক ৩৫ শতাংশ, এনসিসি ব্যাংকের এক হাজার ১২৩ কোটি টাকা বা ৪ দশমিক ১৯ শতাংশ, উত্তরা ব্যাংকের এক হাজার ৭৭ কোটি টাকা বা ৪ দশমিক ৩৬ শতাংশ এবং শাহ্জালাল ইসলামী ব্যাংকের এক হাজার ৪৮৫ কোটি টাকা বা ৪ দশমিক ৮২ শতাংশ মাত্র খেলাপি।
নতুন একটি ব্যাংক শূন্য খেলাপি ঋণ নিয়ে যাত্রা শুরু করে। আবার একটি ঋণখেলাপি হতে সময় লাগে। যে কারণে নতুন ব্যাংকের খেলাপি কম থাকা স্বাভাবিক। নতুন চারটি ব্যাংকের খেলাপি ঋণ ৫ শতাংশের কম রয়েছে। ব্যাংকগুলোর মধ্য কমিউনিটি ব্যাংকের খেলাপি পাঁচ কোটি ৩৩ লাখ টাকা, যা মোট ঋণের মাত্র শূন্য দশমিক ৩৩ শতাংশ। সিটিজেন ব্যাংকের ১৬৩ কোটি টাকা বা ২ দশমিক ৬৫ শতাংশ, বেঙ্গল কমার্শিয়াল ব্যাংকের ৮৩ কোটি টাকা বা ৪ দশমিক শূন্য ৭ শতাংশ এবং সীমান্ত ব্যাংকের ১৩৪ কোটি টাকা বা ৪ দশমিক ৮৮ শতাংশ খেলাপিতে পরিণত হয়েছে। এর বাইরে বিদেশি ৯ ব্যাংকের মধ্যে ন্যাশনাল ব্যাংক অব পাকিস্তান ও এইচএসবিসি ব্যাংক ছাড়া বাকি সাতটির খেলাপি ৫ শতাংশের নিচে।
মূলত কিছু ব্যাংকের খুব খারাপ অবস্থার কারণে বাংলাদেশ এখন বিশ্বের সর্বোচ্চ হারের খেলাপি ঋণের দেশ। ব্যাংকাররা জানান, খেলাপি ঋণ কমাতে নানা চাপ রয়েছে। আর এ ক্ষেত্রে ঋণ পুনঃতপশিলের মাধ্যমে আদায় বাড়ানোর ওপর জোর দেওয়া হচ্ছ বেশি। এ জন্য একের পর এক ছাড় দিচ্ছে কেন্দ্রীয় ব্যাংক। সব শেষ ১৫ বছরের জন্য ঋণ পুনঃতপশিলের সুযোগ দেওয়া হয়েছে। ইতোমধ্যে ১০ বছর মেয়াদে বিশেষ পুনঃতপশিল করা ঋণেও নতুন করে দুই বছরের গ্রেস পিরিয়ডসহ ১৫ বছর মেয়াদে নিয়মিত করা যাবে। আয় খাতে নেওয়া সুদ মওকুফ করেও খেলাপি ঋণ আদায় করা যাবে। বন্ধ কারখানা সচল করতে বিশেষ প্রণোদনা তহবিল ঘোষণা করা হয়েছে। তবে কয়েকটি ব্যাংকের উচ্চ খেলাপির কারণে কোনো সুফল মিলছে না। অনিয়ম-জালিয়াতিতে আলোচিত ব্যাংকগুলোই খেলাপি ঋণের শীর্ষে রয়েছে। গত জুন পর্যন্ত খেলাপি ঋণের শীর্ষে থাকা ১০ ব্যাংকে চার লাখ ৩৯ হাজার ৫৩১ কোটি টাকা খেলাপিতে পরিণত হয়েছে। মোট খেলাপি ঋণের যা ৭২ দশমিক ৪৬ শতাংশ। শীর্ষ খেলাপি ঋণের তালিকায় রয়েছে– ইসলামী ব্যাংক বাংলাদেশ, জনতা, এক্সিম, অগ্রণী, এসআইবিএল, আইএফআইসি, ন্যাশনাল ব্যাংক, ইউনিয়ন ও এবি ব্যাংক।
- বিষয় :
- ব্যাংক