এমডি-২
দেশেই হচ্ছে রপ্তানিযোগ্য আনারসের চারা
জাহিদুর রহমান
প্রকাশ: ১২ সেপ্টেম্বর ২০২৬ | ০৭:৫৪
| প্রিন্ট সংস্করণ
রপ্তানির সম্ভাবনাময় এমডি-২ জাতের আনারসের চারা এখন দেশে টিস্যু কালচার প্রযুক্তির মাধ্যমে উৎপাদন করা হচ্ছে। কয়েক বছর আগে যে জাতের চারা বিদেশ থেকে আমদানি করতে হয়েছে, এখন সেই আনারসের রোগমুক্ত ও মানসম্মত চারা দেশের সরকারি টিস্যু কালচার ল্যাবে তৈরি হচ্ছে। ইতোমধ্যে টিস্যু কালচার ল্যাবে উৎপাদিত ৫৭ হাজার ৬৩৫টি চারা কৃষকদের মধ্যে বিতরণ করা হয়েছে। এ জাতের আনারস চাষের ৩০টি প্রদর্শনীও করা হয়েছে মাঠপর্যায়ে।
কৃষি বিভাগের কর্মকর্তারা বলছেন, এমডি-২ আনারস আন্তর্জাতিক বাজারে পরিচিত ও বাণিজ্যিকভাবে গুরুত্বপূর্ণ একটি জাত। ফলটির আকর্ষণীয় সোনালি-হলুদ শাঁস, বেশি মিষ্টতা, তুলনামূলক কম অম্লতা এবং দীর্ঘ সংরক্ষণ ক্ষমতার কারণে বিশ্ববাজারে এর বেশ চাহিদা রয়েছে। দেশে এ জাতের চারা উৎপাদন ও কৃষকের মধ্যে সম্প্রসারণ করা গেলে ভবিষ্যতে বাণিজ্যিক উৎপাদনের পাশাপাশি রপ্তানির পথও তৈরি হতে পারে।
দেশে প্রচলিত আনারস পাকার পর সাধারণত এক সপ্তাহের মতো ভালো থাকে। অন্যদিকে এমডি-২ প্রায় এক মাস পর্যন্ত সংরক্ষণ করা যায়। ফলে দেশের বিভিন্ন প্রান্তে সরবরাহের পাশাপাশি রপ্তানির জন্যও এটি তুলনামূলক সুবিধাজনক।
এমডি-২ আনারসের উৎপত্তি যুক্তরাষ্ট্রের হাওয়াইয়ে। পরে কোস্টারিকায় ব্যাপক বাণিজ্যিক উৎপাদনের মাধ্যমে এটি বিশ্ববাজারে ছড়িয়ে পড়ে। বর্তমানে ফিলিপাইনও এ জাতের অন্যতম বড় উৎপাদক ও রপ্তানিকারক। পাকা ফলে সাধারণত ১৪ থেকে ১৭ ব্রিক্স পর্যন্ত দ্রবণীয় শর্করা পাওয়া যায়। বাণিজ্যিকভাবে দেড় থেকে আড়াই কেজি ওজনের ফল পাওয়া যায়। এই আনারসের ‘চোখ’ অগভীর হওয়ায় ফল কাটাও তুলনামূলক সহজ এবং খাওয়ার উপযোগী অংশ বেশি।
কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের টিস্যু কালচার ল্যাবরেটরি কাম হর্টিকালচার সেন্টার স্থাপন ও উন্নয়ন প্রকল্পের আওতায় মাদারীপুরের মোস্তফাপুর, ময়মনসিংহের কেওয়াটখালী এবং বগুড়ার বনানী হর্টিকালচার সেন্টারের টিস্যু কালচার পরীক্ষাগারে এ জাতের চারা উৎপাদন করা হচ্ছে।
টিস্যু কালচার পদ্ধতিতে নির্বাচিত মাতৃগাছ থেকে নিয়ন্ত্রিত ও জীবাণুমুক্ত পরিবেশে চারা তৈরি করা হয়। ফলে একই বৈশিষ্ট্যের রোগমুক্ত ও মানসম্মত বিপুলসংখ্যক চারা উৎপাদন করা সম্ভব। পরীক্ষাগার থেকে বের করার পর চারাগুলোকে ধাপে ধাপে বাইরের পরিবেশের সঙ্গে খাপ খাওয়ানো হয়। এরপর সেগুলো কৃষকের কাছে দেওয়া হচ্ছে।
কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের টিস্যু কালচার ও হর্টিকালচার উন্নয়ন প্রকল্পের পরিচালক তালহা জুবাইর মাসরুর বলেন, ‘বিশ্ববাজারে এই জাতের পরিচিতি আগে থেকেই রয়েছে। ফলে নতুন করে অচেনা কোনো ফলের বাজার তৈরি করতে হবে না। আমাদের কাজ হচ্ছে বিশ্ববাজারে গ্রহণযোগ্য এই জাতটিকে দেশের কৃষকের কাছে মানসম্মত চারা, প্রযুক্তি ও উৎপাদন ব্যবস্থার মাধ্যমে পৌঁছে দেওয়া।’
তিনি বলেন, ‘কয়েক বছর আগে সরকারি উদ্যোগে এমডি-২-এর চারা বিদেশ থেকে আমদানি করা হয়েছিল। কিন্তু কোনো উন্নত জাতকে দেশে ব্যাপকভাবে ছড়িয়ে দিতে কয়েকশ বা কয়েক হাজার চারা যথেষ্ট নয়। বিপুলসংখ্যক একই বৈশিষ্ট্যের রোগমুক্ত চারা প্রয়োজন। বিদেশ থেকে বারবার চারা আমদানি করলে খরচ বাড়ে এবং একটি জাত দ্রুত সম্প্রসারণ করাও কঠিন হয়ে পড়ে। এ কারণে দেশের বিদ্যমান এমডি-২-এর নির্বাচিত মাতৃগাছ ব্যবহার করে টিস্যু কালচারের মাধ্যমে চারা উৎপাদনের সক্ষমতা গড়ে তোলার ওপর আমরা গুরুত্ব দিয়েছি।’
তালহা জুবাইর মাসরুর আরও বলেন, মাদারীপুরের মোস্তফাপুর, ময়মনসিংহের কেওয়াটখালী ও বগুড়ার বনানী হর্টিকালচার সেন্টারের পরীক্ষাগারে এখন এমডি-২-এর চারা উৎপাদন হচ্ছে। একটি নির্বাচিত মাতৃগাছ থেকে নিয়ন্ত্রিত পরিবেশে দ্রুত বিপুলসংখ্যক চারা তৈরি করা যায়। এসব চারা রোগমুক্ত ও একই বৈশিষ্ট্যের হওয়ায় বাণিজ্যিক উৎপাদনের জন্য এটি খুবই গুরুত্বপূর্ণ। টিস্যু কালচার ল্যাবে তৈরি ৫৭ হাজার ৬৩৫টি এমডি-২ আনারসের চারা ইতোমধ্যে কৃষকদের মধ্যে বিতরণ করা হয়েছে। পাশাপাশি ৩০টি প্রদর্শনী করা হয়েছে।
তিনি বলেন, এমডি-২-এর সঙ্গে বাংলাদেশের প্রচলিত আনারসের প্রতিযোগিতা তৈরি করার প্রয়োজন নেই। স্থানীয় আনারসের স্বাদ, ঘ্রাণ ও নিজস্ব বাজার রয়েছে। এমডি-২-এর লক্ষ্য হতে পারে উচ্চমূল্যের দেশীয় বাজার এবং ভবিষ্যতের রপ্তানি বাজার। ফলটির দীর্ঘ সংরক্ষণ ক্ষমতা রপ্তানির জন্য একটি গুরুত্বপূর্ণ সুবিধা। তবে শুধু জাত ভালো হলেই রপ্তানি করা যাবে না। উৎপাদন থেকে শুরু করে সংগ্রহ, বাছাই, মোড়কজাতকরণ, দ্রুত শীতলীকরণ ও শীতল পরিবহন পর্যন্ত পুরো ব্যবস্থাকে আন্তর্জাতিক মানে নিতে হবে।
তালহা জুবাইর মাসরুরের মতে, মধুপুর এবং পার্বত্য অঞ্চলের মতো যেসব এলাকায় দীর্ঘদিন ধরে আনারস চাষের অভিজ্ঞতা রয়েছে, সেসব এলাকায় উপযুক্ত জমি ও কৃষক নির্বাচন করে এমডি-২-এর পরিকল্পিত উৎপাদন অঞ্চল গড়ে তোলা যেতে পারে। এতে কৃষকেরা বাজারের নিশ্চয়তা পেলে ধীরে ধীরে বাণিজ্যিক উৎপাদনে যেতে পারবেন। ভবিষ্যতে পর্যাপ্ত পরিমাণ ও একই মানের ফল উৎপাদন করা সম্ভব হলে রপ্তানির সুযোগও তৈরি হবে। পার্বত্য অঞ্চল এ ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ হতে পারে। বান্দরবানের বালাঘাটা হর্টিকালচার সেন্টারে স্থাপিত টিস্যু কালচার পরীক্ষাগার চলতি বছর চালুর পরিকল্পনা রয়েছে। এটি চালু হলে বান্দরবান, রাঙামাটি ও খাগড়াছড়ির কৃষকদের কাছাকাছি জায়গায় এমডি-২-এর রোগমুক্ত চারা উৎপাদনের সুযোগ সৃষ্টি হবে।
- বিষয় :
- আনারস