ঢাকা শুক্রবার, ০৪ সেপ্টেম্বর ২০২৬

সাক্ষাৎকার

দায়বদ্ধতার চিহ্ন

দায়বদ্ধতার চিহ্ন
×

ড. মসিউর রহমান

প্রকাশ: ২৪ জুন ২০২২ | ১২:০০

পদ্মা সেতু নিয়ে চিন্তা-ভাবনার শুরু থেকে এ প্রক্রিয়ার সঙ্গে জড়িত ছিলেন প্রধানমন্ত্রীর অর্থনৈতিক বিষয়ক উপদেষ্টা ড. মসিউর রহমান।
একান্ত কথোপকথনে তিনি পদ্মা সেতুর প্রাথমিককালের গুরুত্বপূর্ণ কিছু ঘটনা ও অভিজ্ঞতা তুলে ধরেছেন। সাক্ষাৎকার নিয়েছেন সমকালের ফিচার সম্পাদক মাহবুব আজীজ


সমকাল: পদ্মা সেতু উদ্বোধন হতে যাচ্ছে। এর একেবারে শুরু থেকে আপনি নানানভাবে জড়িত ছিলেন। একদম শুরুর ঘটনাগুলো- বিশ্বব্যাংকের চলে যাওয়া, সেখান থেকে নতুন করে শুরু- আপনার কী মনে পড়ে?
ড. মসিউর রহমান : হ্যাঁ আমার মনে আছে। তবে অনেক ছোট ছোট জিনিস হয়তো মনে নেই। পদ্মা সেতু করার ব্যাপারে চিন্তাভাবনা যখন শুরু হয়, তখন আমরা প্রথমে বিশ্বব্যাংক, এশিয়ান ডেভেলপমেন্ট ব্যাংক- এদেরই প্রথম অনুরোধ করি। কিন্তু এতে অংশগ্রহণ করতে তারা অপারগতা প্রকাশ করে। বিশেষ করে বিশ্বব্যাংক পরিবেশের ওপর প্রভাবের বিষয়টিকে প্রধান করে দেখায়। সেই সঙ্গে কারিগরি প্রযুক্তি ও খরচ অনেক হবে উল্লেখ করে এ প্রকল্পে এগোতে চায়নি। প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা জাপান সফরে পদ্মা সেতু, রূপসা সেতুসহ আরও কয়েকটি প্রকল্পের কথা বললেন। তারা রূপসা সেতু প্রকল্প গ্রহণ করল। পদ্মা সেতুর বিষয়ে বলা হলো- এ নিয়ে পরে মতামত জানানো হবে। কিছুদিন পর জাইকার প্রতিনিধি এলেন। তিনি জিজ্ঞেস করলেন, আমরা পদ্মা সেতু করতে চাই, না কি অন্য কোনো বড় প্রকল্প। আমি তখন অর্থনৈতিক সম্পর্ক বিভাগের সচিব। ১৯৯৮ সালের কথা। আমি এ বিষয়ে জানতে প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ে গেলাম। প্রধানমন্ত্রী তখন সংসদে যাচ্ছিলেন। তিনি বললেন, 'আপনি আমার সঙ্গেই আসেন।' তাঁর গাড়িতে করেই আমাকে নিয়ে গেলেন। সেখানে বসে কথা হয়। তিনি জিজ্ঞেস করলেন, 'আচ্ছা, পদ্মা সেতু হয়ে গেলে আমার বাড়ি টুঙ্গিপাড়া যেতে কতক্ষণ লাগবে?' হিসাব করে বললাম, ৪ থেকে সাড়ে ৪ ঘণ্টা সময় লাগবে। তিনি জিজ্ঞেস করলেন, 'আপনার বাড়িও তো ওইদিকে, আপনার বাড়ি যেতে কতক্ষণ লাগবে?' আমি বললাম, টুঙ্গিপাড়া থেকে দেড় ঘণ্টার মতো সময় লাগবে। তিনি বললেন, 'ভালোই তো হলো, আমরা অল্প সময়ে বাড়ি পৌঁছে যাব।' এটিকে আপাতদৃষ্টিতে মনে হবে খুব তুচ্ছ ঘটনা। কিন্তু তিনি যখন বললেন, মানুষ বিভিন্ন অঞ্চল থেকে রাজধানীতে আসবে। এটা না করে যদি আমরা জনগণের কাছে পৌঁছাই, তাহলে কেমন হয়। জনগণের কাছে পৌঁছানোর এই যে আকাঙ্ক্ষা, এটা রাজনীতির এক বড় পাওয়া।
সমকাল: এটা তো ১৯৯৮ সালের কথা। পরবর্তী সরকার কী এ প্রকল্পটি বাতিল করেছিল?
ড. মসিউর রহমান : এর পরের ঘটনা আমি ঠিক জানি না। তবে কোনো বড় প্রকল্প নিয়ে কাজ শুরু হলে তা মনেপ্রাণে গ্রহণ না করলেও সরকার পরিবর্তন হলেই তা পুরোপুরি বাদ দেওয়া হয় না। তাই ধারণা করা যায় যে, আলোচনা চলেছিল। তবে নিষ্ঠা বা কমিটমেন্টের সঙ্গে সেটিকে এগিয়ে নেওয়া হয়নি। তত্ত্বাবধায়ক সরকার সম্ভবত নতুন করে কোনো বড় প্রকল্প হাতে নিতে চায়নি।
সমকাল: ২০০৮ সাল পর্যন্ত কতটুকু এগিয়েছিল আলোচনা?
ড. মসিউর রহমান : খুব একটা এগোয়নি।
সমকাল: আপনি কি তখন সরকারি চাকরিতে ছিলেন?
ড. মসিউর রহমান : ২০০১ সালের অক্টোবরে আমার চাকরি শেষ হয়।
সমকাল: সরকারিভাবে চাকরি শেষ হয়, নাকি আপনাকে ওএসডি করা হয়?
ড. মসিউর রহমান : আমার চাকরিটা ছিল সরকারের সঙ্গে ২ বছরের চুক্তিভিত্তিক। আমার চাকরির মেয়াদ ২ মাস তখনও বাকি ছিল; কিন্তু সে চুক্তি নাকচ করা হয়। আমার চাকরি বাতিলের একটা যুক্তিও আছে। নির্বাচনের দিন রাতে আমি আমার অফিস খোলা রাখি। আওয়ামী লীগের নির্বাচন যারা পরিচালনা করছিলেন, তাঁরা অফিসে এসেছিলেন। আসলে এইচটি ইমাম সাহেবই এসেছিলেন। তিনি আমার সিনিয়র কলিগ হিসেবে আমার রুমে আসতে পারতেন। এটা সরকারের চোখে একটি অগ্রহণযোগ্য ব্যাপার। এজন্য আমাকে চাকরিতে না রাখাটা দোষারোপ করার মতো কিছু বলে আমি মনে করি না।
সমকাল: ২০০৮ সালে আওয়ামী লীগ আবার নির্বাচনে জয়লাভ করে...
ড. মসিউর রহমান : ২০০৮ সালে নির্বাচনে জয়লাভ করে আওয়ামী লীগ আবার ক্ষমতায় এলো। তখন আবার আলোচনায় আসে পদ্মা সেতু। পদ্মা সেতু নির্মাণে এ সময়ে বিশ্বব্যাংক কিছু কাজ করে। তখন দুর্নীতি রোধে বিশ্বব্যাংকের পক্ষ থেকে একটি কমিটি করা হয়। এর সুপারিশে ডিরেক্টর অব ইন্টিগ্রিটি গঠিত হয়। এরপর এটিকে ভাইস প্রেসিডেন্সির পর্যায়ে নিয়ে যাওয়া হয়। আমাদের এখানে যখন বিশ্বব্যাংক কাজ শুরু করে, তখন ভাইস প্রেসিডেন্সি চলে এসেছে। এভাবে তারা তাদের সংস্থাটিকে পুনর্গঠন করতে চায়। বিশ্বব্যাংক নিজ থেকে কোনো তদন্ত করতে পারে না। তারা দেশের সরকারের সঙ্গে আলাপ করে ব্যবস্থা নেয়। ২০১২ সালের দিকে বিশ্বব্যাংক পদ্মা সেতু নির্মাণের বিষয়ে দুর্নীতির অভিযোগ তোলে। দুর্নীতি রোধ বিশ্বব্যাংকের দায়িত্বের অন্তর্ভুক্ত বিষয়। যে কারণে তারা ইন্টিগ্রিটি ভাইস প্রেসিডেন্ট ও ইন্টিগ্রিটি অ্যাডভাইজারের পদ নিয়ে আসে। বিশ্বব্যাংকের পক্ষ থেকে আমাকে বলা হলো, আপনার সম্মতি থাকলে আমরা আপনাকে ইন্টিগ্রিটি অ্যাডভাইজারের পদে সমর্থন করব। আমি তখন সরকারের পক্ষ থেকে নিয়োজিত। বললাম, আপনারা প্রধানমন্ত্রীকে বলতে পারেন। আমি নিজে তাঁকে এ বিষয়ে বলতে চাই না। তাঁরা প্রধানমন্ত্রীকে বললেন। প্রধানমন্ত্রী এতে সম্মতি দিলেন। তার মানে আমি সরকারের নির্দেশেই এ পদ গ্রহণ করি। আমাকে কাজের দায়িত্ব বুঝিয়ে দেওয়া হলো যে, যদি কোনো নালিশ বা সন্দেহের অবকাশ থাকে, সেখানে বিশ্বব্যাংক ও সরকার কীভাবে পদক্ষেপ নিতে পারে, সে সম্পর্কে পরামর্শ দেওয়া আমার দায়িত্ব। দ্বিতীয় একটি শর্ত হলো-বিশ্বব্যাংক আমাকে অতিরিক্ত কোনো বেতন-ভাতা দেবে না। সরকার যা দেয় সেটুকুই আমি পাব। কার্যত কোনো দেশে বড় প্রকল্প থাকলে এ পদটি বিশেষ গুরুত্ব পায়।
সমকাল: তখন তো সৈয়দ আবুল হোসেন যোগাযোগমন্ত্রী...
ড. মসিউর রহমান : আমি বিশ্বব্যাংকের সঙ্গে দুর্নীতি দমন কমিশনের (দুদক) যোগাযোগ করিয়ে দিই। তারা সৈয়দ আবুল হোসেন সম্পর্কে তদন্ত করতে চায়। তদন্তের পর সে প্রতিবেদনও তারা নিয়েছে। বিশ্বব্যাংকের মতে তারা যে অংশটা পেয়েছে তা সম্পাদিত। এখানে ব্যক্তির নাম থাকে না। তাদের একমাত্র ফাইন্ডিংস ছিল- কোনো একজন লোক বলছে কোনো একটি ফার্মকে যদি পাশে রাখেন, তাহলে কন্ট্রাক্ট আপনি পাবেন। সে লোকটির পরিচয় পাওয়া যায়নি। আমি বললাম, এ কোম্পানি সৈয়দ আবুল হোসেন সাহেবের ফার্মের সঙ্গে যুক্ত কিনা। তাঁর বিরুদ্ধে এর বেশি কোনো প্রমাণ ছিল না।
বিশ্বব্যাংকের পক্ষ থেকে আমাকে বলা হলো-সৈয়দ আবুল হোসেনকে মন্ত্রিসভা থেকে বাদ দেওয়ার কথা। আমি বললাম, তিনি মন্ত্রিসভার সদস্য, আমিও সরকারের সঙ্গে সম্পৃক্ত। আমার পক্ষ থেকে প্রধানমন্ত্রীকে পরামর্শ দেওয়া যে, আবুল হোসেনকে মন্ত্রিসভা থেকে বাদ দেন-এটা আমার কাছে মনে হয় না যে, খুব গ্রহণযোগ্য অনুরোধ। আমি তাঁদের আরও জানাই, সৈয়দ আবুল হোসেন বা অন্য কারও বিরুদ্ধে যদি কোনো নালিশ থাকে, বা তদন্তে যদি এ জাতীয় কোনো প্রমাণ পাওয়া যায়, তখন কী করা যেতে পারে, সে বিষয়ে আমি পরামর্শ দিতে পারি।
দুর্নীতির সম্ভাবনা দেখা দিয়েছে- এমন অভিযোগে বিশ্বব্যাংক ঋণ বরাদ্দ স্থগিত করে। এদিকে বিশ্বব্যাংক কিন্তু আগেই এডিবি, জাইকাসহ উন্নয়ন সহযোগীদের সঙ্গে একটি চুক্তি করে রেখেছে-যদি বিশ্বব্যাংক কোনো দুর্নীতি-অনিয়মের অভিযোগে ঋণ বরাদ্দ স্থগিত রাখে, তাহলে অন্য সহযোগীরাও কোনোরকম তদন্ত ছাড়াই ওই প্রকল্পে ঋণ স্থগিত রাখবে। যে কারণে এ প্রকল্পে এডিবি-জাইকা এগোতে পারেনি।
এরপর আমি বিশ্বব্যাংকের কর্মকর্তাদের সঙ্গেও কথা বলেছি। আমি তাঁদের চিঠি লিখে জানিয়েছিলাম, তাঁদের এ আইনিপ্রক্রিয়া খুব দুর্বল, এ দিয়ে তাঁরা আদালতে অভিযোগ প্রমাণ করতে পারবেন না। পরবর্তীকালে কানাডার আদালতের রায়েও বলা হয়, তারা দুর্নীতি হচ্ছে- এমন কোনো তথ্য-প্রমাণ হাজির করতে পারেনি। তথ্য-প্রমাণ হিসেবে যা হাজির করা হয়েছে, তা সবই প্রকাশিত বিষয়। এর মধ্য দিয়ে তারা অভিযোগ প্রমাণ করতে পারেনি। অভিযোগ ওঠায় আমাদের দিক থেকেও ইন্টিগ্রিটি অ্যাডভাইজারের পদটি নিষ্ফ্ক্রিয় হয়ে পড়ে। তারাও এ বিষয়ে নিষ্ফ্ক্রিয়। তৎকালীন অর্থমন্ত্রী বিশ্বব্যাংককে পদ্মা সেতু প্রকল্পে ফেরানোর উদ্যোগ নেন। তবে তারা ফেরেনি।
এরই মধ্যে প্রধানমন্ত্রী মন্ত্রী-উপদেষ্টা ও দলের প্রথম সারির নেতাদের নিয়ে এক সভায় বসেন। সেখানে তিনি বলেন, 'বিশ্বব্যাংকের দরকার নাই। আমরা এ প্রকল্প নিজেদের টাকায় করব, কিছু কাটছাঁট করে হলেও নিজেরাই করব।' আমাকে বললেন, 'আপনি দেখেন কীভাবে কী করা যায়।'
আমি তখন জামিলুর রেজা চৌধুরীর সঙ্গে কথা বলি। তাঁর সঙ্গে আলোচনা করে দেখা যায়, এখানে কিছু কমে প্রকল্পটা বাস্তবায়ন সম্ভব। প্রায় ২০০ থেকে ২৫০ মিলিয়ন ডলারের মতো কম খরচ করে এটি করা সম্ভব। তাতে সড়ক ও রেল সেতু একসঙ্গে না করে, দুটো আলাদা করে ডিজাইন করার পরিকল্পনা আসে। সড়ক ও রেল একসঙ্গে করলে পিলারের যে ক্ষমতার দরকার হয়, তাতে খরচ বেশি লাগে। তাতে টেকনিক্যাল কিছু সীমাবদ্ধতা আসে। যদি রেল সেতু বা সড়ক সেতুতে কোনো সমস্যা দেখা দেয়, তাহলে পুরো সেতুতেই এর প্রভাব পড়বে। সবচেয়ে বড় কাজ হলো নদীশাসন। নদীশাসন হয়ে গেলে সেখানে একাধিক সেতু নির্মাণ করতেও সমস্যা নেই। আমরা বললাম, সেতু দুটি আলাদা করলে সেতুর কর্মক্ষমতা বাড়ে, খরচ কিছুটা কমে। তবে প্রধানমন্ত্রী বললেন, বিশ্বব্যাংক যে প্রকল্প থেকে সরে গেছে, আমরা সেটাই করব।
বিশ্বব্যাংক কোনো বড় প্রকল্প অনুমোদন করলে বা সেখান থেকে সরে আসতে হলে তা বোর্ডে পাস হতে হয়। এমনকি সংস্থাটির কোনো বিদায়ী প্রেসিডেন্ট তাঁর শেষ সময়ে এমন কোনো সিদ্ধান্ত নেন না সাধারণত। কিন্তু বিশ্বব্যাংকের তৎকালীন প্রেসিডেন্ট রবার্ট জোয়েলিক তাঁর কার্যদিবস শেষ হওয়ার ঠিক আগমুহূর্তে পদ্মা সেতু প্রকল্প থেকে সরে আসার চিঠিতে স্বাক্ষর করেন। আমার মতে, এমন সিদ্ধান্তে বোর্ড প্রেসিডেন্টের অধিনস্ত হয়ে পড়ে, অথচ প্রেসিডেন্ট কিন্তু ওই বোর্ডের কাছেই জবাবদিহি করতে বাধ্য। এমন সিদ্ধান্ত একটি প্রাতিষ্ঠানিক সমস্যা তৈরি করতে পারে। এর মধ্যে একদিকে যেমন অর্থমন্ত্রী বিশ্বব্যাংককে ফেরানোর চেষ্টা করছিলেন, তেমনি প্রধানমন্ত্রীর নির্দেশে আমরা নিজেরা কীভাবে তা বাস্তবায়ন করতে পারব, সে বিষয়ে আলোচনা করছিলাম। এ ক্ষেত্রে প্রধানমন্ত্রী অগাধ দৃঢ়তা, সহনশীলতা ও দূরদৃষ্টির পরিচয় দিয়েছেন। তিনি অর্থমন্ত্রীকে বাধা দেননি, কারণ তিনি তাঁর কাজটাই করছিলেন। আবার এটাও বুঝতে পারছিলেন যে, বিশ্বব্যাংক না ফিরলে এ প্রকল্প নিজেদেরই করতে হবে। অর্থমন্ত্রী আমাকে বোঝালেন, আমি যেন পদত্যাগ করি। আমার বক্তব্য ছিল, প্রধানমন্ত্রীর নির্দেশে আমি এই পদ গ্রহণ করেছি। আমি যদি অভিযোগের ভিত্তিতে পদ ছেড়ে দিই, তাহলে অন্যরা বলতে পারবে- তিনি তো প্রধানমন্ত্রীর অর্থনৈতিকবিষয়ক উপদেষ্টা, তিনি দায় স্বীকার করে নিয়ে পদ ছেড়ে দিয়েছেন। এরপর বিশ্বব্যাংক, এডিবি ও জাইকা প্রতিনিধিরা আমার সঙ্গে দেখা করতে চাইলেন। এক বন্ধের দিনে তাঁরা আমার বাসায় এলেন। প্রস্তাব দিলেন, আমি চাইলে বিদেশে কনসালট্যান্সি করতে পারি, বা কোনো বিদেশি বিশ্ববিদ্যালয়ের সঙ্গে কাজ করতে পারি-তাঁরা ব্যবস্থা করে দেবেন। আমি প্রস্তাব ফিরিয়ে দিয়ে বললাম, আমার যদি টাকা-পয়সা বাড়ানোর ইচ্ছা থাকত তাহলে তো এখানে থাকতাম না। তোমাদের প্রস্তাব কেন গ্রহণ করব। আমার কথা হলো-দেশের ভেতরে থাকা অবস্থায়, আমার এ মাটির ওপর দাঁড়ানোর সুযোগ আছে। কিন্তু বাইরে চলে গেলে সে সুযোগটা আমার থাকছে না। অর্থমন্ত্রী এ নিয়ে প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে কথা বলেছেন। অর্থমন্ত্রী যখন এ বিষয়ে একটি চূড়ান্ত অবস্থায় আসতে চেয়েছেন, তখন প্রধানমন্ত্রী আমায় ডেকে বললেন, 'আপনি আমার বাবার সঙ্গে কাজ করেছেন। আমার সঙ্গে কাজ করার কোনো দরকার ছিল না। তবুও আপনি আমার সঙ্গে কাজ করছেন। আর এখন একটা দুর্নাম নিয়ে বেরিয়ে যেতে হবে, এটা আমার কাছে গ্রহণযোগ্য নয়।' এ অংশের আলোচনা এখানেই শেষ।
সমকাল: পদ্মা সেতু নির্মাণের আর্থিক সংস্থান কীভাবে করলেন?
ড. মসিউর রহমান : আর্থিক সংস্থানের ক্ষেত্রে আমাদের লক্ষ্য ছিল, কীভাবে খরচ কমিয়ে আনা যায়। এজন্য জামিলুর রেজা চৌধুরীসহ আরও কয়েকজনের সঙ্গে আলোচনা করি। তখন রাফলি হিসাব করেছিলাম, যদি ২.৯ বা ৩ বিলিয়ন ডলার এ খাতে পাঁচ বছরে খরচ করি, তাহলে গড়ে একেক বছরে ৬০০ মিলিয়ন ডলারের মতো খরচ হয়। এই পরিমাণ অর্থ খরচ করার মতো ক্ষমতা সরকারের আছে। ফলে এ প্রকল্প আমরা করতে পারি। বাংলাদেশ ইকোনমিক অ্যাসোসিয়েশন এ হিসাব করেছিল। তাঁরা বলেছিলেন যে এটি করা সম্ভব। তবে এটি করা সম্ভব হতো না যদি প্রধানমন্ত্রী দৃঢ় দৃষ্টিভঙ্গি না রাখতেন। সিদ্ধান্তে ঝুঁকি থাকে। যে কোনো বড় সিদ্ধান্ত নিতে গেলে ঝুঁকিতে পড়তে হয়। আপনি যুদ্ধ করতে গেলেও ঝুঁকিতে পড়বেন, সেজন্য কী আপনি যুদ্ধ করবেন না! প্রধানমন্ত্রী সিদ্ধান্তে অটল থাকায় এটি সম্ভব হয়েছে। বাজেটের পাঁচ শতাংশ এ খাতে এসেছে, যার মানে জনগণের করের টাকায় এ সেতু হয়েছে। বিশ্বব্যাংকের সময়ে যেসব কন্ট্রাক্টরদের ইভ্যালুয়েড করা হয়েছিল, এরাই কাজ করেছে। বিশ্বব্যাংক যে কোয়ালিটি ইনশিওর করতে পারত, আমরাও তা-ই করেছি।
সমকাল: আমরা নিজের টাকায় সেতু বানালাম। বিশেষজ্ঞ ইঞ্জিনিয়ার-কর্মীদের যে অভিজ্ঞতা হলো, এতে নিজেদের বিশেষজ্ঞদের দিয়েও কী সেতু বানানো সম্ভব?
ড. মসিউর রহমান : আমাদের একটা বিশেষজ্ঞ প্যানেল ছিল। আওয়ামী লীগের তথ্য ও গবেষণা উপকমিটিতে আইনুন নিশাত ছিলেন। তিনি বলেছেন, ওই বিশেষজ্ঞ প্যানেলে পদ্মা নদীর বৈশিষ্ট্য সম্পর্কে আমাদের দেশীয় বিশেষজ্ঞরা যতটা ব্যাখ্যা করতে পেরেছেন, তা বিদেশিরা পারেননি। সেখানে বাংলাদেশের বিশেষজ্ঞরা যেসব মতামত দিয়েছেন, বিদেশি বিশেষজ্ঞরা কিন্তু সেটি নিয়ে প্রশ্ন তোলেননি।
আমাদের বিশেষজ্ঞদের যোগ্যতা যদি বিশ্বমানের হয়, তাহলে আমাদের বিশেষজ্ঞরাই এমন প্রকল্প করতে পারবেন। বিশ্বে অনেক ইঞ্জিনিয়ার রয়েছেন, যাঁরা পারবেন না, আবার আমাদের এখানে অনেকে পারবেনও। আন্তর্জাতিক মানের যোগ্যতা, সবাই অর্জন করেন না। আমরা যত উঁচুমানের চিন্তা করব, ততই বিশ্বমানের সঙ্গে মিলবে।
সমকাল: যমুনা সেতুর পর অনেক বছর অপেক্ষা করতে হয়েছে। আমরা কী পরবর্তী সেতুটা আরও আগে পাব?
ড. মসিউর রহমান : আরেকটা নদী কোথায় পাব? আমাদের তো অনেক মেঘনা, পদ্মা নেই। যমুনা সেতু যখন হয়, ওটা ছিল তখন ফ্রন্টিয়ার টেকোনলজি। প্রযুক্তির সর্বোচ্চ সীমা এখানে ব্যবহার করা হয়েছে। এখন পদ্মা সেতু হলো। এখানেও কিন্তু সর্বোচ্চ টেকনোলজি ব্যবহার করা হয়েছে। যমুনা সেতুর প্রথম আলোচনা তুলেছিলেন বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান। ১৯৭৪ সালে যখন তিনি জাপান সফরে গেলেন, তখন এ সম্পর্কে বলেছিলেন। জাপানিরা কিছু কাজ অগ্রসর করেছিলেন। বঙ্গবন্ধু নিহত হওয়ার পর আর অগ্রসর হয়নি।
সমকাল: পদ্মা সেতুতে কেন সারচার্জ ধরা হলো না?
ড. মসিউর রহমান : যমুনা সারচার্জ থেকে যে টাকা আয় হয়েছে, তাতে যমুনা সেতুর ব্যয় পূরণ হয়নি। আপদকালীন সময় ছাড়া সারচার্জের বিষয়টি দেশি-বিদেশি অর্থনীতিবিদরা সমর্থন করেন না। ফলে পদ্মা সেতুর ক্ষেত্রে সারচার্জ আনা হয়নি। পদ্মা সেতু প্রশ্নে প্রধানমন্ত্রী বললেন, 'আমি জনগণের কাছ থেকে সাহায্য নেব।' এজন্য অ্যাকাউন্টও খোলা হয় ব্যাংকে। কিছু টাকাও জমা হয় সেখানে। পরে সেটা বন্ধ করা হয়। যে জিনিসটা আপনি নিজ থেকেই দিতে চান, তার জন্য বাধ্যতামূলক সারচার্জ তো যুক্তিসংগত নয়।
সমকাল: আপনার ব্যক্তিগত সন্তুষ্টি কেমন পদ্মা সেতু নিয়ে?
ড. মসিউর রহমান : ব্যক্তিগত সন্তুষ্টি হলো- একটা প্রকল্পের সঙ্গে আমি প্রথম থেকেই যুক্ত ছিলাম। বিভিন্ন পর্যায়ে এ সেতু নির্মাণের সঙ্গে আমি যুক্ত থেকেছি। সেতুর উদ্যোগ নেওয়ার পর আমার মনে হয়েছে, এ প্রকল্প সফল হলে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার নেতৃত্বের যে গুণাবলি, দৃঢ়তা; তা প্রতীক হয়ে থাকবে।
উত্তরবঙ্গ, দক্ষিণবঙ্গ ও পশ্চিমবঙ্গকে যদি উন্নয়নবলয়ের ভেতর আনতে হয়, তাহলে চট্টগ্রাম বন্দরের সঙ্গে এদের সম্পর্ক স্থাপিত করতে হবে। সব মিলিয়ে চারটি বন্দর হবে, সমুদ্র কিন্তু আমাদের একদিকে। সহজে পণ্য পরিবহন ও ব্যয় কমাতে পারলেই তা সম্ভব। এ ক্ষেত্রে যমুনা ও পদ্মা সেতুর ভূমিকা সবচেয়ে বেশি। যমুনা, পদ্মা সেতু না হলে এটি সম্ভব হতো না। বাংলাদেশকে এশিয়ার হাব মানানোর কথা বলা হচ্ছে। এটা হতো না যদি এ সেতুগুলো না করা হতো। ইকোনমিক অ্যান্ড সোশ্যাল কমিশন ফর এশিয়া প্যাসিফিক প্রথম ১৯৫০-এর দশকে এশিয়ান রেলওয়ে এবং হাইওয়ের পরিকল্পনা সামনে আনে। কীভাবে হবে না হবে সবই তারা পরিকল্পনায় এনেছে। কিন্তু তাদের অর্থসংস্থানের কোনো ক্ষমতা নেই। এ জন্য এডিবি, জাইকা, বিশ্বব্যাংক এদের কাছ থেকে অর্থসংস্থান হতে হবে। কিন্তু এই অর্থসংস্থানটা হতে হবে কোনো দেশের মাধ্যমে, দেশ ঋণ নেবে কিংবা সহায়তা নেবে। তারা বিনিয়োগ করবে। এশিয়ান হাইওয়েকে আমরা গ্রহণ করলাম শেখ হাসিনা যখন ১৯৯৬-এ প্রধানমন্ত্রী হলেন। পরিকল্পনায় অংশীদার না হয়ে, কোনো পরিকল্পনা পরিবর্তন করতে বলা যায় না। আমরা এতে যুক্ত হওয়ার পরপরই বললাম, আমাদের যে রুট দেওয়া হয়েছে আসাম-মিজোরাম হয়ে বাংলাদেশ হয়ে আবার ভারতে প্রবেশ করা, আর মিয়ানমারের সঙ্গে সংযোগ। আমরা বিকল্প পথের কথা বললাম। এটিও প্রধানমন্ত্রীর একটি সাহসী পদক্ষেপ।
সমকাল: বাংলাদেশ কি তাহলে বিদেশি ঋণমুক্ত একটি দেশ হবে?
ড. মসিউর রহমান : সব দেশই ঋণ নেয়, বিদেশি রিসোর্স অর্থনীতিতে প্রবেশ করে। তবে কোন শর্তে ঋণ নেওয়া হচ্ছে, সেটা জরুরি। সরকার যদি দেশের ওপর ঋণ নেয়, তাহলে প্রাইভেট সেক্টর সংকুচিত হবে। যদি আপনি সক্রিয় প্রাইভেট সেক্টর চান, প্রাইভেট সেক্টরের উৎপাদন যদি না বাড়ে তাহলে অর্থনীতির গতি আসবে না। প্রাইভেট সেক্টরের উৎপাদন সম্ভব হয় না, যদি অবকাঠামোগত বিষয়াদি তারা না পায়। বিনিয়োগই হলো আপনার অর্থনীতির শক্তি। ওই শক্তি তখনই আসে, যখন সরকার এর সুবিধা দেয়। অতএব সরকারকে অবশ্যই বিনিয়োগ করতে হবে, আমরা প্রত্যক্ষ বিদেশি বিনিয়োগের কথা বলি, কিন্তু এজন্য অবকাঠামো দরকার। ভৌত অবকাঠামো, যেখানে পাবলিক ইন্টারেস্ট আছে, সেগুলো সরকারকেই করতে হয়। সরকারের সে দায়বদ্ধতা আমরা প্রত্যক্ষ করেছি যমুনা সেতু, পদ্মা সেতু নির্মাণের ক্ষেত্রে।


আরও পড়ুন

×