ঢাকা শনিবার, ০৫ সেপ্টেম্বর ২০২৬

অভিমত

অন্তর্ভুক্তিমূলক অর্থনীতির পথে বড় পদক্ষেপ

অন্তর্ভুক্তিমূলক অর্থনীতির  পথে বড় পদক্ষেপ
×

মোহাম্মদ মামদুদুর রশীদ সিইও, ইউসিবি

মোহাম্মদ মামদুদুর রশীদ

প্রকাশ: ৩০ জুলাই ২০২৬ | ০৭:৪৬

| প্রিন্ট সংস্করণ

বাংলাদেশে ডিজিটাল আর্থিক সেবার বিস্তার গত এক দশকে উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছে। মোবাইল ফাইন্যান্সিয়াল সার্ভিস (এমএফএস), ইন্টারনেট ব্যাংকিং এবং মোবাইল অ্যাপভিত্তিক লেনদেন মানুষের দৈনন্দিন জীবনের অংশ হয়ে উঠেছে। কিন্তু এই অগ্রগতির মাঝেও একটি বড় সীমাবদ্ধতা ছিল বিভিন্ন ব্যাংক ও এমএফএস প্রতিষ্ঠানের পৃথক পৃথক কিউআর ব্যবস্থা। এক প্রতিষ্ঠানের গ্রাহক অন্য প্রতিষ্ঠানের কিউআর ব্যবহার করে অর্থ পরিশোধ করতে পারতেন না। ফলে একজন মার্চেন্টকে একাধিক কিউআর কোড প্রদর্শন করতে হতো, আর গ্রাহকদেরও নির্দিষ্ট একটি অ্যাপের ওপর নির্ভর করতে হতো। 
বাংলা কিউআর এই দীর্ঘদিনের বিভাজন দূর করার একটি গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ। এটি শুধু নতুন একটি পেমেন্ট প্রযুক্তি নয়; বরং দেশের ডিজিটাল পেমেন্ট ব্যবস্থাকে একটি সমন্বিত, আন্তঃপরিচালনযোগ্য ও মানসম্পন্ন অবকাঠামোতে রূপান্তরের উদ্যোগ।

বাংলা কিউআরের সবচেয়ে বড় অর্জন হলো এখন একজন গ্রাহক তাঁর পছন্দের যে কোনো অংশগ্রহণকারী ব্যাংক বা এমএফএস অ্যাপ ব্যবহার করে যে কোনো বাংলা কিউআর গ্রহণকারী মার্চেন্টকে অর্থ পরিশোধ করতে পারবেন। এতে পেমেন্ট হবে আরও সহজ, দ্রুত এবং ঝামেলামুক্ত। একই সঙ্গে মার্চেন্টদেরও আর একাধিক কিউআর ব্যবস্থাপনা করতে হবে না। একটি মাত্র কিউআর দিয়েই বিভিন্ন উৎস থেকে অর্থ গ্রহণ সম্ভব হবে।

ডিজিটাল পেমেন্ট ব্যবস্থার এই পরিবর্তন শুধু গ্রাহকের সুবিধা বাড়াবে না, বরং ব্যাংকিং খাতের প্রতিযোগিতার ধরনও বদলে দেবে। এতদিন প্রতিযোগিতা ছিল কে বেশি সংখ্যক মার্চেন্টের কাছে নিজস্ব কিউআর বা পিওএস টার্মিনাল স্থাপন করতে পারে। এখন প্রতিযোগিতার মূল ক্ষেত্র হবে উন্নত গ্রাহক অভিজ্ঞতা, শক্তিশালী ডিজিটাল অ্যাপ, দ্রুত সেটেলমেন্ট, কার্যকর ডেটা অ্যানালিটিকস এবং মূল্য সংযোজনকারী আর্থিক সেবা। অর্থাৎ অবকাঠামোর পরিবর্তে উদ্ভাবন, প্রযুক্তি ও সেবার মানই হবে ভবিষ্যতের প্রতিযোগিতার ভিত্তি।
বাংলাদেশের অর্থনীতির একটি বড় অংশ এখনও ক্ষুদ্র ও অনানুষ্ঠানিক ব্যবসার ওপর নির্ভরশীল। কিন্তু পিওএস টার্মিনাল স্থাপনের ব্যয় এবং পরিচালনাগত সীমাবদ্ধতার কারণে বিপুলসংখ্যক ক্ষুদ্র ব্যবসায়ী এতদিন ডিজিটাল পেমেন্ট ব্যবস্থার বাইরে ছিলেন। বাংলা কিউআর সেই বাধা দূর করার সুযোগ সৃষ্টি করেছে। একটি স্মার্টফোন, ইন্টারনেট সংযোগ এবং একটি কিউআর স্ট্যান্ড থাকলেই একজন ছোট ব্যবসায়ী ডিজিটাল পেমেন্ট গ্রহণ করতে পারবেন।

এর গুরুত্ব শুধু পেমেন্ট গ্রহণে সীমাবদ্ধ নয়। নিয়মিত ডিজিটাল লেনদেনের মাধ্যমে ক্ষুদ্র ব্যবসায়ীদের একটি নির্ভরযোগ্য আর্থিক ইতিহাস তৈরি হবে। এই তথ্য ভবিষ্যতে ব্যাংক ঋণ, কার্যকর আর্থিক পরিকল্পনা এবং অন্যান্য আনুষ্ঠানিক আর্থিক সেবা পাওয়ার ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে। ফলে বাংলা কিউআর আর্থিক অন্তর্ভুক্তি বাড়ানোর পাশাপাশি অনানুষ্ঠানিক অর্থনীতিকে ধীরে ধীরে আনুষ্ঠানিক কাঠামোর সঙ্গে যুক্ত করতে সহায়তা করবে।
অবশ্য প্রযুক্তি চালু করলেই সফলতা আসে না। যে কোনো ডিজিটাল উদ্যোগের মতো বাংলা কিউআরের ক্ষেত্রেও সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ মানুষের দীর্ঘদিনের নগদনির্ভর অভ্যাস পরিবর্তন করা। গ্রাহক এবং মার্চেন্ট উভয়ের মধ্যেই আস্থা তৈরি করতে হবে। ডিজিটাল লেনদেনকে নিরাপদ, দ্রুত ও নিরবচ্ছিন্ন করতে হবে। পাশাপাশি ব্যাপক সচেতনতা কার্যক্রম, সহজ ব্যবহারযোগ্য প্রযুক্তি এবং দ্রুত অভিযোগ নিষ্পত্তি ব্যবস্থাও নিশ্চিত করতে হবে।

নিরাপত্তার বিষয়টি তাই অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। বাংলা কিউআর আন্তর্জাতিক মানদণ্ড অনুসরণ করে তৈরি হওয়ায় এতে উন্নত এনক্রিপশন, নিরাপদ অথেনটিকেশন এবং লেনদেন পর্যবেক্ষণের ব্যবস্থা রয়েছে। একই সঙ্গে অংশগ্রহণকারী ব্যাংক ও পেমেন্ট সেবাদাতাদের নিজস্ব সাইবার নিরাপত্তা কাঠামোও এই ব্যবস্থাকে আরও শক্তিশালী করবে। তবে প্রযুক্তিগত নিরাপত্তার পাশাপাশি গ্রাহকদেরও সচেতন থাকতে হবে। 
বাংলা কিউআরের সফল বাস্তবায়নে আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো ক্ষুদ্র ব্যবসায়ীদের দ্রুত এই ইকোসিস্টেমে যুক্ত করা। সহজ ই-কেইউসি, এজেন্ট ব্যাংকিং, সহজ হিসাব খোলার প্রক্রিয়া এবং এসএমই নেটওয়ার্কের মাধ্যমে তাদের অন্তর্ভুক্ত করা সম্ভব। শুধু কিউআর বিতরণ করলেই হবে না; বরং নিয়মিত ব্যবহার নিশ্চিত করে একটি সক্রিয় মার্চেন্ট ইকোসিস্টেম গড়ে তুলতে হবে।
ইউনাইটেড কমার্শিয়াল ব্যাংক (ইউসিবি) ইতোমধ্যেই এই লক্ষ্যকে সামনে রেখে কাজ করছে। ব্যাংকটি পর্যায়ক্রমে রিটেইল ও এসএমই মার্চেন্টদের বাংলা কিউআর ব্যবস্থায় যুক্ত করার উদ্যোগ নিয়েছে। বিশেষ গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে ক্ষুদ্র ব্যবসায়ী, এসএমই উদ্যোক্তা এবং ঢাকা-চট্টগ্রামের বাইরের টায়ার-২ ও টায়ার-৩ শহরের ব্যবসায়ীদের ওপর। লক্ষ্য শুধু নতুন কিউআর বিতরণ নয়, বরং এমন একটি টেকসই ডিজিটাল ইকোসিস্টেম তৈরি করা, যেখানে গ্রাহক ও মার্চেন্ট উভয়ের কাছেই বাংলা কিউআর দৈনন্দিন লেনদেনের স্বাভাবিক মাধ্যম হয়ে উঠবে।

আরও পড়ুন

×