ঢাকা শনিবার, ০৫ সেপ্টেম্বর ২০২৬

অভিমত

বাংলাদেশের পেমেন্ট ব্যবস্থা নতুন পর্যায়ে পৌঁছাবে

বাংলাদেশের পেমেন্ট ব্যবস্থা  নতুন পর্যায়ে পৌঁছাবে
×

ড. শাহাদাত খান সিইও, টালিখাতা ও টালিপে

ড. শাহাদাত খান

প্রকাশ: ৩০ জুলাই ২০২৬ | ০৭:৫৪ | আপডেট: ৩০ জুলাই ২০২৬ | ১৩:৪৪

| প্রিন্ট সংস্করণ

গত ১৫ বছর বাংলাদেশ ডিজিটাল আর্থিক সেবায় বড় অগ্রগতি করেছে। মোবাইল ফিন্যান্সিয়াল সার্ভিসে (এমএফএস) এখন ৯ কোটির বেশি সক্রিয় হিসাব আছে এবং প্রতিদিন গড়ে দুই কোটির বেশি লেনদেনের মাধ্যমে প্রায় ছয় হাজার কোটি টাকা আদান-প্রদান হয়। মানুষ নিয়মিত ক্যাশ ইন-আউট করছেন, টাকা পাঠাচ্ছেন, বেতন-ভাতা নিচ্ছেন, বিল দিচ্ছেন এবং মোবাইল রিচার্জ করছেন।

কিন্তু কোনো মুদি দোকান বা ফার্মেসিতে গেলে চিত্র পুরোপুরি ভিন্ন। খুচরা কেনাকাটায় ডিজিটাল পেমেন্ট এখনও পিছিয়ে। দেশের খুচরা লেনদেনের ৯৮ শতাংশের বেশি এখনও ক্যাশে হয়। টাকা ডিজিটাল ব্যবস্থায় ঢোকে ঠিকই, কিন্তু খরচের আগেই তা আবার ক্যাশ আউট হয়ে যায়। গ্রাহক নিজের টাকা তুলতেই চার্জ দেন, মার্চেন্ট দিনশেষে আবার নোট গুনতে বসেন। পেমেন্টের শেষ ধাপ দোকানে দাঁড়িয়ে দাম মেটানোর মুহূর্তটি রয়ে গেছে ক্যাশনির্ভর।

বাংলাদেশ ব্যাংক সমস্যাটি চিহ্নিত করেছে এবং পূর্ণোদ্যমে বাংলা কিউআর জনপ্রিয় করতে কাজ করছে, যেখানে যে কোনো ব্যাংক বা ওয়ালেটের গ্রাহক একটি সমন্বিত কিউআর কোড স্ক্যান করে যে কোনো মার্চেন্টকে পেমেন্ট করতে পারেন। এ উদ্যোগ বাস্তবায়নের জন্য একটি কার্যকর কৌশলগত কাঠামো হতে পারে ৪পি+সি স্ট্র্যাটেজি ফ্রেমওয়ার্ক– প্রেজেন্স, পারফরম্যান্স, প্রমোশন, প্রাইসিং ও কমিউনিকেশন। প্রেজেন্সের মাধ্যমে দেশজুড়ে বাংলা কিউআর দৃশ্যমান করা এবং প্রতিটি ব্যাংক ও ওয়ালেট অ্যাপের হোমস্ক্রিনে সহজে স্ক্যান সুবিধা নিশ্চিত করা। পারফরম্যান্সের মাধ্যমে পেমেন্ট দ্রুত ও নির্ভরযোগ্যভাবে সম্পন্ন করা এবং কোনো সমস্যা হলে কয়েক মিনিটের মধ্যে সমাধান নিশ্চিত করা। প্রমোশনের মাধ্যমে স্থিতিশীল অবকাঠামোর ওপর ভিত্তি করে প্রচারণা ও প্রণোদনার মাধ্যমে ব্যবহারকারীর অভ্যাস তৈরি করা। প্রাইসিংয়ের মাধ্যমে মার্চেন্টের খরচ এমন পর্যায়ে নামিয়ে আনা, যাতে ডিজিটাল পেমেন্ট ক্যাশের চেয়ে বেশি লাভজনক মনে হয়। 

প্রেজেন্সের ক্ষেত্রে গত জুন মাসে ভালো অগ্রগতি হয়েছে। প্রোভাইডাররা মার্চেন্টদের বাংলাদেশ ব্যাংকের মান অনুযায়ী বাংলা কিউআর দিচ্ছে এবং নিজস্ব কিউআর কোড সরিয়ে নেওয়া হয়েছে। দেশে এখন ১৫ লাখের বেশি বাংলা কিউআর মার্চেন্ট রয়েছে। ১ জুলাই থেকে ট্রেড লাইসেন্স নবায়নে বাংলা কিউআর বাধ্যতামূলক হওয়ায় সংখ্যাটা আরও বাড়বে। বিকাশ, নগদসহ প্রধান ওয়ালেট ও ব্যাংকিং অ্যাপে বাংলা কিউআর পেমেন্ট অপশন যোগ হয়েছে।

এবার মনোযোগ দিতে হবে পারফরম্যান্সে। একটি বাস্তবসম্মত লক্ষ্য হতে পারে– প্রতি এক হাজার চেষ্টার মধ্যে অন্তত ৯৭০টি পেমেন্ট সফল হওয়া। ব্যর্থতার হার ৩ শতাংশের বেশি হলে আস্থা নষ্ট হবে, যা পরে ফিরিয়ে আনা অনেক কঠিন হবে। হিসাব থেকে টাকা কাটার পরও পেমেন্ট ব্যর্থ হলে বেশির ভাগ ক্ষেত্রে মিনিটের মধ্যেই তা ফেরত দেওয়া উচিত। এমন পরিস্থিতিতে সমাধান পেতে যেন গ্রাহককে সপ্তাহের পর সপ্তাহ অপেক্ষা করতে না হয়।

প্রেজেন্স ও পারফরম্যান্স স্থিতিশীল হলেই প্রমোশন ও প্রাইসিংয়ের পালা। বাংলাদেশ ব্যাংক একটি বিশেষ উদ্যোগ নিতে পারে, যেখানে ৫০০ টাকা বা তার কম মূল্যের লেনদেনের জন্য মাইক্রোমার্চেন্টকে এক বছর কোনো সার্ভিস চার্জ দিতে হবে না। এর ফলে ক্ষুদ্র ব্যবসায়ীরা ডিজিটাল পেমেন্ট গ্রহণে উৎসাহিত হবেন এবং গ্রাহকরাও ছোট অঙ্কের কেনাকাটায় কিউআর ব্যবহারে অভ্যস্ত হয়ে উঠবেন। এই উদ্যোগ বাস্তবায়নে বাংলাদেশ ব্যাংক সার্ভিস প্রোভাইডার ও ব্যাংকগুলোর জন্য আর্থিক প্রণোদনার ব্যবস্থা করতে পারে। এ ছাড়া ডিজিটাল লেনদেন বাড়াতে মার্চেন্টদের খরচ কমানো দরকার। বর্তমানে এমডিআর ১ শতাংশ হলেও অনেক ক্ষুদ্র ব্যবসায়ীর লাভের মার্জিনের তুলনায় এটি এখনও বেশি; ধাপে ধাপে তা ০.৫ শতাংশের কাছাকাছি নামানো যেতে পারে। 

সবশেষে কমিউনিকেশনকে সমান গুরুত্ব দিতে হবে। শুধু প্রযুক্তি তৈরি করলেই হবে না; গ্রাহককে জানতে হবে কোথায় বাংলা কিউআর ব্যবহার করা যায়। এটি কেন নিরাপদ এবং কীভাবে ব্যবহার করতে হয়। একই সঙ্গে মার্চেন্টদেরও ডিজিটাল পেমেন্টের ব্যবসায়িক সুবিধাগুলো নিয়মিত জানাতে হবে। সচেতনতা ছাড়া অন্য চারটি উপাদানের পূর্ণ সুফল পাওয়া কঠিন হবে।

প্রেজেন্স ও পারফরম্যান্স আগে, তারপর প্রমোশন ও প্রাইসিং– আর কমিউনিকেশন থাকবে সব সময়ের সঙ্গী হয়ে। এই ক্রম মেনে ৪পি+সি ফ্রেমওয়ার্ক বাস্তবায়ন করা গেলে বাংলাদেশের পেমেন্ট ব্যবস্থা একটি নতুন পর্যায়ে পৌঁছাবে। এর ফল হবে আরও ডিজিটাল লেনদেন, গভীর আর্থিক অন্তর্ভুক্তি, সাধারণ মানুষের অর্থনৈতিক ক্ষমতায়ন এবং দ্রুততর অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি।

আরও পড়ুন

×