ঢাকা বৃহস্পতিবার, ০৪ জুন ২০২৬

আইসক্রিম

৩০০০ কোটি টাকার বাজার

৩০০০ কোটি টাকার বাজার
×

.

 জসিম উদ্দিন বাদল

প্রকাশ: ২০ জুলাই ২০২৫ | ০১:১৮ | আপডেট: ২০ জুলাই ২০২৫ | ১৪:০০

| প্রিন্ট সংস্করণ

ফেরিওয়ালার কাঠের বাক্সের ‘ঠকাস ঠকাস’ শব্দের যুগ পেরিয়ে আইসক্রিম এখন বড় বাণিজ্যিক পণ্য। প্রযুক্তির উৎকর্ষে আইসক্রিম যেমন বৈচিত্র্য পাচ্ছে, তেমনি গুরুত্ব পাচ্ছে জনস্বাস্থ্যও। দেশে হিমায়িত এই খাবারটির বাজারের আকার বেড়ে দাঁড়িয়েছে আনুমানিক তিন হাজার কোটি টাকার। 

উৎপাদনকারীরা বলছেন, মানুষের ক্রয়ক্ষমতা বৃদ্ধি, নগরায়ণ ও গ্রামীণ এলাকায় বিদ্যুৎ পৌঁছে যাওয়া এবং রেফ্রিজারেটর সহজলভ্য হওয়ায় আইসক্রিমের ভোক্তা বাড়ছে। বর্তমান এর প্রবৃদ্ধি প্রায় ১৫ শতাংশ। এই ধারা অব্যাহত থাকলে ২০৩০ সালের মধ্যে বাজারের আকার পৌঁছাবে পাঁচ হাজার কোটি টাকায়।
আইসক্রিম একটি হিমায়িত মিষ্টিযুক্ত সুস্বাদু খাবার। খাত-সংশ্নিষ্টরা জানান, আইসক্রিম দুগ্ধজাত উপাদানের মিশ্রণ থেকে তৈরি, যাতে কমপক্ষে ১০ শতাংশ দুধের চর্বি থাকে। আইসক্রিম তৈরির প্রধান কাঁচামাল তরল দুধ, দুগ্ধজাত ক্রিম, গুঁড়া দুধ, কনডেন্সড মিল্ক, ভেজিটেবল ফ্যাট ইত্যাদি।

কাঁচামাল আমদানিনির্ভর
মানসম্পন্ন আইসক্রিম উৎপাদনের প্রথম শর্ত হচ্ছে মানসম্পন্ন কাঁচামাল। দেশে এ খাতে মানসম্পন্ন কাঁচামালের অভাব রয়েছে। ফলে সব কাঁচামাল আমদানি করতে হয়। মোট কাঁচামালের ৯৫ শতাংশ আসে বিভিন্ন দেশ থেকে। যেমন– গুঁড়া দুধ আমদানি হয় অস্ট্রেলিয়া, নিউজিল্যান্ড ও ইউরোপ থেকে। চকলেট ও ভেজিটেবল ফ্যাট আসে মালয়েশিয়া থেকে। স্ট্যাবিলাইজার, বিভিন্ন বাদাম, প্রাকৃতিক রং, ফ্লেভার ও বিভিন্ন ফল বা এর নির্যাস আসে ইউরোপ থেকে। মিল্ক ফ্যাট আমদানি হয় অস্ট্রেলিয়া ও নিউজিল্যান্ড থেকে। বাংলাদেশ থেকে তরল দুধ, চিনি ও ময়দা পাওয়া যায়। মোড়কীকরণে ব্যবহৃত বিশেষ র‍্যাপার আমদানি করা হয় থাইল্যান্ড, চীন ও তুরস্ক থেকে। 

যেভাবে বড় হচ্ছে বাজার
দেশে আইসক্রিমের বাজার কত টাকার বা কোন প্রতিষ্ঠানের কত শতাংশ শেয়ার রয়েছে, সে বিষয়ে তৃতীয় কোনো উৎস থেকে সুনির্দিষ্ট তথ্য-উপাত্ত পাওয়া যায়নি। তবে আইসক্রিম উৎপাদন ও বাজারজাতকারী প্রতিষ্ঠানগুলোর তথ্যমতে, করোনার আগের বছরগুলোতে এ খাতে প্রতিবছর প্রায় ১৫ শতাংশ হারে প্রবৃদ্ধি হয়েছে। ২০১৯ সালে বাজারের আকার ছিল এক হাজার ২৪০ কোটি টাকা। কিন্তু করোনা অতিমারির কারণে ২০২০ সালে এর পরিমাণ কমে প্রায় অর্ধেকে নেমে আসে। তবে পরের বছরই খাতটি ঘুরে দাঁড়ায়। ২০২১ সালের শুরুতেই আগের বছরের চেয়ে ৯২ থেকে ৯৮ শতাংশ বেড়ে যায়। তখন আইসক্রিমের বাজার পৌঁছায় প্রায় দেড় হাজার কোটি টাকায়। পুঁজিবাজারে তালিকাভুক্ত কোম্পানি গোল্ডেন হার্ভেস্ট অ্যাগ্রো ইন্ডাস্ট্রিজের ২০২০-২১ অর্থবছরের বার্ষিক প্রতিবেদন অনুসারে ২০২১ সালে আইসক্রিমের বাজারের আকার ছিল এক হাজার ৪০০ কোটি টাকার, যা ২০২০ সালের তুলনায় ৭৩০ কোটি টাকা বেশি। ওই বছর বাজারের আকার ছিল ৬৭০ কোটি টাকা। এ ক্ষেত্রে বাজারের আকার বেড়েছে ৯৩ শতাংশ। 

দিন দিন আইসক্রিমের বাজার বড় হলেও দেশি ব্র্যান্ডগুলো এর সম্পূর্ণ জোগান দেওয়ার মতো সক্ষমতা এখনও তৈরি হয়নি। তাই প্রতি মৌসুমে চাহিদার তুলনায় জোগানের স্বল্পতা থাকে।

কোম্পানি সাতটি, কার কত হিস্যা
গোল্ডেন হার্ভেস্টের ২০২০-২১ সালের প্রতিবেদনের তথ্যমতে, আইসক্রিমের বাজারে স্থানীয় ব্র্যান্ডগুলোর মধ্যে ৪৩ শতাংশ হিস্যা ঈগলুর। দ্বিতীয় অবস্থানে রয়েছে পোলার। বাজারে প্রতিষ্ঠানটির অংশ ২১ শতাংশ। বাজারের ১৩ শতাংশ শেয়ার নিয়ে তৃতীয় অবস্থানে কোয়ালিটি। ৮ শতাংশ নিয়ে চতুর্থ অবস্থানে রয়েছে ব্লুপ। 
বেলিসিমো ও জাএনজি ৭ শতাংশ শেয়ার নিয়ে পঞ্চম এবং লাভেলো ৫ শতাংশ শেয়ার নিয়ে ষষ্ঠ অবস্থানে রয়েছে। বাকি ৩ শতাংশ বাজার শেয়ার অন্যান্য আইসক্রিম প্রস্তুতকারকদের।
গত তিন-চার বছরে কোম্পানিগুলোর বাজার হিস্যায় পরিবর্তন এসেছে। এ খাতের উদ্যোক্তাদের তথ্যমতে, বাজারে এখনও শীর্ষস্থানে আছে ইগলু। তবে তাদের বাজার হিস্যা কমে ৩৪ শতাংশে নেমেছে। এ তথ্যের সঙ্গে খুব বড় ভিন্ন মত নেই ইগলুর। পোলার দ্বিতীয় স্থানে থাকলেও তার বাজার হিস্যা বেড়ে ৩২ শতাংশ হয়েছে। তৃতীয় স্থানে থাকা সেভয়ের বাজার হিস্যা ১৮ শতাংশ। এর বাইরে লাভেলো ও কোয়ালিটির ৬ শতাংশ এবং জাএনজি ও বেলিসিমোর ৩ শতাংশ করে বাজার হিস্যার তথ্য পাওয়া গেছে। ১ শতাংশ হিস্যা নিয়ে আছে ব্লুপ। 

আইসক্রিম কারা খায়, কখন খায়
খাতসংশ্লিষ্টরা জানান, আইসক্রিমের জনপ্রিয়তা সবচেয়ে বেশি ৭ থেকে ১৬ বছর বয়সী ভোক্তাদের মধ্যে। আবার ছেলেদের চেয়ে মেয়েরা আইসক্রিম বেশি খায়। 
আইসক্রিমের ব্যবসা সাধারণত মৌসুমভিত্তিক। এর চাহিদা সবচেয়ে বেশি থাকে এপ্রিল, মে ও জুন– এই তিন মাস। বছরের মোট বিক্রির প্রায় ৬০ শতাংশ হয় এ সময়। দ্বিতীয় সর্বোচ্চ বিক্রির সময় মার্চ, জুলাই ও আগস্ট। 

আর অফ-পিক মৌসুম ধরা হয় ফেব্রুয়ারি, সেপ্টেম্বর, অক্টোবর ও নভেম্বর মাসকে। এ সময় বিক্রি কম হয়। শীত মৌসুমে ডিসেম্বর- জানুয়ারিতে বিক্রি হয় না বলা চলে। 
বিভিন্ন কোম্পানি বিভিন্ন নামে আইসক্রিম বাজারজাত করে। তাদের স্বাদ এবং রূপে থাকে ভিন্নতা। স্টিক, কাপ, শঙ্কু, শরবত, কেক এমন অনেক ধরনের আইসক্রিম বাজারে পাওয়া যায়। সবচেয়ে বেশি বৈচিত্র্য ও ফ্লেভারের আইসক্রিম আছে ইগলুর। এর পরই আছে পোলারসহ অন্যরা। 

প্রতিবন্ধকতা
উদ্যোক্তারা জানান, আইসক্রিম স্পর্শকাতর ও তাপমাত্রা সংবেদনশীল পণ্য। এটি সংরক্ষণে প্রয়োজন ফ্রিজার। কুলিং বা ফ্রিজিংয়ের বিষয়টি সঠিকভাবে নিয়ন্ত্রণ করা না গেলে আইসক্রিম বাজারজাত করা যায় না। কখনও কখনও রাস্তায় দীর্ঘ সময় ধরে ট্রাফিক জ্যামে পড়ে থাকতে হয় পণ্যবাহী গাড়িগুলোকে। তখন আইসক্রিম গলে যায়। লোকসানও গুনতে হয়। 

আবার দেশের বাজারে উন্নতমানের বাণিজ্যিক ফ্রিজারের সংকট আছে। ফলে আমদানি করতে হয়। বর্তমানে ডিপ ফ্রিজ আমদানিতে ১০৪ শতাংশ শুল্ক থাকায় তা ব্যয়বহুল।  

আইসক্রিমের উৎপাদন থেকে শুরু করে পরিবহন এবং বাজারজাতকরণের প্রতিটি পর্যায়ে প্রশিক্ষিত জনবল দরকার। কিন্তু সরকারের পক্ষ থেকে এই ব্যবসার সঙ্গে জড়িত জনবলের নির্দিষ্ট কোনো প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা বা নীতিমালা নেই। 

সবচেয়ে বড় বাধা মূলধনি যন্ত্রপাতি আমদানিতে। আইসক্রিম সংশ্লিষ্ট মানসম্পন্ন যন্ত্রপাতি আমদানির ক্ষেত্রে সুনির্দিষ্ট কোনো এইচএস কোড নেই। অন্যান্য শিল্পের যন্ত্রপাতি আমদানির এইচএস কোডের সাথে সমন্বয় করে এ খাতের  যন্ত্রপাতি আমদানি করতে হয়, যা খুবই জটিল প্রক্রিয়া। 

উৎপাদকরা আরও জানান, ঈদ বা যে কোনো উৎসবে আইসক্রিমের চাহিদা বেশি থাকে। কিন্তু তখন মহাসড়কে পণ্য পরিবহনের নানা বাধাবিপত্তির সম্মুখীন হতে হয়। এ খাতে সরকারের সুস্পষ্ট নীতিমালা থাকলে এসব বাধা কাটিয়ে ওঠা সম্ভব। 

এ বিষয়ে ঢাকা আইসক্রিমের সেকশন ম্যানেজার নুরুজ্জামান রুপস সমকালকে বলেন, আইসক্রিমের কাঁচামাল আমদানিতে অনেক বেশি শুল্ক দিতে হয়। শুল্কহার কমালে এ খাতের প্রবৃদ্ধি আরও বাড়বে।

কর্মসংস্থান ও অর্থনীতিতে অবদান
বর্তমানে দেশে সাতটি দেশীয় কোম্পানি ব্র্যান্ডেড আইসক্রিম উৎপাদন ও বাজারজাত করে। এ ছাড়া জেলা ও বিভাগভিত্তিক ১০ থেকে ১৫টি কোম্পানি ছোট পরিসরে আইসক্রিম উৎপাদন ও বাজার করছে। প্রত্যক্ষভাবে এই খাতে যুক্ত রয়েছে ২০ হাজারের বেশি মানুষ। তবে পরোক্ষভাবে এই সংখ্যা তিন লাখের বেশি। 

রপ্তানি
বাংলাদেশের কোনো ব্র্যান্ড এখন পর্যন্ত আইসক্রিম রপ্তানি করেনি। তবে রপ্তানি নিয়ে কাজ শুরু করেছে ইগলু। ইগলুর প্রধান পরিচালন কর্মকর্তা (সিওও) শামীম আহমেদ সমকালকে বলেন, এটি বেশ সম্ভাবনাময় শিল্প। দিন দিন আইসক্রিমের চাহিদা বাড়ছে। তবে এই শিল্পের পুরো কাঁচামালই আমদানিনির্ভর। শুল্ক কমালে এই শিল্পের দ্রুত সম্প্রসারণ ঘটবে। রপ্তানি বিষয়ে তিনি বলেন, দেশের প্রথম ব্র্যান্ড হিসেবে ইগলু রপ্তানির উদ্যোগ নিচ্ছে।

আরও পড়ুন

×