ঢাকা বুধবার, ১৫ জুলাই ২০২৬

আর্জেন্টিনা-ইংল্যান্ড

পেছনে ফকল্যান্ড সামনে ফুটবল

পেছনে ফকল্যান্ড সামনে ফুটবল
×

ছবি- রয়টার্স

সঞ্জয় সাহা পিয়াল, আটলান্টা থেকে

প্রকাশ: ১৫ জুলাই ২০২৬ | ০৬:৩৪

কানসাস থেকে আটলান্টা- যেন এক লহমায় জীবনানন্দ দাশের রূপসী বাংলা থেকে সটান বোদলেয়ারের প্যারিসীয় আধুনিকতায় আছড়ে পড়া! শহরটিকে প্রথম দেখায় মনে হতে পারে স্রেফ কোকা-কোলা আর সিএনএনের প্রধান কার্যালয়ের একচ্ছত্র এক করপোরেট সামাজ্য, যেখানে বহুতল ভবনের কাচে দুপুরের রোদ ঠিকরে পড়ে। কিন্তু মার্টিন লুথার কিং জুনিয়রের এই শহরে আজও অধিকার আন্দোলনের বাতাস ফিসফিস কথা কয়। আজও এই শহর ইতিহাসের বদলা নেয়। সে কারণেই কিনা আর্জেন্টিনা-ইংল্যান্ড সেমিফাইনালের মহারণের উত্তাপে বারুদ হয়ে আছে এই আটলান্টা। চার দশকের জমানো ফকল্যান্ড যুদ্ধের এক তীব্র ঐতিহাসিক বৈরিতা নিয়ে মেসিদের নীল-সাদা মেঘেদের জমাট মনস্তাপ আর থ্রি লায়ন্সের হুঙ্কার মিলেমিশে এক আগ্নেয়গিরির জ্বালামুখ হয়ে আছে এই শহর। যেখানে ইংল্যান্ডকে হারিয়ে টানা দ্বিতীয়বারের মতো ফাইনালে যেতে চায় আর্জেন্টিনা। অন্যদিকে, ইংল্যান্ড চায় ৬০ বছরের শাপমোচন করে ফের বিশ্বকাপের ফাইনালে উঠতে দুই মহাদেশের দুই জুজুধানের এ যেন বিশ্বকাপেরই এক 'বিশ্বযুদ্ধ'।

আবেগ জড়ানো এই সেমিফাইনালের আগে মেসি-হ্যারি কেইনের বুটের ফিতা বাঁধার আগেই সম্মুখ সমরে নেমে গেছে দুই দেশের সমর্থকগোষ্ঠী আর মিডিয়া। আর্জেন্টিনা দল ফিফার আশীর্বাদপুষ্ট, রেফারির বদান্যে সেমিতে এসেছে- এমন একটি ন্যারেটিভ ব্রিটিশ ট্যাবলয়েড থেকে শুরু করে গার্ডিয়ানের সাংবাদিকরাও প্রতিষ্ঠিত করার চেষ্টায় আছেন। আর্জেন্টাইন সাংবাদিকরা ব্যস্ত আছেন ইংল্যান্ডের 'কাগুজে সিংহ' প্রতিষ্ঠিত করার চেষ্টায়। সমর্থকরাও বা কম কীসে-আটলান্টার ডাউনটাউনে ফুটবল সংস্কৃতির দুই সম্পূর্ণ ভিন্ন মেরু যেন এসে ধাক্কা খেয়েছে মার্সিডিজ বেঞ্জ স্টেডিয়ামের চারপাশে। 

একদিকে ব্রিটিশপাড়ার সেই চেনা উন্মাদনা- পাবগুলোর বারান্দা উপচে পড়ছে বিয়ারের মগে আর বাতাসে ভাসছে ৬০ বছরের ট্রফি খরা কাটানোর সেই অহংকারী স্লোগান- 'ইটস কামিং হোম'! লাল-সাদা ক্রুসেডার পতাকার নিচে ইংরেজ সমর্থকদের চোখে সেই চিরন্তন রাজকীয় দম্ভ। ঠিক তার উল্টোদিকে এক আদিম, আবেগের রুদ্রসমুদ্র! নীল-সাদা জার্সির ঢেউ আছড়ে পড়ছে আটলান্টার অলিম্পিক পার্কের ফোয়ারায়, যেখানে ম্যারাডোনার কাটআউট বুকে জড়িয়ে ড্রামের তালে তালে সুর উঠেছে 'মুচাচোস' গানের। লাতিনদের এই নাছোড়বান্দা কান্না আর গানের মধ্যে লুকিয়ে আছে ফকল্যান্ডের সেই পুঞ্জীভূত অভিমান। ১৯৮২ সালে মাত্র ৭৪ দিনের সেই অঘোষিত যুদ্ধে ব্রিটেনের অত্যাধুনিক সামরিক অস্ত্রের কাছে প্রাণ হারিয়েছিলেন ৬৪৯ জন তরুণ আর্জেন্টাইন সেনা। সেই সামরিক পরাজয় আর্জেন্টিনার মানুষের বুকে যে গভীর ক্ষত আর হাহাকার তৈরি করেছিল, তার কোনো রাজনৈতিক উপশম ছিল না, এখনও নেই। তাই তারা ফুটবলেই সব জবাব দিতে চায়।

বিশ্বকাপে পাঁচবারের দেখায় তিনবারই শেষ হাসি হেসেছে ইংরেজরা। ইতিহাসের রক্ত-মাংসের গভীরতা কি স্রেফ ওই সংখ্যা দিয়ে মাপা সম্ভব? ১৯৬২ আর ১৯৬৬-এর সেই আদিম দ্বৈরথে যেখানে ব্রিটিশদের যান্ত্রিক শ্রেষ্ঠত্বের কাছে নতিস্বীকার করতে হয়েছিল নীল-সাদাদের, ঠিক তার পরেই আসে মেক্সিকোর সেই তপ্ত দুপুর। ১৯৮৬-তে ম্যারাডোনা ম্যাজিকে বদলা নেয় আর্জেন্টিনা। এরপর ১৯৯৮ বিশ্বকাপেও পেনাল্টি শুটআউটে শেষ হাসি হেসেছিল আর্জেন্টিনা। তবে সর্বশেষ ২০০২-এ বেকহামের পেনাল্টি কিকে রাজকীয় প্রতিশোধ নেয় ইংল্যান্ড। এবার মেসিকে দিয়ে ফের বদলার বদলা নেওয়ার বিশ্বাস আর্জেন্টাইন সমর্থকদের। ছিয়াশির ম্যারাডোনার মতো ছাব্বিশের মেসিও ইংল্যান্ডকে হারিয়ে তাদের গর্বের জায়গা বাড়িয়ে দেবেন বলে আশা করে আছেন আর্জেন্টাইনরা। তারা একটি বারের জন্যও ঝুঁকির কথা ভাবতে চাইছেন না। আজকের ম্যাচটি জিততে না পারলে এই আটলান্টা থেকেই যে বিদায় নিতে হবে মেসিকে। শেষবারের মতো বিশ্বকাপের ম্যাচ হয়ে যাবে আজকের এই ম্যাচটিই।

ক্যারিয়ারের গোধূলিলগ্নে এসেও এই মেসি যে কখনোই ইংল্যান্ডের সঙ্গে কোনো ম্যাচ খেলেননি। যে ইংলিশ ম্যানদের নিয়ে আর্জেন্টাইনদের এতটা বিরাগ, সেই ইংল্যান্ডে গিয়েই তো বর্তমান আর্জেন্টিনা দলের সাত-সাতজন ফুটবলার সারাবছর লিগ খেলেন। ইংলিশ ফুটবল সংস্কৃতির সঙ্গে ওতপ্রোত জড়িয়ে এমিলিয়ানো মার্টিনেজ, ম্যাক অ্যালিস্টার, এনজো ফার্নান্দেজ, ক্রিস্টিয়ান রোমেরো, লিসান্দ্রো মার্টিনেজ, মার্কোস সেনসিরা তো সারাবছর ইংল্যান্ডেই থাকেন। এক ইংলিশ সাংবাদিক এসব জানিয়ে বলছিলেন, 'তোমরা বাংলাদেশিরা শুধু শুধু আর্জেন্টিনাকে সমর্থন করো। তোমরা ইংল্যান্ডকে সমর্থন করতে পারো। এবারে আমাদের দল দেখবে বিশ্বকাপ জিতবে।' বেলিংহাম, হ্যারি কেইনদের নিয়ে গর্ববোধ ছিল তাঁর চোখে-মুখে। অবশ্য তা হওয়ারই কথা। টমাস টুখেলের ইংল্যান্ড যে ১৩টি গোল করেছে, তার মধ্যে ৬টি জুড বেলিংহামের আর ৬টি হ্যারি কেইনের।

অর্থাৎ স্রেফ একটি গোল বাদে বাকি সবই এ দুই দানবের যুগলবন্দি। থ্রি লায়ন্সের সবচেয়ে বড় শক্তি লুকিয়ে আছে তাদের মধ্যমাঠের অভেদ্য জ্যামিতিক বুননে, যেখানে ডেক্লান রাইস আর বেলিংহামরা পাঁচ ম্যাচে মোট ২ হাজার ৮৪০টি পাস খেলেছেন, যার সাকসেস রেট চোখ কপালে তোলার মতো- ৮৮ শতাংশ। এখন পর্যন্ত তারা বিপক্ষের গোলমুখে ৭৬টি শট আছড়ে ফেলেছে। আর তারা হজম করেছে মাত্র ২টি গোল।

সেখানে আর্জেন্টিনা নকআউটে কেপ ভার্দের বিপক্ষে কষ্টার্জিত জয়, মিসরের সঙ্গে স্নায়ুক্ষয় আর সর্বশেষ সুইজারল্যান্ডের বিপক্ষে অতিরিক্ত সময়ে এসে জয়- কোচ স্কালোনিও বলছেন, কাতার বিশ্বকাপে এর চেয়ে ভালো খেলেছিলেন তারা। এবারের বিশ্বকাপে প্রতি ম্যাচে তারা গড়ে ১৮টি করে শট প্রতিপক্ষের বক্সে আছড়ে ফেলেছেন, অথচ রক্ষণভাগের সেই মজ্জাগত কূটাভাস যেন কিছুতেই কাটছে না। শেষ তিনটি ম্যাচের রণাঙ্গনে- কেপ ভার্দে ও মিসরের বিরুদ্ধে ডিফেন্সের গুরুতর ভুলে দুটি করে গোল হজম করতে হয়েছে বর্তমান বিশ্বচ্যাম্পিয়নদের। ক্রিস্টিয়ান রোমেরো আর লিসান্দ্রো মার্টিনেজদের মতো প্রিমিয়ার লিগের বাঘা বাঘা ডিফেন্ডার যখন হাইলাইনের ফিজিক্যাল ফুটবলের সামনে পড়েন, তখন তাদের পজিশনিংয়ের গলদগুলো বড্ড নগ্ন হয়ে ধরা পড়ে। বিশেষ করে নাহুয়েল মোলিনা ও নিকোলাস ট্যাগলিয়াফিগোদের মতো উইং-ব্যাকরা যখন আক্রমণে উঠে যান, তখন রক্ষণের দুই প্রান্তে যে অতিকায় শূন্যতার সৃষ্টি হয়, আজ রাতে হ্যারি কেইন আর জুড বেলিংহামদের মতো পারফরমাররা ঠিক সেখানেই ছোবল মারার জন্য ওত পেতে থাকবে। 

আর্জেন্টিনার এই নড়বড়ে রক্ষণভাগই স্কালোনির সবচেয়ে বড় মনস্তাত্ত্বিক মরণফাঁদ। আটলান্টার কৃত্রিম আলোর নিচে আজ রাতে মেসিদের বিজয়োৎসব চলবে, নাকি এই আত্মঘাতী ফাটল দিয়েই ব্রিটিশ কামান ছারখার করে দেবে লাতিন সাম্রাজ্য- আটলান্টার বারুদের মুখে দাঁড়িয়ে উত্তরটা তোলা রইল।

আরও পড়ুন

×