দুই বছরে ৩৩০ পুকুর খনন, অভিযান জরিমানাতেই সীমাবদ্ধ
জমিতে পুকুর খনন- সমকাল
সনি আজাদ, চারঘাট (রাজশাহী)
প্রকাশ: ২১ ফেব্রুয়ারি ২০২৩ | ১৮:০০ | আপডেট: ২২ ফেব্রুয়ারি ২০২৩ | ০৬:৩৮
রাজশাহীর চারঘাটে জমির প্রকৃতি পরিবর্তন করে পুকুর খনন করা হচ্ছে। গত দুই বছরে অবৈধভাবে ৩৩০টি পুকুর খনন করা হয়েছে। এতে আবাদি জমির পরিমাণ কমে যাচ্ছে। পাশাপাশি পানি নিস্কাশন ব্যবস্থা অকার্যকর হয়ে জলাবদ্ধতা দেখা দিচ্ছে। খনন থামাতে প্রশাসনের অভিযান জরিমানাতেই আটকে আছে। জরিমানা পরিশোধের পর ফের খনন করা হচ্ছে পুকুর।
মৎস্য অফিসের তথ্যমতে, দুই বছর আগেও উপজেলায় পুকুরের সংখ্যা ছিল ৩ হাজার ৫৩টি। বর্তমানে এ সংখ্যা দাঁড়িয়েছে ৩ হাজার ৩৮৩টিতে। অর্থাৎ দুই বছরে ৩৩০টি পুকুর খনন করা হয়েছে। তবে স্থানীয় কৃষকদের দাবি, এ সময়ের মধ্যে চার শতাধিক পুকুর খনন করা হয়েছে। খনন বন্ধে ২০২১ সালের ১৫ ফেব্রুয়ারি থেকে শুরু করে এখন পর্যন্ত ৯ বার ভ্রাম্যমাণ আদালত পরিচালনার মাধ্যমে ৯টি মামলা দেওয়া হয়েছে। এর মধ্যে আটজনকে জরিমানা ও একজনকে ১৫ দিনের বিনাশ্রম কারাদণ্ড দেওয়া হয়েছে বলে প্রশাসন সূত্রে জানা গেছে।
তবে এ শাস্তি যথেষ্ট নয় বলে জানিয়েছেন বাংলাদেশ পরিবেশ আন্দোলন বাপার উপজেলা আহ্বায়ক সাইফুল ইসলাম বাদশা ও সুশাসনের জন্য নাগরিক সুজনের উপজেলা সভাপতি মো. কামরুজ্জামান। তাঁদের ভাষ্য, পুকুর খননের কারণে জলাবদ্ধতার কবলে পড়েছে আড়াই হাজার বিঘা জমি। এরপরও এ কার্যক্রম বন্ধ হয়নি। আর্থিক জরিমানা দিয়ে পুকুর খননকারীরা ফসলি জমি নষ্ট করার দায় থেকে মুক্তি পাচ্ছে।
উপজেলা মৎস্য কর্মকর্তা ওয়ালিউল্লাহ মোল্লাহ বলেন, আমরা চাষিদের মৎস্য চাষে পরামর্শ দিই; জমিতে পুকুর খননে নয়। এরপরও এর ব্যাপকতা বেড়ে যাচ্ছে। উপজেলার বিভিন্ন সভায় বিষয়টি নিয়ে আলোচনাও হয়েছে।
সরেজমিন উপজেলার রায়পুর, ভায়ালক্ষ্মীপুর, ঝিকরা, শলুয়া, সাদীপুর, বামনদিঘী ও নন্দনগাছী এলাকায় গিয়ে দেখা যায়, রাতের আঁধারে পুকুর খনন করা হচ্ছে। কাটা হচ্ছে আম ও কুলবাগান। এতে বর্ষা মৌসুমে জলাবদ্ধতার আশঙ্কা করছেন পার্শ্ববর্তী জমির মালিকরা। এ ছাড়া খননের মাটি বহনের কাজে ব্যবহূত ট্রাক্টরে ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে পাকা সড়ক। জড়িতরা বলছেন, ফসল আবাদের চেয়ে মাছ চাষে লাভ বেশি। পুকুর কাটার পর মাটি বিক্রি করা যাচ্ছে ইটভাটায়। এতে বাড়তি টাকা পাওয়া যায়।
বাঁকড়া এলাকায় গিয়ে দেখা যায়, আমবাগানে পুকুর খনন করা হচ্ছে। এর সঙ্গে জড়িত স্থানীয় আব্দুর রশীদ। গত এক বছরে এ এলাকায় অন্তত ১৮টি পুকুর খনন করেছেন তিনি। ফোনে তিনি বলেন, সবাইকে ভাগ দিয়েই পুকুর খনন করছি।
মেরামাতপুর গ্রামের বাসিন্দা আব্দুল কাদের বলেন, পুকুর খননের কারণে পাতির বিল বছরের অর্ধেক সময় পানির নিচে থাকে। আগে আড়াই বিঘা জমিতে ধান চাষ করে সারাবছরের চালের জোগান হতো। পাশাপাশি ধান বিক্রি করেছি। বিলের পানি প্রবাহের মুখে পুকুর খনন করায় ধান চাষ বন্ধ হয়ে গেছে।
এদিকে পুকুর খনন নিয়ে বিভিন্ন এলাকায় সংঘর্ষের ঘটনাও ঘটছে। জাফরপুর, বামনদিঘী ও নন্দনগাছী এলাকলায় পুকুর খনন বন্ধ করতে গিয়ে চার কৃষক আহত হয়েছেন। জাফরপুর এলাকায় গত বছর বেশ কয়েকটি পুকুর খনন করা হয়েছে। জাফরপুর গ্রামের এজাজুল হক বলেন, গত বছর পুকুর খননের সময় ভূমি অফিস ও থানা পুলিশকে বারবার জানালেও কোনো ব্যবস্থা নেয়নি। এ কারণে এ বছর প্রশাসনকে জানাইনি। নিজেরাই প্রতিরোধ গড়ে তুলেছি।
চারঘাট মডেল থানার ওসি মাহবুবুল আলম বলেন, অবৈধ পুকুর খননের বিষয়ে ব্যবস্থা নিতে কঠোর নির্দেশনা রয়েছে। তাই অভিযোগ পেয়ে ব্যবস্থা না নেওয়ার বিষয়টি সত্য নয়।
উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা মো. সোহরাব হোসেন বলেন, প্রশাসনের বিভিন্ন দপ্তর অবৈধ পুকুর খনন বন্ধে কাজ করে যাচ্ছে।
