ঢাকা বৃহস্পতিবার, ০৪ জুন ২০২৬

উৎপাদন খরচের চেয়ে পাইকারিতে দাম কম, খামারিদের নীরব কান্না

উৎপাদন খরচের চেয়ে পাইকারিতে দাম কম, খামারিদের নীরব কান্না
×

সম্প্রতি দিঘড় গ্রামে আব্দুর রহিমের খামার পরিদর্শণ করেন বাহাউদ্দিন সারোয়ার রেজভি সমকাল

মাসুম মিয়া, ঘাটাইল (টাঙ্গাইল)

প্রকাশ: ০৩ ডিসেম্বর ২০২৫ | ০৮:৩০ | আপডেট: ০৩ ডিসেম্বর ২০২৫ | ১০:০১

| প্রিন্ট সংস্করণ

‘ছয় মাস দিন-রাত পরিশ্রম করেছি। মুরগির বাচ্চার যত্ন নিয়েছি সন্তানের মতো করে। খাদ্য ও ওষুধ বাবদ লাখ লাখ টাকার জোগান দিয়েছি এনজিও ও ব্যাংক ঋণের মাধ্যমে। ধারদেনা করেছি আত্মীয়স্বজনের থেকে। অল্প কিছুদিন হলো মুরগি ডিম দেওয়া শুরু করেছে। মুরগি পালন করে যে স্বপ্ন লালন করেছিলাম, তা দিন গড়ায়ে পরিণত হচ্ছে দুঃস্বপ্নে। ডিমের দাম কম। ১০ হাজার মুরগিতে প্রতিদিন ক্ষতি হচ্ছে ১৬ হাজার টাকা।’ কথাগুলো বলছিলেন খামারি রফিকুল ইসলাম। প্রতি ডিমে উৎপাদন খরচ ৯ টাকা। সরকার দাম নির্ধারণ করে দিয়েছে ১০ টাকা ৫৮ পয়সা। বর্তমানে পাইকারি দরে বিক্রি হচ্ছে ৭ টাকা ২০ পয়সায়। দাম পড়ে যাওয়ায় নীরবে কাঁদছেন ঘাটাইল উপজেলার মুরগির খামারিরা।

উপজেলা প্রাণিসম্পদ অফিসের তথ্যমতে, ডিম উৎপাদন করে এমন মুরগির খামারের সংখ্যা আছে এক হাজার ৫৫১টি। এর মধ্যে বড় খামার ৪৫টি। মাঝারি খামার প্রায় ৫০০টি এবং প্রান্তিক খামার আছে হাজারের মতো। এসব খামারে মুরগি আছে প্রায় ২৩ লাখ। প্রায় পাঁচ হাজার পরিবার সরাসরি মুরগি পালনের সঙ্গে জড়িত। এ ছাড়া মুরগির খাবার সরবরাহ করার জন্য ফিডমিল রয়েছে বড় তিনটি এবং ক্ষুদ্র মিলের সংখ্যা বিশের অধিক। মিলগুলোতে কর্মসংস্থানের ব্যবস্থা হয়েছে অনেকের। পশুখাদ্যের দোকান আছে ৭৪টি। মুরগির ওষুধের দোকান শতাধিক। ডিমের পাইকারি ব্যবসায়ী আছেন ৪৯ জন। মুরগির খাঁচা তৈরির কারখানা ১২টি। ডিমের দাম কমে যাওয়ায় এরই মধ্যে প্রভাব পড়তে শুরু করেছে এসব প্রতিষ্ঠানে।

খামারিরা জানান, শীতকালে ডিমের দাম তুলনামূলকভাবে বেশি থাকে। কিন্তু এ বছর তার উল্টো। শালিয়াবহ গ্রামের খামারি শহিদুল ইসলাম জানান, তাঁর খামারে ২০ হাজার মুরগি আছে। প্রতিদিন ডিম আসে প্রায় ১৬ হাজার। প্রতিটির উৎপাদন খরচ ৯ টাকার বেশি। বিক্রি হচ্ছে ৭ টাকা দরে। প্রতিদিন ক্ষতি ৩২ হাজার টাকা। মাসে ক্ষতি ৯ লাখ ৬০ হাজার। সামনে রমজান মাস আসছে ডিমের দাম আরও কমে যাবে। কিন্তু এই ক্ষতি দেখার কেউ নেই।

খামারে ২০ হাজার মুরগি আছে লক্ষিন্দর ইউনিয়নের দুলালিয়া গ্রামের খলিলুর রহমানের। তাঁর ভাষ্য, বছরজুড়েই ডিমের দাম কম ছিল। মাঝে কিছুদিন বেড়েছিল। বাড়ন্ত ওই সময়টার স্থায়িত্ব ছিল ১৫ দিন। এখন তাঁর দিনে ক্ষতি হচ্ছে ৪০ থেকে ৪৫ হাজার টাকা। তিনি জানান, এনজিও থেকে ঋণ করেছেন ৭০ লাখ টাকা। যার মাসিক কিস্তি দিতে হয় ৭ লাখ টাকা। ঠিকমতো কিস্তি দিতে পারছেন না। খামার বন্ধ করেইবা ঋণের টাকা শোধ করবেন কীভাবে। এক সপ্তাহ বাজার ভালো থাকলে সবাই প্রচার করে। এখন তো তাদের দিকে কেউ তাকান না। 

খামারি রুহুল আমিন বলেন, ছয় মাস টাকা খরচ করার পর ডিম উৎপাদন শুরু হয়। বর্তমানে সবকিছুর দাম বেশি। ডিমের দাম একটু বেশি হলেই ভোক্তা অধিকারের লোকের মাথাব্যথা শুরু হয়। খামারিরাও তো ভোক্তা। মুরগির খাদ্য তৈরি করতে প্রয়োজন হয় সয়াবিন, ভুট্টা ও মেডিসিন। বাজারে এসবের দাম আগের থেকে অনেক বেশি। তাঁর প্রশ্ন এসব দেখার দায়িত্ব কার?

ডিমের পাইকারি ব্যবসায়ী আশিকুল ইসলাম বলেন, ‘আমরা ডিম বিক্রি করি ঢাকা ও চট্টগ্রামে। ডিমের সবচেয়ে বড় আড়ৎ ঢাকার তেঁজগাও। সেখানে ডিমের দাম অনেক কম। কেন কম আমরা জানি না। সামনে দাম কমার আরও আশঙ্কা আছে। যেহেতু রমজান মাস আসন্ন। রমজানে ডিমের দাম কম থাকে। এদিকে খামারিদের অবস্থা খুব খারাপ।’

উপজেলা প্রাণিসম্পদ কর্মকর্তা ডা. বাহাউদ্দিন সারোয়ার রেজভির ভাষ্য, বর্তমানে ডিমের বাজার উৎপাদন খরচের তুলনায় কিছুটা কম, এটা সত্য। ডিমের উৎপাদন আগের যে কোনো সময়ের চেয়ে বেশি, যা খাদ্য নিরাপত্তার জন্য একটি বড় ইতিবাচক দিক। উৎপাদন খরচ কমাতে ফিড ম্যানেজমেন্ট, রোগ প্রতিরোধে ভ্যাকসিনেশন ও দক্ষ ব্যবস্থাপনা বিষয়ে সঠিক পরামর্শ দিয়ে থাকেন তারা। তবে খামারিদের টিকে থাকার জন্য খামারি, ব্যবসায়ী ও সরকারি সহযোগিতার সমন্বয়ে ডিমের বাজার স্থিতিশীল হওয়া জরুরি।

 

আরও পড়ুন

×