আক্রান্ত বেশির ভাগের বয়স ৪ থেকে ৮ বছর
চট্টগ্রামে জ্বরে ভুগছে অনেক শিশু, বাড়ছে উৎকণ্ঠা
অনেকের শরীরে দেখা যাচ্ছে হামের লক্ষণ
চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে প্রতিদিন বহির্বিভাগ ও ভর্তি হওয়া রোগীর অর্ধেকের বেশি সংখ্যক জ্বরে আক্রান্ত শিশু। বৃহস্পতিবার তোলা সমকাল
শৈবাল আচার্য্য, চট্টগ্রাম
প্রকাশ: ০৩ এপ্রিল ২০২৬ | ০৮:১৪
| প্রিন্ট সংস্করণ
তিন দিন ধরে জ্বরে ভুগছে চার বছরের শিশু লুবাবা রহমান। সকালের দিকে কিছুটা কম থাকলেও বিকেলে বাড়তে থাকে শরীরের তাপমাত্রা। দুদিন আগে মধ্যরাতে তাপমাত্রা বেড়ে দাঁড়ায় ১০৪ ডিগ্রিতে। লুবাবার মতোই চট্টগ্রামে অনেকের ঘরে জ্বরের প্রার্দুভাব। আক্রান্ত বেশির ভাগের বয়স চার থেকে আট বছর। এক পরিবারে আক্রান্ত হচ্ছে একাধিক শিশু। কোনো কোনো পরিবারে জ্বরে আক্রান্ত হচ্ছে সব বয়সী।
চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ (চমেক) হাসপাতালের তথ্য বলছে, প্রতিদিন বহির্বিভাগ ও ভর্তি হওয়া রোগীর অর্ধেকের বেশি পাওয়া যাচ্ছে জ্বরে আক্রান্ত। হামের ভয়াবহতার মধ্যে শিশুরা জ্বরে আক্রান্ত হওয়ায় বাড়ছে উৎকণ্ঠা।
চট্টগ্রাম সিভিল সার্জন কার্যালয়ের তথ্য বলছে, গত বুধবার পর্যন্ত হাম সন্দেহে ৭৬ রোগী বিভিন্ন হাসপাতালে ভর্তি হয়েছে। এর মধ্যে আট শিশুর শরীরে হামের জীবাণু শনাক্ত হয়েছে। হামে এরই মধ্যে দুজনের মৃত্যু হয়েছে। হাম শনাক্ত করতে ১১১ জনের নমুনা সংগ্রহ করে ঢাকায় পাঠানো হয়েছে।
চমেক হাসপাতালের শিশু বিভাগের ‘মিজেলস ব্লকের’ আওতায় এখন পর্যন্ত ৪৮ শিশু ভর্তি হয়েছে। এসব শিশুর মধ্যে অন্তত ৩৫ জন জ্বরে আক্রান্ত। গত বুধবার এক দিনেই হামে আক্রান্ত সন্দেহে ১৮ শিশু হাসপাতালে ভর্তি হয়। এর আগের দিন একসঙ্গে ভর্তি হয় ২৬ জন। এর মধ্যে পাঁচজনকে পিআইসিইউতে ভর্তি করা হয়েছে।
খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, সরকারি হাসপাতালের পাশাপাশি জ্বরের রোগী বাড়ছে বেসরকারি মা ও শিশু হাসপাতাল, চট্টগ্রাম ইন্টারন্যাশনাল মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল, পার্কভিউ, ম্যাক্স, সিএসসিআর, মেডিকেল সেন্টার, মেট্রোপলিটন, ন্যাশনাল, ডেল্টা, পলি, শেভরন, এপিকসহ প্রায় সব হাসপাতালে।
জ্বর নিয়ে ভর্তি হওয়া শিশু আনাফ ইসলামের মা পপি বেগম বলেন, মধ্যরাতে দেখি জ্বরে পুরো শরীর পুড়ে যাচ্ছে। সকালে জ্বরের মাত্রা আরও বেড়ে যায়। এর সঙ্গে যোগ হয় কাশি, শ্বাসকষ্ট। দুদিন ধরে তার শরীরের কয়েকটি অংশে লালচে ফুসকুড়ি দেখা গেছে। হামের বেশ কিছু লক্ষণ থাকায় কয়েকটি পরীক্ষা দিয়েছেন চিকিৎসকরা।
শিশু নাফিজার মা আইরিন রহমান বলেন, চার দিন ধরে জ্বরে ভুগছে সে। দিনে জ্বরের মাত্রা কিছুটা কম থাকলেও রাতে বেড়ে যায়। দুদিন ধরে দেখা যাচ্ছে শ্বাসকষ্ট। মুখে কিছু খেতেও চাইছে না সে।
চট্টগ্রাম নগরের মোহাম্মদপুরের বাসিন্দা মো. সাকিব বলেন, রাতের খাবার খেয়ে ঘুমিয়ে পড়ে আমার পাঁচ বছরের মেয়ে তাবিবা। সকালে ঘুম থেকে ওঠার পর দেখি তার শরীরে জ্বর। এর দুদিনের মাথায় দুই বছরের ছোট মেয়েটাও জ্বরে আক্রান্ত হয়।
এ ব্যাপারে শিশু ওয়ার্ডের বিভাগীয় প্রধান অধ্যাপক ডা. মোহাম্মদ মুসা মিঞা বলেন, জ্বর-পরবর্তী অনেকের শরীরে কাশি, শ্বাসকষ্টসহ নানা জটিলতা দেখা দিচ্ছে। এ কারণে নানা পরীক্ষা-নিরীক্ষার প্রয়োজন হচ্ছে। শারীরিক অবস্থা খারাপ হওয়া অনেককে হাসপাতালেও ভর্তি হতে হচ্ছে।
চট্টগ্রাম ইন্টারন্যাশনাল মেডিকেল কলেজের অধ্যক্ষ শিশু বিশেষজ্ঞ অধ্যাপক ডা. মো. মুসলিম উদ্দিন সবুজ বলেন, জ্বরে আক্রান্ত হওয়ার পর অনেকের শরীরে হামের নানা লক্ষণ দেখা দিচ্ছে। তাই এ ব্যাপারে সবাইকে সতর্ক হতে হবে। তবে অনেক অভিভাবক চিকিৎসক না দেখিয়ে স্থানীয় ফার্মেসি থেকে ওষুধ খাওয়াচ্ছেন। এতে শিশুর শারীরিক অবস্থা আরও জটিল হতে পারে। হামের প্রাদুর্ভাবের এই সময়ে জরুরি প্রয়োজন ছাড়া শিশুদের ঘরের বাইরে না নেওয়া উচিত। শিশুদের শরীরে জ্বর বা অন্য কোনো অস্বাভাবিকতা দেখা দিলেই অবহেলা না করে দ্রুত চিকিৎসক দেখাতে হবে। চিকিৎসকের পরামর্শ ছাড়া অ্যান্টিবায়োটিক খাওয়ানো যাবে না।
চট্টগ্রামের সিভিল সার্জন ডা. জাহাঙ্গীর আলম বলেন, জ্বরে আক্রান্তের পর অনেকের শরীরে হামের নানা উপসর্গ দেখা দিচ্ছে। হামের লক্ষণ থাকা অনেক শিশুর নমুনা ঢাকার পাবলিক হেলথ ইনস্টিটিউটের (আইপিএইচ) ন্যাশনাল পোলিও অ্যান্ড মিসেলস-রুবেলা ল্যাবরেটরিতে (এনপিএমএল) পাঠানো হচ্ছে। হামের প্রকোপের এ সময়ে শিশুদের নিয়ে মা-বাবার বাড়তি সতর্ক থাকতে হবে। এ ব্যাপারে উপজেলা পর্যায়ে নানা নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে।
- বিষয় :
- মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়
