ঢাকা বৃহস্পতিবার, ০৪ জুন ২০২৬

শহর পেরিয়ে এবার পাহাড়ঘেরা চবিতে বর্ষবরণ উৎসব 

শহর পেরিয়ে এবার পাহাড়ঘেরা চবিতে বর্ষবরণ উৎসব 
×

বর্ষবরণে প্রস্তুত চবি ক্যাম্পাস। ছবি-সমকাল

চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয় 

প্রকাশ: ১৩ এপ্রিল ২০২৬ | ১৭:২৩

একসময় পহেলা বৈশাখ মানেই ছিল শহরের পথে নামা চারুকলার রঙে, শোভাযাত্রার ছন্দে, লোকজ সুরের ভিড়ে এক নগর উৎসব। চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের চারুকলা ইনস্টিটিউটও সেই ধারার বাইরে ছিল না; তাদের প্রধান আয়োজন হতো শহরেই, আর ক্যাম্পাসে বৈশাখ থাকত সীমিত পরিসরে। তবে এবারের বৈশাখে সেই চিত্র বদলাচ্ছে, শহরের গণ্ডি পেরিয়ে উৎসবের কেন্দ্র হয়ে উঠছে পাহাড়ঘেরা বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাস।

অনাড়ম্বর আয়োজন থেকে যাত্রা

চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ে বৈশাখ উদযাপনের সূচনা ১৯৭৩ সালে। চারুকলা বিভাগের শিক্ষক-শিক্ষার্থীদের উদ্যোগে শুরু হওয়া সেই আয়োজন ছিল একেবারেই সরল। প্রভাতী গান, পান্তা-ভাত আর ছোট পরিসরের মিলনমেলা ছিল উৎসবের মূল রূপ।

চারুকলা বিভাগের প্রাক্তন শিক্ষক শিল্পী ও অধ্যাপক আবুল মনসুর বলেন, ‘তখন বৈশাখ মানে ছিল একসঙ্গে বসা, গান গাওয়া আর নিজেদের সংস্কৃতিকে অনুভব করা। আয়োজন ছোট ছিল, কিন্তু আবেগটা ছিল অনেক বড়।’

শহরমুখী চারুকলার ভৌগোলিক বাস্তবতা 

চারুকলা ইনস্টিটিউট শহরে অবস্থিত হওয়ায় বড় আয়োজন ধীরে ধীরে বিশ্ববিদ্যালয় থেকে নগরকেন্দ্রিক হয়ে ওঠে। ডিসি হিল, সিআরবি কিংবা চারুকলা প্রাঙ্গণ এসব জায়গাতেই গড়ে ওঠে বৈশাখের মূল অনুষ্ঠান। ফলে একদিকে শহরে চারুকলার বর্ণিল আয়োজন, অন্যদিকে ক্যাম্পাসে সীমিত কর্মসূচি এভাবে তৈরি হয় উৎসবের দ্বৈত ধারা।

২০২৫ সালে বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন এককভাবে ক্যাম্পাসে বৈশাখ উদযাপন করে, আর চারুকলা শহরে আলাদাভাবেই আয়োজন করে। একই বিশ্ববিদ্যালয়ের বৈশাখ তখন দুই ভিন্ন স্থানে একটি শহরে, অন্যটি ক্যাম্পাসে।

চবি চারুকলার শিক্ষার্থী ও শিল্পী রশিদ হায়দার হোস্টেলের সহ-সভাপতি (ভিপি) খন্দকার মাসরুর আল ফাহিম বলেন, বিগত বেশ কিছু বছর ধরে চারুকলা ইনস্টিটিউট মূল ক্যাম্পাসে না থাকায়, বৈশাখ উৎযাপন সীমিত মনে হতো। আর বিশ্ববিদ্যালয়ের বৈশাখের স্বাদ পেত নগরের মানুষজন। আমাদের আন্দোলন ও সংগ্রামের পর চারুকলা মূল ক্যাম্পাসে ফিরে এসেছে। আমাদের বৈশাখ উৎযাপন ও এবার সবার থেকে ভিন্ন হবে।

এবার ২০২৬ সালের বৈশাখ উদযাপনে চারুকলা ও বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন যৌথভাবে ক্যাম্পাসে আয়োজন করছে। চারুকলার পরিচালক তাসলিমা আকতার বলেন, আমরা চাচ্ছিলাম চারুকলার শিল্পচর্চা ও বিশ্ববিদ্যালয়ের অংশগ্রহণ এক জায়গায় আসুক। ক্যাম্পাসে আয়োজন হলে শিক্ষার্থীদের অংশগ্রহণ বাড়বে এবং উৎসব আরও অন্তর্ভুক্তিমূলক হবে।

জাঁকজমক ও অংশগ্রহণের বিস্তার

সময়ের সঙ্গে চবির বৈশাখ পেয়েছে নতুন মাত্রা। শোভাযাত্রা এখন প্রধান আকর্ষণ, যেখানে বিশালাকৃতির লোকজ মোটিফ তৈরি করেন চারুকলার শিক্ষার্থীরা।

এর পাশাপাশি বৈশাখী মেলা, সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান, লোকজ খাবারের আয়োজন সব মিলিয়ে ক্যাম্পাসজুড়ে তৈরি হয় উৎসবমুখর পরিবেশ।

চবি চারুকলার আরেক শিক্ষার্থী নুসরাত জাহান বলেন, এখন বৈশাখ মানে শুধু অনুষ্ঠান না, এটা একটা অভিজ্ঞতা। ক্যাম্পাসটাই একটা উৎসবের জায়গায় পরিণত হয়।

সংস্কৃতি বিশ্লেষকদের মতে, এই পরিবর্তন সময়ের স্বাভাবিক ধারা। নৃ-বিজ্ঞান বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক খাদিজা মিতু বলেন, সংস্কৃতি কখনো স্থির থাকে না। বৈশাখ আগে ছিল কৃষিনির্ভর সমাজের উৎসব, এখন তা শহুরে ও শিক্ষিত সমাজের পরিচয়ের অংশ হয়ে উঠেছে। চবির ক্ষেত্রে আমরা দেখছি, স্থানিক পরিবর্তনের মাধ্যমে উৎসব নতুন রূপ নিচ্ছে।

তিনি আরও বলেন, এই পরিবর্তন নেতিবাচক নয়। বরং এটি দেখায়, একটি সংস্কৃতি কীভাবে নিজেকে নতুন প্রজন্মের সঙ্গে খাপ খাইয়ে নিচ্ছে।

চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের বৈশাখ এখন এক নতুন অধ্যায়ে। শহর থেকে ক্যাম্পাসে স্থানান্তর, আলাদা আয়োজন থেকে যৌথ উদ্যোগ সব মিলিয়ে এটি একটি সাংস্কৃতিক রূপান্তরের গল্প।

আরও পড়ুন

×