ঢাকা মঙ্গলবার, ২৩ জুন ২০২৬

জামিন জালিয়াতির দায় এড়াচ্ছেন প্রধান আসামি-আইনজীবী

কুকি-চিন পোশাক জব্দ মামলা

জামিন জালিয়াতির দায় এড়াচ্ছেন  প্রধান আসামি-আইনজীবী
×

 আহমেদ কুতুব, চট্টগ্রাম

প্রকাশ: ০৫ মে ২০২৬ | ০৭:৫২

| প্রিন্ট সংস্করণ

সশস্ত্র সংগঠন কুকি-চিন ন্যাশনাল ফ্রন্টের (কেএনএফ) জন্য ২০ হাজার সামরিক পোশাক তৈরির ঘটনার মামলায় তথ্য গোপন ও জামিন আদেশ জালিয়াতির দায় এড়াচ্ছেন প্রধান আসামি ও তাঁর আইনজীবীরা।

প্রধান আসামি ও পোশাক তৈরির কারখানার মালিক সাহেদুল ইসলামের দাবি, কারাগারে থাকার সময় আইনজীবীদের ওপর জামিনের দায়িত্ব দেন। এ ঘটনায় জালিয়াতি হয়ে থাকলে আইনজীবীরা জানেন। দায় এড়াচ্ছেন আইনজীবীরাও। 

এদিকে এ মামলায় গত এক বছরে পুলিশের চার কর্মকর্তাকে তদন্তের দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে। এ সময়ের মধ্যে ১১ জন আসামি গ্রেপ্তার হন। এর মধ্যে ৯ আসামি জামিনে মুক্তি পেয়েছেন। 
প্রধান আসামি সাহেদুল ইসলাম চট্টগ্রাম কেন্দ্রীয় কারাগার থেকে মুক্তি পাওয়ার বিষয়টি সম্প্রতি উচ্চ আদালতের নজরে এলে তদন্তের নির্দেশ দিয়েছেন প্রধান বিচারপতি জুবায়ের রহমান চৌধুরী।
হাইকোর্টের জামিন আদেশের জাল কাগজ চট্টগ্রাম চিফ মেট্রোপলিটন ম্যাজিস্ট্রেট (সিএমএম) আদালতে দাখিল করে জামিননামা জমা দেওয়ার দায় আইনজীবীরা নিচ্ছেন না। 

জানতে চাইলে মামলার প্রধান আসামি সাহেদুল ইসলাম সমকালকে বলেন, ‘হাইকোর্টে জামিন শুনানির সময় আমি কারাগারে ছিলাম। আইনজীবী সাদ্দাম হোসেনকে হাইকোর্টে আমার জামিন করানোর জন্য সব দায়িত্ব দিয়েছিলাম। তিনি কীভাবে জামিন করিয়েছেন আমার জানা নেই। জালিয়াতি যদি হয়েও থাকে, এর সঙ্গে আমার কোনো সম্পৃক্ততা নেই।’

চট্টগ্রাম আদালতে সাহেদুলের জামিননামা জমা দিয়েছিলেন আইনজীবী ইমরুল মাহমুদ। তিনি বলেন, ‘আমার সিনিয়র সাদ্দাম হোসেনের নির্দেশে আমি জামিননামা দাখিল করেছিলাম। তিনি সবকিছু বলতে পারবেন।’ 

জানতে চাইলে আইনজীবী সাদ্দাম হোসেন বলেন, ‘আসামি সাহেদুল ইসলামের ভাই জিয়া আমার পার্শ্ববর্তী এলাকার বাসিন্দা। সেই সূত্রে হাইকোর্টে তাঁর ভাইয়ের জামিন হয়েছে জানিয়ে তাঁর ভাইকে কারামুক্তির অনুরোধ করেন। নিম্ন আদালতে জামিননামা দাখিল করতে অনুরোধ করায় ইমরুলকে জামিননামা দাখিল করতে বলেছি। হাইকোর্টে আমি আসামিপক্ষের জামিনের কোনো তদবির করিনি। জালিয়াতির বিষয়ে আমি অবগত নই।’ 
এক বছর ধরে কারখানায় তালা ঝুলছে
গত শনিবার দুপুরে চট্টগ্রামে নয়ারহাট শাহ হাবিবুল্লাহ রোডে গিয়ে দেখা যায় আলোচিত ‘রিংভো অ্যাপারেলস লিমিটেড’ কারখানায় তালা ঝুলছে। কারখানাটির শতাধিক কর্মী, কর্মকর্তা-কর্মচারী রয়েছেন। এক সময় তাদের পদচারণায় কারখানাটি সরব থাকত। এখন তারা কেউ কারখানায় যান না। 

জালিয়াতির তথ্য নেই তদন্ত কর্মকর্তার কাছে 
কেএনএফের সামরিক পোশাক জব্দের মামলায় গত সপ্তাহে চতুর্থ তদন্ত কর্মকর্তা হিসেবে দায়িত্ব নিয়েছেন বায়েজিদ বোস্তামি থানার পরিদর্শক (তদন্ত) মোস্তফা কামাল। এর আগে আরও তিনজন মামলাটি তদন্ত করেছিলেন। 
মামলাটির বর্তমান তদন্ত কর্মকর্তা মোস্তফা কামাল বলেন, ‘আমি মাত্র কয়েক দিন আগে এ মামলার তদন্তের দায়িত্বভার পেয়েছি। এ পর্যন্ত ১১ জন আসামি গ্রেপ্তার হয়েছেন। তাদের মধ্যে অধিকাংশ জামিনে মুক্তি পেয়েছেন। প্রধান আসামি সাহেদুল ইসলাম হাইকোর্ট থেকে জামিন জালিয়াতি করে মুক্তি পাওয়ার বিষয়টি শুনেছি। তবে এ-সংক্রান্ত কোনো তথ্য এখন পর্যন্ত আমার কাছে নেই।’

বেঞ্চ অফিসার সাময়িক বরখাস্ত
সমকাল প্রতিবেদক জানান, জামিন জালিয়াতির ঘটনায় বেঞ্চ অফিসার জাকির হোসেনকে সাময়িক বরখাস্ত করা হয়েছে। পাশাপাশি তাঁকে কারণ দর্শানোর নোটিশ দেওয়া হয়েছে। গতকাল সোমবার সুপ্রিম কোর্টের রেজিস্ট্রার জেনারেল মুহম্মদ হাবিবুর রহমান সিদ্দিকী এ তথ্য জানিয়েছেন। 
জামিন জালিয়াতি নিয়ে গত ৩০ এপ্রিল বিভিন্ন গণমাধ্যমে প্রতিবেদন প্রকাশিত হয়। প্রতিবেদনে বলা হয়, এই মামলায় তথ্য গোপন করে হাইকোর্ট থেকে প্রথমে জামিন নেন আসামি।
সেই জামিন আদেশে দুই বিচারপতির স্বাক্ষরের পর তা বদলে ফেলা হয়। বদলে ফেলা সেই জামিন আদেশ জাল-জালিয়াতির মাধ্যমে সৃজন করে বসানো হয় নতুন করে মামলার নম্বর ও থানার নাম। পরে পাঠানো হয় কারাগারে।
সেই জামিন আদেশের ভিত্তিতেই কারাগার থেকে বেরিয়ে গেছেন চট্টগ্রামে ‘কুকি-চিনের’ ২০ হাজার পোশাক জব্দের ঘটনায় করা সন্ত্রাসবিরোধী আইনের মামলার আসামি সাহেদুল ইসলাম। তিনি চট্টগ্রামে অবস্থিত ‘রিংভো অ্যাপারেলস’-এর মালিক।

সাত মাস আগে ২০২৫ সালের ১৬ সেপ্টেম্বর উচ্চ আদালতে তথ্য গোপন ও জামিন জালিয়াতির ঘটনা ঘটলেও তা প্রকাশ পেয়েছে গত সপ্তাহে। মামলার আরেক আসামি উচ্চ আদালতে জামিন নিতে এসে সহ-আসামির জামিন পাওয়ার তথ্য তুলে ধরেন। এরপরই চাঞ্চল্যকর এ জামিন জালিয়াতির বিষয়টি ধরা পড়ে।
এরপর বিষয়টি প্রধান বিচারপতি জুবায়ের রহমান চৌধুরীর নজরে আনেন অ্যাটর্নি জেনারেল ব্যারিস্টার মো. রুহুল কুদ্দুস কাজল। অভিযোগ আমলে নিয়ে ঘটনা তদন্তে রেজিস্ট্রার জেনারেল মুহাম্মদ হাবিবুর রহমান সিদ্দিকীকে নির্দেশ দেন প্রধান বিচারপতি। একইসঙ্গে ৪৮ ঘণ্টার মধ্যে রেজিস্ট্রার জেনারেলকে প্রতিবেদন দিতে নির্দেশ দেন। এরপর বেঞ্চ অফিসারকে বরখাস্ত করা হয়।
২০২৫ সালের ১৭ মে চট্টগ্রামের বায়েজিদ বোস্তামি এলাকায় রিংভো অ্যাপারেলসের গুদাম থেকে কেএনএফের জন্য তৈরি করা ২০ হাজার ৩০০টি পোশাক জব্দ করে পুলিশ। প্রায় দুই কোটি টাকার বিনিময়ে কেএনএফ সদস্যদের এ সামরিক পোশাকের ক্রয়াদেশ নিয়ে পোশাক তৈরি করা হয়। এ ঘটনায় সন্ত্রাসবিরোধী আইনে করা মামলায় কারখানাটির মালিক সাহেদুল ইসলামসহ তিনজনকে আসামি করা হয়। 

আরও পড়ুন

×