ঢাকা শুক্রবার, ১৭ জুলাই ২০২৬

চট্টগ্রাম-রাঙামাটি জেলায় বন্যা

ক্ষতিগ্রস্ত মানুষের ঘুরে দাঁড়ানোর চেষ্টা

চট্টগ্রাম জেলায় সার্বিক ক্ষতি শতকোটি টাকা ছাড়িয়ে যাবে– দাবি প্রশাসনের

ক্ষতিগ্রস্ত মানুষের ঘুরে দাঁড়ানোর চেষ্টা
×

ভারী বৃষ্টিপাত ও পাহাড়ি ঢলে সৃষ্ট বন্যার পানিতে ভেসে গেছে ফোখপুরী তংচংগ্যার একমাত্র সম্বল দোকানঘর। গতকাল বুধবার বিধ্বস্ত সেই ধ্বংসস্তূপের মধ্যে নতুন করে স্বপ্ন বোনার চেষ্টায় এই নারী। রাঙামাটির বিলাইছড়ি উপজেলার উত্তর তক্তানালা গ্রাম থেকে তোলা সমকাল

 চট্টগ্রাম ব্যুরো

প্রকাশ: ১৬ জুলাই ২০২৬ | ০৭:৫৩ | আপডেট: ১৬ জুলাই ২০২৬ | ১০:০২

| প্রিন্ট সংস্করণ

সাম্প্রতিক সময়ের বন্যায় চট্টগ্রাম জেলার উপকূলের লক্ষাধিক মানুষ ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছেন। কারও ভেঙেছে ঘর, কারও ফসলের ক্ষেত তলিয়ে গেছে। কারও আবার ঘরবাড়ি ক্ষেতখামার সবই গেছে। বন্যার পানি নেমে যাওয়ার সঙ্গে সঙ্গে এসব মানুষ ঘুরে দাঁড়ানোর চেষ্টা শুরু করেছেন। 

বন্যায় ক্ষতিগ্রস্তদের একজন সাতকানিয়া উপজেলার মুদি দোকানদার ফয়জুল জানালেন, টানা পাঁচদিন চিড়া ও মুড়ি খেয়ে কাটিয়েছেন। লোহাগাড়া উপজেলার জয়নব বেগম জানালেন, ঘরে এখনও হাঁটুসমান কাদা।

তলিয়ে যাওয়া ফসলের ক্ষেতে দাঁড়িয়ে বাঁশখালী উপজেলার ফখরুল ইসলাম হা-হুতাশ করছিলেন। সামনের দিনগুলো কীভাবে কাটাবেন, তা নিয়ে দুশ্চিন্তার শেষ নেই তাঁর। কপালে চিন্তার অসংখ্য ভাঁজ নিয়েই নেমে পড়েছেন জমিতে। অভিন্ন চিত্র চন্দনাইশ উপজেলারও। জেলার সবচেয়ে বেশি সবজি উৎপাদন হয় এই উপজেলায়। 
চন্দনাইশ উপজেলার কৃষক হামিদুল মিয়া বলেন, ‘ঋণ নিয়ে এক একর জমিতে ধান ও সবজি চাষ করেছিলাম। বানের পানিতে ভেসে গেছে সবই। এখন ঋণের টাকা কীভাবে পরিশোধ করব, জানি না। শুধু জানি, আমাকে ঘুরে দাঁড়াতে হবে। শুরু করতে হবে জীবন সংগ্রাম।’

শুধু ফখরুল কিংবা হামিদুলেরই নয়, কয়েক দিনের টানা ভারী বর্ষণ ও পাহাড়ি ঢলে সৃষ্ট বন্যায় চট্টগ্রামের কৃষি ও মৎস্য খাতে ব্যাপক ক্ষতি হয়েছে।

জেলা মৎস্য অধিদপ্তর ও কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের প্রাথমিক হিসাব অনুযায়ী, চট্টগ্রামের ১৫৩টি ইউনিয়নে প্রায় ১০ হাজার পুকুর ও চিংড়ি ঘের ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। একই সময়ে ১৪ হাজার হেক্টরের বেশি কৃষিজমি পানির নিচে চলে গেছে। 

মৎস্য কর্মকর্তা সালমা বেগম জানান, প্রাথমিক প্রতিবেদন অনুযায়ী জেলার ১৫টি উপজেলার ১৫৩টি ইউনিয়নে ৯ হাজার ৯৩৩টি পুকুর ও দিঘি, ৩২০টি চিংড়ি ঘের এবং প্রায় ৪ হাজার ১১২ হেক্টর জলাশয়ের মাছচাষ ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। সবচেয়ে বেশি ক্ষতি হয়েছে বাঁশখালী উপজেলায়। সেখানে দুই হাজার ৫০০টি পুকুর, ৩১০টি চিংড়ি ঘের এবং প্রায় এক হাজার ৯৭০ হেক্টর জলাশয়ের মাছ ভেসে গেছে। দ্বিতীয় সর্বোচ্চ ক্ষতি হয়েছে সাতকানিয়ায়। সেখানে ৪৬৬ হেক্টর জলাশয়ের মাছচাষ ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে।
জেলা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের প্রাথমিক হিসাবে আট হাজার ৭৬৮ হেক্টর আউশ ধান, ৬২১ দশমিক ৬৬ হেক্টর আমনের বীজতলা এবং চার হাজার ৯০৭ হেক্টর সবজি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে।

জেলা কৃষি কর্মকর্তা আপ্রু মারমা জানান, চন্দনাইশ উপজেলায় ৮৩০ হেক্টর, সীতাকুণ্ডে ৭০০, সন্দ্বীপে ৬০০, ফটিকছড়িতে ৪৭৫, সাতকানিয়ায় ৪৬০ এবং বাঁশখালী উপজেলায় ৪০০ হেক্টর জমির সবজি নষ্ট হয়েছে।

জেলা প্রশাসক জাহিদুল আসলাম মিঞা বলেন, টানা বৃষ্টি ও বন্যায় সার্বিক ক্ষতি শত কোটি টাকার ঘর ছাড়িয়ে যাবে। পানি পুরোপুরি নেমে গেলে সব বিভাগ থেকে তালিকা সংগ্রহ করা হবে।

বিলাইছড়ির ফারুয়ার মানুষও ঘুরে দাঁড়ানোর চেষ্টায়
রাঙামাটি অফিস জানায়, আয় রোজগারের একমাত্র ছোট্ট চায়ের দোকানটি ভেসে গেছে বানের পানিতে। ধানের জমিটিও থই থই। এখন কী খেয়ে দিন পার করবেন বুঝতে পারছেন না ৬০ বছরের বৃদ্ধা ফোখপুরী তংচংগ্যা। গতকাল বুধবার সকালে রাঙামাটির বিলাইছড়ির দুর্গম ফারুয়া ইউনিয়নের উত্তর তক্তানালা গ্রামে বন্যার পানি থেকে বাঁশ-গাছ কুড়ানোর সময় কথা হয় তাঁর সঙ্গে।

শুধু ফোখপুরী নন, এ গ্রামের আরও অনেকে দোকান, বসতঘর হারিয়ে বিষাদের জীবন কাটাচ্ছেন। বন্যার পানি নামার পরই রাইখ্যং নদীর দুই ধারে ফারুয়া ইউনিয়নের বিভিন্ন গ্রামে বসতঘর, কৃষিজমি, সড়ক ও অবকাঠামোর ক্ষয়ক্ষতির চিত্র ফুটে ওঠে। এ ইউনিয়নের একমাত্র বাজারটি পাহাড়ি ঢলে পুরোপুরি লন্ডভন্ড। ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে বাজারের ১৪৪টি দোকান। এখন পানি কমে যাওয়ায় দোকানে হাঁটুসমান কাদা মাটি। ক্ষতিগ্রস্ত মানুষ ফের দোকান চালু করে ঘুরে দাঁড়ানোর চেষ্টা চালাচ্ছেন। 

সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা যায়, পাহাড়ি ঢলে সৃষ্ট বন্যায় ইউনিয়নের ১৭ গ্রামে এক হাজার ৪৮৬ পরিবার ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। দুটি সরকারি ও তিনটি বেসরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়, একটি জুনিয়র হাইস্কুল, ১১টি পাড়াকেন্দ্র, ৪টি স্বাস্থ্য কমিউনিটি সেন্টার ক্ষতিগ্রস্ত হয়ে কার্যক্রম বন্ধ রয়েছে। এ ছাড়া ইউনিয়নের ২০ কিলোমিটার গ্রামীণ সড়ক ভেঙে গেছে। 

রাঙামাটি জেলা প্রশাসনের তথ্য বলছে, বন্যা ও জলাবদ্ধতায় জেলায় ১ লাখ আট হাজার ৭১৭ জন ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। এর মধ্যে পাঁচটি ইউনিয়ন বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। এখন পর্যন্ত ৩৫ লাখ টাকা ও ২৯৫ টন চাল বিতরণ করা হয়েছে। এ ছাড়া কৃষিখাতে তিন হাজার ৬৭৫ হেক্টর জমি এবং মৎস্য খাতে তিন কোটি ৯৪ লাখ ৩২ হাজার টাকার ক্ষতি হয়েছে। রাস্তা ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে ৫৪৬ দশমিক ৫ কিলোমিটার।

ত্রাণ বিতরণে স্বজনপ্রীতি হলে ব্যবস্থা নেওয়ার হুঁশিয়ারি মন্ত্রীর
দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা ও ত্রাণমন্ত্রী আসাদুল হাবিব দুলু বলেছেন, ত্রাণ বিতরণে কোনোরকম দুর্নীতি, স্বজনপ্রীতিকে বরদাস্ত করা হবে না। কোনো অভিযোগ এলে তাৎক্ষণিক ব্যবস্থা নেওয়া হবে। গতকাল বুধবার চট্টগ্রাম নগরের হালিশহরে ক্ষতিগ্রস্তদের ত্রাণ দিতে এসে এসব কথা বলেন তিনি। এ সময় চসিক মেয়র ডা. শাহদাত হোসেন, সংসদ সদস্য সাঈদ আল নোমান, জেলা প্রশাসক জাহিদুল ইসলাম মিয়া প্রমুখ উপস্থিত ছিলেন।

মন্ত্রী এদিন চট্টগ্রাম নগর ছাড়াও সাতকানিয়া এবং বাঁশখালী উপজেলায় বন্যায় ক্ষতিগ্রস্ত মানুষের মধ্যে ত্রাণ বিতরণ করেন।

আরও পড়ুন

×