‘আগুন আতঙ্কে’ দুজনের মৃত্যুর কথা বললেন এমপি
নিজস্ব প্রতিবেদক, ময়মনসিংহ
প্রকাশ: ১৭ সেপ্টেম্বর ২০২৬ | ০১:৩০
ময়মনসিংহ মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে আগুন লাগায় ‘আতঙ্কে’ দুজনের মৃত্যুর কথা বলেছেন হাসপাতাল পরিচালনা কমিটির সহসভাপতি ও ময়মনসিংহ-৪ আসনের সংসদ সদস্য আবু ওয়াহাব আকন্দ ওয়াহিদ। বুধবার সকালে হাসপাতাল পরিদর্শন শেষে তিনি সাংবাদিকদের এ কথা বলেন।
এদিকে হাসপাতালে আগুন লাগার কারণ তদন্তে গঠিত বিতর্কিত কমিটি বাতিল করা হয়েছে। গণপূর্তের কর্মকর্তাদের বাদ দিয়ে বুধবার গঠন করা হয়েছে ছয় সদস্যের নতুন কমিটি। নবগঠিত কমিটিকে তিন কার্যদিবসের মধ্যে অগ্নিকাণ্ডের প্রকৃত কারণ উদ্ঘাটন করে প্রতিবেদন জমা দিতে নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।
সংসদ সদস্য আবু ওয়াহাব আকন্দ ওয়াহিদ বলেন, ‘অগ্নি-আতঙ্কে দুজনের মৃত্যু হয়েছে। তবে পদদলিত বা অগ্নিদগ্ধ হয়ে কেউ মারা যায়নি।’ দুজন স্বাভাবিকভাবে মারা গেছেন বলেও দাবি করেন তিনি।
গণমাধ্যমে ছয়জনের মৃত্যুর যে খবর এসেছে, তা সঠিক নয় দাবি করে তিনি বলেন, ‘মৃত্যুর তালিকায় জাহানারা বেগমের নাম থাকলেও তিনি এখনও হাসপাতালে চিকিৎসাধীন।’
গত সোমবার সন্ধ্যায় হাসপাতালের নতুন ভবনের লিফটের কন্ট্রোল রুমে আগুন লাগে। ওই রাতেই তদন্ত কমিটি গঠন করা হয়েছিল। এতে গণপূর্তের বিতর্কিত কর্মকর্তাদের অন্তর্ভুক্ত করায় কঠোর সমালোচনা হয়। সমকালের প্রতিবেদনেও গণপূর্তের দুই প্রকৌশলীকে কমিটিতে রাখায় তদন্তের স্বচ্ছতা নিয়ে প্রশ্ন তোলা হয়।
বুধবার দুপুরে হাসপাতালের উপপরিচালক ডা. জাকিউল ইসলাম স্বাক্ষরিত বিজ্ঞপ্তিতে জানানো হয়, আগের কমিটি বাতিল করে চিকিৎসক ও কর্মকর্তাদের সমন্বয়ে তদন্ত কমিটি পুনর্গঠন করা হয়েছে। কমিটিতে হাসপাতালের মেডিসিন ইউনিটের প্রধান অধ্যাপক ডা. গোলাম রহমান ভূঁইয়াকে সভাপতি এবং সহকারী পরিচালক (প্রশাসন) ডা. মোহাম্মদ মাইনউদ্দিন খানকে সদস্য সচিব করা হয়েছে। কমিটির অন্য সদস্যরা হলেন– হাসপাতালের সার্জারি বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক ডা. মোহাম্মদ আবদুল্লাহ আল মামুন, ময়মনসিংহ বিদ্যুৎ উন্নয়ন বোর্ডের (বিক্রয় ও বিতরণ বিভাগ-২ দক্ষিণ) নির্বাহী প্রকৌশলী সুব্রত রায়, হাসপাতালের ডেন্টাল সার্জন খন্দকার মুহাম্মদ আনোয়ার হোসেন এবং ময়মনসিংহ ফায়ার সার্ভিস ও সিভিল ডিফেন্সের সহকারী পরিচালক পূর্ণ চন্দ্র মুৎসুদ্দী।
সমকালে সংবাদের পর নড়েচড়ে বসে প্রশাসন
হাসপাতালের লিফট রক্ষণাবেক্ষণে গণপূর্ত অধিদপ্তর ও ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান ‘নাঈমা এন্টারপ্রাইজ’-এর বিরুদ্ধে কোটি টাকার দুর্নীতি, ভুয়া ভাউচার, অকেজো এআরডি সিস্টেম এবং মানহীন যন্ত্র ব্যবহারের অভিযোগ উঠেছে আগেই। এ নিয়ে সম্প্রতি সমকালে অনুসন্ধানী প্রতিবেদন প্রকাশ হয়। এরপর বিষয়টি নিয়ে নানা মহলে আলোচনা-সমালোচনা হয়েছে। অনিয়ম ও গুরুতর অবহেলার অভিযোগে নাম উঠে আসা গণপূর্ত বিভাগের নির্বাহী প্রকৌশলী অর্ণব বিশ্বাস এবং সাব-ডিভিশনের উপবিভাগীয় প্রকৌশলী (ই/এম) মাজেদুর রহমানকে রাখা হয়েছিল লিফটের কন্ট্রোল রুমে আগুন লাগার পর গঠিত প্রথম তদন্ত কমিটিতে। অভিযোগের তীর যাদের দিকে, তাদেরই তদন্ত কমিটিতে রাখায় স্থানীয় লোকজনসহ সংশ্লিষ্ট অনেকেই তীব্র ক্ষোভ প্রকাশ করেন।
এ বিষয়ে হাসপাতালের সহকারী পরিচালক (প্রশাসন) ডা. মোহাম্মদ মাইনউদ্দিন খান বলেন, আগের তদন্ত কমিটি নিয়ে বিতর্ক সৃষ্টি হওয়ায় গণপূর্তের দুই প্রকৌশলীকে বাদ দিয়ে ছয় সদস্যের নিরপেক্ষ কমিটি গঠন করা হয়েছে। তিনি আরও জানান, লিফটে আগুন লাগার ক্ষেত্রে কার কার গাফিলতি বা অবহেলা ছিল, তদন্ত কমিটি তা পুঙ্খানুপুঙ্খভাবে খতিয়ে দেখবে। নিরপেক্ষ তদন্তের মাধ্যমে দোষীদের চিহ্নিত করে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণের সুপারিশ করা হবে।
গত সোমবার হাসপাতালের নতুন ভবনে আগুন লাগলে হুড়োহুড়ি করে একটি মাত্র সিঁড়ি দিয়ে নামার সময় পদদলিত হয়ে ছয়জনের মৃত্যু এবং অন্তত ২০ জন আহত হওয়ার খবর ছড়ায়। তবে হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ ও প্রশাসন পদদলিত হয়ে কারও প্রাণহানির বিষয় নিশ্চিত করেনি। আগুন লাগার পর জরুরি বিভাগের খাতায় পাঁচজনকে মৃত অবস্থায় আনার তথ্য লিপিবদ্ধ হয়। এ প্রসঙ্গে হাসপাতালের সহকারী পরিচালক মাইনউদ্দিন খান বলেন, জরুরি বিভাগের রেজিস্টারে নার্স তাৎক্ষণিকভাবে ওই তথ্য লিখলেও তাদের কাছে পদদলিত হয়ে মৃত্যুর আনুষ্ঠানিক কোনো প্রমাণ নেই। নিহতদের শরীরে পদদলিত হওয়ার স্পষ্ট চিহ্ন পাওয়া যায়নি বলেও দাবি করেন তিনি।
রমজানের পরিবারে নেমে এসেছে অন্ধকার
হাসপাতালে আগুন লাগার পর মারা যাওয়া চারজনের পরিবারের সদস্যদের সঙ্গে কথা বলেছে সমকাল। হুড়োহুড়ি করে সিঁড়ি দিয়ে নামতে গিয়ে মৃত্যুর কথা জানান তারা। ওই চারজনের একজন সিএনজি অটোরিকশাচালক রমজান আলীর (৩৮) পরিবারে এখন শুধুই অন্ধকার। পরিবারের একমাত্র উপার্জনক্ষম রমজানকে হারিয়ে দিশেহারা তাঁর দুই স্ত্রী। এ দুজনই অন্তঃসত্ত্বা।
রমজান আলীর বাড়ি জেলার ফুলবাড়িয়া উপজেলার বিদ্যানন্দ গ্রামে। তাঁর ভাই সাইফুল ইসলাম জানান, গত সোমবার সকালে বুকে তীব্র ব্যথা নিয়ে ময়মনসিংহ মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে ভর্তি হন রমজান। হাসপাতালের নতুন ভবনের চারতলায় ওয়ার্ডে ছিলেন তিনি। একই দিন সন্ধ্যায় আগুন লাগলে পুরো হাসপাতালে আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়ে। শত শত রোগী ও তাদের স্বজনরা প্রাণ বাঁচাতে সিঁড়ি দিয়ে হুড়োহুড়ি করে নিচে নামার চেষ্টা করেন। এ সময় সিঁড়িতে পা পিছলে পড়ে যান রমজান। পদদলিত হন তিনি। গুরুতর আহত হওয়ায় তাঁর মৃত্যু হয়। রমজানের স্ত্রী খাদিজা বেগম (৩৫) বলেন, ‘স্বামীকে সুস্থ করার আশায় হাসপাতালে নিয়েছিলাম। সেই হাসপাতালের আগুনেই সব শেষ হয়ে গেল।’
রমজানের পরিবারে চার শিশুসন্তান আছে। তাঁর প্রথম স্ত্রী খাদিজা বেগম সাত মাসের অন্তঃসত্ত্বা। দ্বিতীয় স্ত্রী খাতিজা আক্তার (২৭) চার মাসের অন্তঃসত্ত্বা। তাদের কাঁধে এখন ঋণের বোঝা। স্বজনরা জানান, একটি ব্যাংকের ফুলবাড়িয়া শাখা থেকে ১ লাখ ৫ হাজার টাকা, একটি এনজিও থেকে ৬০ হাজার টাকা এবং বিভিন্ন জনের কাছ থেকে অন্তত এক লাখ টাকা ঋণ নিয়েছিলেন রমজান। অটোরিকশা কেনার ঋণও পরিশোধ হয়নি।
খাতিজা আক্তার বলেন, ‘আমি আগে গার্মেন্টে চাকরি করতাম। মাথা গোঁজার নিজস্ব ঘরও নেই। ব্যাংক আর এনজিওর ঋণ শোধ করব কী করে?’ হাসপাতাল কর্তৃপক্ষের অবহেলার কারণে যদি এই দুর্ঘটনা ঘটে থাকে, তবে দায়ী ব্যক্তিদের বিচার দাবি করেছেন রমজানের পরিবারের সদস্যরা।
- বিষয় :
- ময়মনসিংহ