চলনবিলে কচুরিপানা সরাতে বিষ, হুমকিতে জলজ প্রাণী
চলনবিলে কৃষিজমিতে আগাছানাশক দিয়ে কচুরিপানা পরিষ্কার করা হচ্ছে। সিংড়া উপজেলার সাতপুকুরিয়া-ডাহিয়া বিল থেকে তোলা। ছবি: সমকাল
আব্দুর রশিদ, সিংড়া (নাটোর)
প্রকাশ: ০২ নভেম্বর ২০২৬ | ১১:২৬
একসময় অথই পানির স্রোতধারা ও দেশি মাছের প্রাচুর্যে প্রাণবন্ত ছিল মৎস্য ও শস্যভান্ডারখ্যাত চলনবিল। সময়ের ব্যবধানে পানিপ্রবাহ বাধাগ্রস্ত হয়ে বিস্তীর্ণ এলাকায় ছড়িয়েছে কচুরিপানা। তা পরিষ্কারে অবাধে আগাছানাশক ও বালাইনাশক ব্যবহারে ছড়ানো হচ্ছে বিষ। এতে বিষাক্ত হচ্ছে বিলের পানি। হুমকিতে পড়ছে মাছ, পাখি ও জলজ প্রাণীর অস্তিত্ব। বাড়ছে মানুষের স্বাস্থ্যঝুঁকি।
কয়েক বছর আগেও চলনবিলের বিস্তীর্ণ এলাকায় ছিল পানির স্বাভাবিক প্রবাহ। কিন্তু বিভিন্ন খাল ও নদীর সংযোগস্থলে প্রতিবন্ধকতা, অপরিকল্পিত বাঁধ, জাল, বানা স্থাপনসহ নানা কারণে পানি চলাচল বাধাগ্রস্ত হচ্ছে। এতে বিলের বিভিন্ন স্থানে কচুরিপানা আটকে তৈরি হচ্ছে স্তূপ। গত কয়েক বছর ধরে এ পরিস্থিতি কৃষকদের জন্য বড় দুর্ভোগের কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে।
কৃষকদের ভাষ্য, রবি ফসল ও বোরো ধান চাষের আগে জমি থেকে কচুরিপানা সরাতে বিঘাপ্রতি অতিরিক্ত ৫ থেকে ১০ হাজার টাকা পর্যন্ত ব্যয় করতে হচ্ছে। কোথাও শ্রমিকের সংকট, কোথাও শ্রমিকের বাড়তি মজুরি মিলিয়ে উৎপাদন খরচ বেড়েছে। অনেক ক্ষেত্রে জমি পরিষ্কার করলেও আবার কচুরিপানা জমছে। ফলে চাষাবাদ ব্যাহত হওয়ার পাশাপাশি বাড়তি খরচের চাপ সামলাতে না পেরে কেউ কেউ জমি অনাবাদি রাখছেন।
কচুরিপানার বিস্তার ঠেকাতে এবং জমি চাষের উপযোগী করতে কৃষকদের একাংশ আগাছানাশক ও বালাইনাশক প্রয়োগ করছেন। সহজে ও কম খরচে কচুরিপানা অপসারণের আশায় এসব রাসায়নিক ব্যবহারের প্রবণতা বাড়ছে। এর ফলে পানি ও মাটিতে রাসায়নিক দূষণের আশঙ্কা তৈরি হচ্ছে। এর ফলে ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে মাছ, ব্যাঙ, শামুক, জলজ কীটপতঙ্গসহ বিভিন্ন প্রাণী।
জোলারবাতা এলাকার কৃষক মিজানুর রহমান বলেন, গত বছর কচুরিপানার স্তূপের কারণে তাঁর ৮০ বিঘা জমি অনাবাদি ছিল। এতে কয়েক লাখ টাকার ফসলের আয় থেকে বঞ্চিত হয়েছেন। ইন্দ্রাসন গ্রামের কৃষক আব্দুল করিম বলেন, বন্যার শুরুতে জমিতে আটকে থাকা কচুরিপানা অপসারণের উদ্যোগ নেওয়া হলেও পরবর্তী সময়ে আবারও জমিতে কচুরিপানা জমেছে। এদিকে শ্রমিকের মজুরি বেড়েছে, শ্রমিকও সংকট রয়েছে। পাশাপাশি তেল, সার ও কীটনাশকের দাম বৃদ্ধি কৃষকদের আরও চাপে ফেলেছে। ডাহিয়া গ্রামের কৃষক রুহুল আমিনের চলনবিলে ১৫ বিঘা কৃষিজমি রয়েছে। কিন্তু কচুরিপানার কারণে জমি লিজ দিতে চেয়েও তিনি আগ্রহী কাউকে পাচ্ছেন না।
কচুরিপানা পরিষ্কারে রাসায়নিক ব্যবহারের প্রভাব শুধু কৃষিজমিতে সীমাবদ্ধ থাকছে না। এসব রাসায়নিক বৃষ্টির পানি ও বিলের পানিতে মিশে জলজ পরিবেশের ওপর বিরূপ প্রভাব ফেলতে পারে বলছেন পরিবেশবিদরা।
পরিবেশবাদী সংগঠন চলনবিল জীববৈচিত্র্য রক্ষা কমিটির সাধারণ সম্পাদক সাইফুল ইসলাম বলেন, কচুরিপানা পরিষ্কারে অবাধে আগাছানাশক প্রয়োগের ফলে বিলের মাছ, পাখিসহ জলজ জীববৈচিত্র্যের ক্ষতি হচ্ছে। এ পরিস্থিতি অব্যাহত থাকলে এখানকার খাদ্য উৎপাদন ব্যাহত হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে। বিষয়টি জাতীয়ভাবে গুরুত্ব দিয়ে বিবেচনা করা প্রয়োজন।
কৃষির পাশাপাশি চলনবিলের মৎস্যসম্পদও সংকটের মুখে পড়ছে। বিলের সঙ্গে নদী ও খালের সংযোগস্থল বন্ধ হয়ে যাওয়া এবং বিভিন্ন স্থানে অবৈধ প্রতিবন্ধকতা তৈরি হওয়ায় মাছের স্বাভাবিক চলাচল ও প্রজনন বাধাগ্রস্ত হচ্ছে বলে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা মনে করছেন। এর সঙ্গে নিষিদ্ধ চায়না জালের ব্যবহার যুক্ত হয়ে দেশি প্রজাতির মাছের বংশবৃদ্ধির ওপর বাড়তি চাপ তৈরি করছে।
সিনিয়র উপজেলা মৎস্য কর্মকর্তা শাহাদত হোসেন বলেন, বর্ষা-পরবর্তী সময়ে কৃষিজমি থেকে কচুরিপানা পরিষ্কারে সস্তা বালাইনাশক ও আগাছানাশক ব্যবহারের ফলে মাছসহ জলজ জীববৈচিত্র্যের মারাত্মক ক্ষতি হচ্ছে। এতে মাছ ও পাখির অস্বাভাবিক মৃত্যু, প্রজননগত সমস্যা এবং স্বাস্থ্যগত ঝুঁকি তৈরি হতে পারে। কৃষকদের এসব রাসায়নিক ব্যবহার না করার বিষয়ে মৎস্য বিভাগের পক্ষ থেকে পরামর্শ দেওয়া হচ্ছে।
সিংড়া উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা মাহমুদুল হাসান বলেন, কচুরিপানার কারণে কিছু জমি অনাবাদি থাকায় কৃষক ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছেন। এ বছরও উপজেলার ৫-৬ হাজার হেক্টর জমিতে কচুরিপানা রয়েছে। কৃষকদের কচুরিপানা অপসারণে আগাছানাশক বা বিষ প্রয়োগ না করে সেগুলো তুলে জৈব সার হিসেবে ব্যবহারের পরামর্শ দেওয়া হচ্ছে। তাঁর মতে, বিলের সঙ্গে সংযুক্ত খাল ও নদীর মুখে জাল ও বানা দিয়ে অবৈধভাবে প্রতিবন্ধকতা তৈরি এবং অপরিকল্পিতভাবে কৃষিজমিতে পুকুর খনন কচুরিপানা আটকে থাকার কারণ।
- বিষয় :
- নাটোর