ঢাকা বৃহস্পতিবার, ০৪ জুন ২০২৬

চট্টগ্রাম বন্দর

চার হাজার চালানে ৮৫০ কোটি টাকা লোপাট

চার হাজার চালানে ৮৫০ কোটি টাকা লোপাট
×

চট্টগ্রাম বন্দর - ফাইল ছবি

সারোয়ার সুমন, চট্টগ্রাম

প্রকাশ: ১০ সেপ্টেম্বর ২০২১ | ১২:০০ | আপডেট: ১১ সেপ্টেম্বর ২০২১ | ০৩:৫৯

অবসরপ্রাপ্ত এক কাস্টমস কর্মকর্তার গোপন 'ইউজার আইডি' ব্যবহার করে চট্টগ্রাম বন্দর থেকে ৮৫০ কোটি টাকার চার হাজার চালান খালাস করে নিয়ে গেছে জালিয়াত চক্র। শুধু তাই নয়, বদলি হওয়া আরেক সহকারী রাজস্ব কর্মকর্তার আইডি ব্যবহার করে ৩ হাজার ৬৮১ বার 'অ্যাসাইকুডা ওয়ার্ল্ড সিস্টেমে' লগইন করার ভয়ংকর তথ্যও উদ্ঘাটন করেছে শুল্ক গোয়েন্দা ও তদন্ত অধিদপ্তর। পরে এটি নিয়ে তদন্ত শুরু করে দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক)। দেশের প্রধান রাজস্ব আদায়কারী প্রতিষ্ঠান চট্টগ্রাম কাস্টম হাউসে ঘটা এমন জালিয়াতিতে সাত সিঅ্যান্ডএফ প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে আট কাস্টমস কর্মকর্তার যোগসাজশও পেয়েছে তারা। গত বুধবার তাদের জিজ্ঞাসাবাদও করে দুদক।

চট্টগ্রাম কাস্টম হাউসের কমিশনার মোহাম্মদ ফখরুল আলম বলেন, অন্যায় কাজে যারা যুক্ত থাকবেন তাদের শাস্তি পেতে হবে। আবার নিরপরাধ কেউ যাতে হয়রানির শিকার না হয় সেদিকেও খেয়াল রাখতে হবে। জালিয়াতির যে ঘটনাটি এখন দুদক তদন্ত করছে তখন কাস্টম হাউসের দায়িত্বে আমি ছিলাম না। তবে এখনও এ চক্র সক্রিয় আছে। তিনি বলেন, দেশের প্রধান রাজস্ব আদায়কারী এই প্রতিষ্ঠানে জনবল আছে প্রয়োজনের অর্ধেক। অনুমোদিত ১ হাজার ২৪৮টি পদের বিপরীতে কর্মরত আছে ৬৪৭ জন। এটিকেও সুযোগ হিসেবে কাজে লাগাচ্ছে জালিয়াত চক্র।

৮৫০ কোটি টাকা লোপাটের ঘটনায় সাত সিঅ্যান্ডএফ প্রতিষ্ঠানের সম্পৃক্ততা পেলেও এ সংগঠনের প্রথম যুগ্ম সম্পাদক কাজী মাহমুদ ইমাম বিলু বলেন, সিঅ্যান্ডএফ প্রতিষ্ঠান আমদানিকারকের প্রতিনিধি হিসেবে পণ্য খালাসের কাজ করে। কোন কনটেইনারে কী আনা হয়েছে তা সবার আগে জানেন আমদানিকারক। পণ্য খালাস করতেও অনুমতি লাগে আমদানিকারকের। আর খালাসের ছাড়পত্র দেয় কাস্টমস কর্মকর্তারা।

তাই সিঅ্যান্ডএফ প্রতিষ্ঠানকে এককভাবে দায়ী করার কোনো সুযোগ নেই। কাস্টমসের এই জালিয়াতি নিয়ে দুদক চট্টগ্রামের দায়িত্বশীল কেউ কথা বলতে রাজি হননি।

দুদকের মুখোমুখি ৮ কাস্টমস কর্মকর্তা: জালিয়াতি করে ৮৫০ কোটি টাকার চালান খালাসের ঘটনায় ৮ কাস্টমস কর্মকর্তার যোগসাজশ পেয়েছে দুদক। এ জন্য বুধবার দুদকের উপপরিচালক মো. নাসির উদ্দিনের নেতৃত্বাধীন একটি অনুসন্ধান দল চট্টগ্রাম কাস্টমসের ওই আট কর্মকর্তাকে জিজ্ঞাসাবাদ করেন। ওই কর্মকর্তারা হলেন- রাজস্ব কর্মকর্তা মো. সাইফুল ইসলাম, সহকারী রাজস্ব কর্মকর্তা সাইফুন নাহার জনি, মির্জা সাইদ হাসান ফরমান, মো. মাহমুদুল হাসান মুন্সী, মো. মাহবুবর রহমান, মো. ওমর ফারুক, সাইফুল ইসলাম ও মাহমুদা আক্তার লিপি।

জালিয়াতির নেপথ্যে ৭ সিঅ্যান্ডএফ প্রতিষ্ঠান: কাস্টমস কর্মকর্তাদের ইউজার আইডির অপব্যবহার করে জালিয়াতির মাধ্যমে পণ্য চালান খালাস নেওয়া ৭টি সিঅ্যান্ডএফ প্রতিষ্ঠানকে শনাক্ত করেছে শুল্ক গোয়েন্দা। এগুলোর মধ্যে শুধু ছয়টি প্রতিষ্ঠানই পাঁচ বছরে খালাস করেছে ৩ হাজার ৬৫১টি চালান। শুল্ক গোয়েন্দার ধারণা, ৮৫০ কোটি টাকা মূল্যের অন্তত চার হাজার চালান খালাস করেছে এরা। প্রতিষ্ঠানগুলো হচ্ছে- মেসার্স লাইলা ট্রেডিং কোম্পানি, এমঅ্যান্ডকে ট্রেডিং করপোরেশন, এমআর ট্রেড ইন্টারন্যাশনাল, চাকলাদার সার্ভিস, মজুমদার ট্রেড ইন্টারন্যাশনাল লিমিটেড, স্মরণিকা শিপিং কাইজেন লি. ও লাবনী এন্টারপ্রাইজ লি.। এসব সিঅ্যান্ডএফ প্রতিষ্ঠানের লাইসেন্সের বিস্তারিত তথ্য কাস্টম থেকে সংগ্রহ করেছে দুদকও।

কাস্টমস কর্মকর্তাদের গোপন কোড জালিয়াত চক্রের হাতে: ঢাকার আমদানিকারক প্রতিষ্ঠান জারার এন্টারপ্রাইজের একটি সন্দেহভাজন চালান (বি/ই নং: সি-৯২০৯২৮) খালাস না করতে চট্টগ্রাম কাস্টমসকে ২০১৮ সালের ২৪ জুন অনুরোধ জানায় শুল্ক গোয়েন্দা। একই সঙ্গে পণ্য চালানের বিএল লক করা হয়। ২৫ সেপ্টেম্বর চালানটি কায়িক পরীক্ষার জন্য আমদানিকারক ও তার সিঅ্যান্ডএফ এজেন্টের প্রতিনিধিদের উপস্থিত থাকতে বলা হয়। কিন্তু তারা কেউই উপস্থিত হননি। পরে খোঁজ নিয়ে শুল্ক গোয়েন্দা জানতে পারে, চালান শুল্কায়ন না করার অনুরোধ সত্ত্বেও ওইদিনই চট্টগ্রাম কাস্টমস (২৪ জুন) চালানটির বিল অব এন্ট্রি গ্রহণ, একই দিন শুল্কায়ন ও শুল্ক আদায় করে। ২৬ সেপ্টেম্বর পণ্য চালানটি বন্দর থেকে খালাসও করে ফেলে তারা। এ বিষয়টি অনুসন্ধান করতে গিয়ে পরে আরও ভয়ংকর তথ্য পেয়েছে শুল্ক  গোয়েন্দা। শুল্ক গোয়েন্দার বিএল লক অবমুক্ত করতে অবসরপ্রাপ্ত কাস্টমস কর্মকর্তা ডিএএম মুহিবুল ইসলামের অ্যাসাইকুডা ওয়ার্ল্ডের ইউজার আইডি ব্যবহার করা হয়। মুহিবুল ইসলাম ২০১৩ সালের ২২ জানুয়ারি থেকে ২০১৪ সালের ১১ সেপ্টেম্বর পর্যন্ত চট্টগ্রাম কাস্টমসে কর্মরত ছিলেন। সে সময় পণ্য খালাসের জন্য কাস্টম হাউস থেকে তার ই-মেইলের ঠিকানায় একটি ইউজার আইডি দেওয়া হয়, যেটি ব্যবহার করতেন তিনি। ওই কর্মকর্তা পরে অন্য দপ্তরে বদলি হয়ে ২০১৫ সালে অবসরে যান। কিন্তু তার আইডি ব্যবহার করে খালাস হতে থাকে একের পর এক চালান। চট্টগ্রাম কাস্টমসে ২০১৭ সালের ২১ নভেম্বর থেকে ২০১৮ সালের ২৭ সেপ্টেম্বর পর্যন্ত ১১৬ বার কাস্টমসের গোপনীয় সফটওয়্যার অ্যাসাইকুডা ওয়ার্ল্ডে লগইন ও লগআউট করা হয়েছে। একইভাবে চট্টগ্রাম কাস্টমসের সাবেক সহকারী রাজস্ব কর্মকর্তা ফজলুল হকের ইউজার আইডি ব্যবহার করেও জালিয়াত চক্র খালাস করেছে অনেক চালান। তার আইডি থেকে ২০১৬ সালের ১৩ অক্টোবর থেকে ২০১৯ সালের ৮ জানুয়ারি পর্যন্ত ৩ হাজার ৬৮১ বার অ্যাসাইকুডা ওয়ার্ল্ড সিস্টেমে লগইন করা হয়েছে। যখন জালিয়াত চক্র এ অপকর্ম করছিল তখন এই কর্মকর্তা ঢাকা দক্ষিণ ভ্যাট কমিশনারেটে কর্মরত ছিলেন।

প্রমাণ মুছে ফেলায় বেকায়দায় দুদক: তিন বছর আগে জালিয়াতির এ ঘটনা উদ্ঘাটন হলেও এখনও জড়িতদের আইনের আওতায় আনতে পারেনি দুদক। জালিয়াত চক্র প্রমাণ না রাখতে সার্ভার থেকে অনেক তথ্য মুছে ফেলে। ধরাছোঁয়ার বাইরে থাকতে তারা আইডিও ব্যবহার করে অবসরপ্রাপ্ত কাস্টমস কর্মকর্তার। এখন দুদক যাদের যোগসাজশ খুঁজে পেয়েছে, তারা এটিকে 'সিস্টেমের ত্রুটি' বলে দাবি করছেন। গত বুধবার দুদকের জিজ্ঞাসাবাদে তারা নিজেদের নির্দোষ বলেও দাবি করেছেন। ২০১৮ সালে এ জালিয়াতি উদ্ঘাটন হলেও সার্ভারে কিছু তথ্য না থাকায় দুদকও শেষ করতে পারছে না তাদের তদন্ত।

আরও পড়ুন

×